Home মতামত

বাঙালি মানে কি বিদেশি বাংলাদেশি?


অসম নিয়ে, অসমের নাগরিক পঞ্জির নবায়নের কলাকৌশল নিয়ে লিখতে গেলেই সংশয় আর সংকোচ এসে সামনে দাঁড়ায়। যা বলতে চাই, লিখতে চাই, হয়ে ওঠে না। বেদনার মতো ‘ঘন যামিনীর মাঝে’ দিক হারায় না-বলা প্রেমের অস্বস্তি আর বলার বিষয়। ক্রমাগত বুকে বাজতে থাকে এক ধরনের ব্যর্থতা। কারণ সত্য সব সময় বানিয়ে বলা যায় না, বানাতে গেলেই অসংখ্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সত্যকে, সত্যের বাস্তবকে তার অকৃত্রিম চেহারা দিয়ে যাচাই করা, বলা মানেই অকপট, বেপরোয়া ভাষণ। এ রকম বলার সাহস আর পরিবেশ কোথায়? রাজনীতির ক্ষুদ্রতা, অস্পষ্টতা সময়কে, সময়ের অভিমুখকে বড্ড বেশি ঘোলাটে, সংশয়াচ্ছন্ন করে তুলছে। ভয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ভয়ের হাত থেকে যেমন আমার নিস্তার নেই, তেমনি সরব অথবা নির্লিপ্ত নির্বিশেষেরও রেহাই দূর-অস্ত্।

শুধু অসমকে নয়, ভয়টি ঘেরাও করছে উত্তর-পূর্বের প্রায় প্রতিটি রাজ্যের, প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে। বিশেষ করে এশিয়ার দ্বিতীয় বড় জনগোষ্ঠী বাঙালির যে অংশ এসব অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বাস করছে, তারা আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে আবার ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের সম্মুখীন। দেশভাগের পর তাদের সামনে এত বড় সংকট আর দেখা যায়নি।

পঞ্জি নবায়নের নৈরাজ্য নিয়ে যে হৈচৈ শুরু হলো, তখনই আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম—মিজোরাম, মেঘালয়, মণিপুরেও প্রবল উৎপাত আছড়ে পড়ল; যার অন্য নাম অকারণ সন্দেহ আর হয়রানি। দ্বিতীয়ত, খসড়া তালিকা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিলং থেকে, মিজোরাম ও মণিপুরের সীমান্ত থেকে ঘন ঘন ফোন আসতে থাকে—আমাদের কথাও একটু লিখুন। বাস-গাড়ি থামিয়ে বারবার নথিপত্র চেক করা হচ্ছে, কেউ কেউ হুমকি দিচ্ছে, আমরা যে ভারতীয় নাগরিক তার প্রমাণ কোথায়?

মানে সাধারণ যাত্রীকেও রাষ্ট্রীয় প্রশংসাপত্র, লিগেসি ডাটা সঙ্গে রাখতে হবে? নাগরিক পঞ্জির বিভ্রান্তি, অজস্র ত্রুটিবিচ্যুতি বেশ সাফল্যের সঙ্গে অন্তত একটা কাজ করতে পেরেছে যে সন্দেহ আর ভয়কে কয়েক শ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার এই দুটি প্রশ্নও জাগিয়ে তুলছে—অনুপ্রবেশ আর বিদেশি সমস্যার জুজু আর কতকাল, কত দিন অসমকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে, এসব অঞ্চলের বহুমুখী সমাজ ও রাজনীতিকে বিভ্রান্ত করতে থাকবে এবং বাঙালি মানেই কি বিদেশি, বাংলাদেশি?

