Home আজকের পত্রিকা

সংসদ নির্বাচন ২৩ ডিসেম্বর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আগামী ২৩ ডিসেম্বর রবিবার। তফসিল অনুযায়ী—রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৯ নভেম্বর সোমবার। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ ২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। এবার ৩০০টি আসনে এমপি নির্বাচনে ভোট দেবেন ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন ভোটার। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ১৪ মিনিটের ভাষণে সব দলকে ভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সিইসি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ এর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করছি। ভাষণের শুরুতে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেন তিনি।

তিনি বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদানে মোতায়েন থাকবে সশস্ত্র বাহিনী। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ব্যালট পেপারের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। সেই সঙ্গে সরাসরি বা অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধান রেখেছে নির্বাচন কমিশন।

তফসিলের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে গতকাল বেলা ১১টার পর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ইসির ৩৯তম মূলতবি সভা শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা কমিশন সভা করে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন। আর সন্ধ্যায় সিইসি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ওই তফসিল ঘোষণা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে এ সভায় চার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ অংশ নেন। দেড় ঘণ্টা বৈঠকের পর সিইসির ‘মিটিং রুম’ থেকে বেরিয়ে আসেন তিন নির্বাচন কমিশনার। সিইসির কক্ষের সামনেই তাদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। মিনিট পাঁচেক পর বেরিয়ে আসেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, যিনি গত কয়েকদিনে কমিশন সভায় কয়েক দফা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে আলোচনায় রয়েছেন। সেখানে নিজেদের মধ্যে কয়েক মিনিট কথা বলে একসঙ্গে লিফটে উঠে পঞ্চম তলায় যান চার নির্বাচন কমিশনার। প্রবেশ পথে আরও কয়েক মিনিট নিজেদের মধ্যে তারা আলাপ করেন। বেলা পৌনে ১টার দিকে তারা নিজ নিজ কক্ষে চলে যান। বৈঠকে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তফসিল চূড়ান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এভরিথিং ইজ ফাইন। জাস্ট ওয়েট।’ ওই বৈঠক শেষে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিটিভি, বেতারের কর্মীরা সিইসির ভাষণ রেকর্ড করতে তার কক্ষে প্রবেশ করে। বেলা ২টার পর তারা বেরিয়ে যান।

সিইসির আহ্বান : একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব দলকে ভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। সিইসি বলেন, ‘আমি আজ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছি। জনগণের হয়ে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশের গণতন্ত্রের ধারা এবং উন্নয়নের গতিকে সচল রাখার আহ্বান জানাই।’ সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে উন্নত ও গণতন্ত্রকে সমান্তরাল পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় নির্বাচন একটি নির্ভরশীল বাহন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধান মোতাবেক ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে। ভোটকে সামনে রেখে ইসির নেওয়া গত দেড় বছরের উদ্যোগও ভাষণে তুলে ধরেন সিইসি।

ভোটে সেনাবাহিনী থাকবে : প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। ভোটের দায়িত্বে থাকা নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে ব্যর্থতার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। সিইসি বলেন, তারা আইনানুগ ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে সুদৃঢ় থাকবেন। তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও একাগ্রতার ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় সাত লাখ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় নির্বাহী এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ছয় লক্ষাধিক পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে নির্বাচনের আগে ও পরে মোতায়েন করা হবে।

মতবিরোধ মীমাংসার তাগিদ : ভোটকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলে তা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সব দলকে ভোটে অংশ নিতে দ্বিতীয়বারের মতো আহ্বান জানিয়ে সিইসি ভাষণে বলেন, তাদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থেকে থাকলে রাজনৈতিকভাবে তা মীমাংসার অনুরোধ জানাই। প্রত্যেক দল একে অপরের প্রতি সহনশীল, সম্মানজনক এবং রাজনীতিসুলভ আচরণ আমি প্রত্যাশা করছি। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে প্রার্থীর সমর্থকদের সরব উপস্থিতিতে অনিয়ম প্রতিহত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনো প্রতিহিংসা বা সহিংসতায় পরিণত না হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

‘বিনা কারণে হয়রানি ও মামলা নয়’ : তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও এজেন্টদের বিনা কারণে হয়রানি না করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন সিইসি। তিনি বলেন, ভোটার, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রার্থীর সমর্থক ও এজেন্ট যেন বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হন বা মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন না হন তার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃপক্ষের ওপর বিশেষ নির্দেশ রইল। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান সিইসি। দলমত নির্বিশেষে সবার ভোটাধিকার প্রয়োগ ও নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে অভিন্ন আচরণ ও ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রথমবারের মতো অনলাইন ও ইভিএম : সিইসি বলেন, সরাসরি মনোনয়নপত্র দাখিলের পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধানও রাখা হয়েছে। পুরাতন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে সীমিত আকারে ভোট নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিইসি বলেন, ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহারে সুফল পাওয়া গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, ইভিএম ব্যবহার নির্বাচনের গুণগত মান উন্নত করবে এবং সময়, অর্থ ও শ্রমের সাশ্রয় হবে।

আচরণ বিধি মেনে চলুন : ভাষণে সিইসি আচরণবিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়ে বলেন, আমি প্রত্যাশা করব, অনুরোধ করব এবং দাবি করব; প্রার্থী এবং তাঁর সমর্থক নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি মেনে চলবেন। নিজ নিজ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোট কেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সহায়তা চান তিনি। সিইসি জানান, নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার ভোট কেন্দ্র বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। ৭৫টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা অর্জন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে। প্রথমবারের মতো নির্বাচনী এজেন্ট প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলাফলের তালিকা হাতে না নিয়ে পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্র না ছাড়ার নির্দেশ দেন সিইসি।