Home ভ্রমন

পূর্ণিমার আলোতে সেন্টমার্টিন

সেন্টমার্টিন পর্যটকদের কাছে সবসময়ই দেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের মধ্যে অন্যতম। সবার মনেই অন্তত একবার হলেও সেন্টমার্টিন ঘুরে আসার ইচ্ছে থাকে। সাগরের বুকে জেগে ওঠা অসম্ভব সুন্দর একটি দ্বীপ এটি। মাকে নিয়ে কিছুদিন আগে সেখানে গিয়েছিলাম।

কক্সবাজার থেকে কাকভোরে রিজার্ভ বাসে চলে গেলাম দমদমিয়া জেটিতে। এলসিটি কুতুবদিয়া জাহাজের টিকিট কাটা ছিল আগেই। এটি ঐতিহ্যবাহী ক্ল্যাসিক জাহাজ। নির্ধারিত সময়ে জাহাজ ছাড়লো। মুহূর্তেই দু’পাশে সিগালের ওড়াওড়ি চোখে পড়লো। নাফ নদীর মোহনা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। সমানতালে সামনে এগোচ্ছে সিগাল। কেউ কেউ তাদের দিকে খাবার ছুড়ে দিচ্ছে। খাবার পানিতে পড়ার আগেই কেউ না কেউ লুফে নিচ্ছে। জাহাজ ধীরগতিতে এগোতে এগোতে নদী পেরিয়ে সাগরে নামলো।

আরেকটু সামনে যেতেই শুরু হলো তুমুল ঢেউ। তবে মোটেই ভয় পাচ্ছিলাম না। বরং জাহাজের সঙ্গে সাগরের ঢেউয়ের মিতালী দেখতে চমৎকার লাগছিল। ঢেউ কাটাতে কাটাতে আমরা সেন্টমার্টিনের জেটির দিকে এগোচ্ছি। মাঝসাগর থেকে সবুজ গাছপালা ঘেরা দ্বীপটি দেখতে বেশ ভালোই লেগেছে।

সেন্টমার্টিনের মূল ভূখণ্ডে নেমে দেখি ঘড়ির কাঁটা বেলা প্রায় ১টার ঘরে। চারপাশ একটু দেখে একটা হোটেলে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। বিকালে আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে সোজা চলে গেলাম সৈকতের পশ্চিম দিকে। সেখানে হাড়কাঁপানো প্রচণ্ড বাতাস। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাগরও উত্তাল হয়ে গিয়েছিল। ঢেউয়ের ফ্রিকোয়েন্সি এতই বেশি ছিল যে, মনে হচ্ছিল ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানে পানি ওপরে উঠছে আর নামছে। সেই বিক্ষিপ্ত ঢেউ পাড়ে এসে প্রবল শক্তিতে প্রবালে আঘাত হানছে। সুরে-ছন্দে পানির এই উত্থান-পতন দেখা ছিল চোখ জুড়ানো।

সাগরের উত্তাল রূপ দেখে কাটলো পুরো বিকাল। যত দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। সন্ধ্যায় হোটলে ফিরে এসে আবারও সৈকতে পা ফেললাম। কিছুক্ষণের মধ্যে চাঁদমামা মাথার ওপর থেকে স্নিগ্ধতা ছড়াতে লাগলো। সেদিন ছিল পূর্ণিমা, তাই চাঁদটা একটু বেশিই আলো দিচ্ছিল। ভরা জ্যোৎস্নার সঙ্গে সাগরের গর্জন, এ যেন সার্থক এক রজনী। এসব দেখে আম্মাও আনন্দে আত্মহারা। তাকে এত কষ্ট দিয়ে সেন্টমার্টিন নিয়ে যাওয়া বিফলে যায়নি মনে হচ্ছে।

সৈকতে পেতে রাখা চেয়ারে বসে অনেকক্ষণ সাগর আর চাঁদের মিতালী উপভোগ করলাম। জোয়ারে ততক্ষণে ঢেউয়ের আকার অনেক বেড়েছে। সাগরের একেকটা প্রবল গর্জন যেন দ্বীপ গ্রাস করে নেওয়ার বার্তা দেয়! রাতে বেশ খানিকটা সময় জ্যোৎস্না উপভোগ করে হোটেলে ফিরে আসি।

পরদিন সকালে যাই ছেড়া দ্বীপে। সেখানে প্রবালের সংখ্যা অনেক বেশি। হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখেছি পুরো এলাকা। ছেড়া দ্বীপে ট্রলার ঘাটের পানি দেখে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি। স্বচ্ছ নীল পানি। ওপর থেকে পানির নিচের সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মনে হলো, একটি সুঁই পড়লেও তা খুঁজে বের করে আনা যাবে। মন চেয়েছে, পানিতে নেমে দাপাদাপি করি। এমন লোভনীয় পরিবেশে নিজেকে ধরে রাখা মুশকিল। কিন্ত সঙ্গে অতিরিক্ত কাপড় না থাকায় ইচ্ছেটাকে জলাঞ্জলি দিতে হলো।

ছেড়া দ্বীপে গিয়েছিলাম হেঁটে। ফিরেছি ট্রলারে চড়ে। ফেরার সময় ট্রলার জার্নিটা বেশ উপভোগ্য ছিল। পুরো পথে মনোমুগ্ধকর লেগেছে অথৈ নীল জলরাশি। ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জনের সঙ্গে সাগরের মৃদু হাওয়া মনে দোলা দিয়েছে।

সেন্টমার্টিন ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকালে আবারও সাগরপাড়ের দিকে বেরিয়ে গেলাম। আম্মা দেখি বেশ উপভোগ করছে। একেকটা ঢেউ যেন মুক্তার মতোই দ্যুতি ছড়ায়। ঢেউয়ের তোড়ে সাম্পানগুলো নাচে। আহা কী এক অপূর্ব দৃশ্য!

সমুদ্রতটে ঘুরতে ঘুরতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। চাঁদ আবারও আলোর দ্যুতি নিয়ে হাজির হয়। চলতে থাকে জ্যোৎস্না রাতে সাগরের রূপ সুধা পান করা। সাগর হয়তো নিজের সতীত্ব লুকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু দুষ্ট চাঁদ তার আলো দিয়ে সব উন্মক্ত করে দেয়। এমন দৃশ্য পর্যটকদের আনন্দ দেয়। এর পরেরদিন আমরা সেন্টমার্টিন ছেড়ে চলে আসি।

এখনও মনে গেঁথে আছে হোটেল কর্তৃপক্ষের অমায়িক ব্যবহার, সাগরের তাজা মাছ ও জ্যোৎস্না রাতে সমুদ্র দর্শন। সেন্টমার্টিনে বসে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে চাইলে এবারই শেষ সুযোগ। কারণ আগামী বছরের ১ মার্চ থেকে সেখানে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ। তার আগেই একবার ঘুরে আসুন।