সম্ভবত এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানে না স্থানীয় রাজনীতিও। কিংবা তার বহুদলীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে ভাষা আর ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে যাঁরা ক্ষমতা দখলের সুলভ ও সহজতর হাতিয়ার ভাবতে অভ্যস্ত, তাঁরা, হ্যাঁ প্রধানত তাঁরাই গুজবতাড়িত অস্থিরতার অবসান চান না। চান সমস্যাটি টিকে থাক; চান বিদ্বেষ আর বিভাজনের কখনো চোরা, কখনো খরস্রোত শান্তি আর স্থিতির প্রবল বিরুদ্ধ হয়ে উঠুক। কেননা উন্নয়ন নয়, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নয়—ভণ্ডামি, ছলনা, সরকারি অর্থের লুটপাটই তাঁদের লক্ষ্য। শোষণ-তোষণ, নিশ্চল দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িকতাই ক্ষমতার বৃত্তে তাঁদের স্থায়িত্বের প্রধান শক্তি। তাঁদের, দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে ভূরি ভূরি প্রতিশ্রুতি বা অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিছক লোক-দেখানো কৌশল। এ জন্যই প্রতিটি ভোটে, ভোটের আগে স্তিমিত বিদেশি অনুপ্রবেশকে ইস্যু করে তাঁরা জনগণকে প্ররোচিত, শঙ্কিত করে তোলেন। সংগত দ্রোহ আর ক্ষোভের মুখ ঘুরিয়ে দেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরের হিংসা, ১৯৬০ সালের রক্তাক্ত অশান্তি, ১৯৭২ সালে শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে সরকারি ইঙ্গিতে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ররোচনামূলক সিদ্ধান্ত; ১৯৭৯ সালে প্রয়াত সংসদ সদস্য হীরালাল পাটোয়ারীর শূন্য আসনের উপনির্বাচন ঘিরে ভোটার তালিকায় লাখ লাখ বিদেশি, বাংলাদেশির অন্তর্ভুক্তির ভুল, গুজবছোঁয়া তথ্য, তথ্যের বিকৃতি অসুস্থ রাজনীতির যে বিকট চেহারা খাড়া করেছে, সেই অদৃশ্য ভূতটাই অগুনতি অনুপ্রবেশের মিথ আর ‘মিথ্যা’কে দাঁড় করাতে চেয়েছে। বারবার ব্যর্থও হয়েছে। ব্যর্থতার সবচেয়ে উৎকট ও নিকটতম প্রমাণ—এ ইস্যুরই রক্তাক্ত আস্তিন ছুঁয়ে, কখনো হিংস্র, কখনো অহিংস আন্দোলন চাপিয়ে দেয় ছাত্রশক্তি। পরে রাজীব গান্ধীর আপসকামী আসাম চুক্তির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, সদৌ অসম ছাত্র সংস্থার রাজনৈতিক মঞ্চ… অসম গণপরিষদের ‘হাতি’ যখন ভোটে জিতে সরাসরি ক্ষমতার বৃত্তে প্রবেশ করল, তারাও বিদেশিদের খুঁজে বের করে শনাক্ত করতে অক্ষম হয়ে ওঠে। প্রশাসনকে এখানে-ওখানে ছোটাল, গঠিত হলো ট্রাইব্যুনাল, ট্রাইব্যুনালের তৎপরতায় চিহ্নিত হলো জনাকয়েক বিদেশি। মিথ্যাচারের লজ্জা ঢাকতে ডি ভোটার চিহ্নিত হলো কয়েক শ, অর্থাৎ লোক-দেখানো তল্লাশি চালিয়েও ‘হঠাৎ উপচে পড়া’ বঙ্গভাষী বিদেশিদের খোঁজ মিলল না। সজ্জন, মৃদুভাষী, প্রফুল্লকুমার মহন্ত তখন মুখ্যমন্ত্রী, ওই সময়ের নবপ্রজন্মের প্রতিনিধি। তিনিও তাঁর, তাঁরই সংস্থা আসু আর অসম গণসংগ্রাম পরিষদের মনগড়া ‘নির্ভুল’(!) তথ্যকে প্রায় নিঃশব্দে হজম করলেন বটে; কিন্তু স্বস্তি তাঁর কপালে নেই। অস্বস্তি আর সন্ত্রাস ঘেরাও করল তাঁকে। কিন্তু তখনো জনরবে ভর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে—কখনো ৬০ লাখ, কখনো ৭০ লাখ বিদেশি প্রবেশের জুজু। আর এই জুজুকে, জুজুর উপস্থিতিকে ছিনতাই করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল কৌশলপ্রিয় কংগ্রেস এবং আর্যাবর্তের বিভ্রান্তির রাজনীতি।

মাঝখানে কংগ্রেস ক্ষমতায় এলো, ১০ বছর গদিকে দুর্নীতি দিয়ে, মিথ্যা দিয়ে আগলে রাখল; কিন্তু তারাও ‘বিদেশিদের’ খুঁজে পেল না। কংগ্রেসের দুষ্কর্ম আর দৃষ্টান্তহীন ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে, আঁতাতের রাজনীতিকে স্পর্শ করে বিদেশিদের সংখ্যাবৃদ্ধির কল্পনায় নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষীরা আরো বেশি ইন্ধন জোগাল। গত বিধানসভা ভোটের আগে, প্রচারে তিনটি ইস্যু ছড়াল সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক মঞ্চ—কংগ্রেসের অপশাসন, বিদেশি সমস্যা এবং উন্নয়নের স্তব্ধতা। এভাবেই জাতিপ্রেমী অসমিয়া সমাজকে প্ররোচিত করে তারা বিভ্রান্ত করে শাসকের ভূমিকায় প্রবেশ করল, দিজপুরে। কিন্তু তাদেরও পুরনো ভূত তাড়া করছে, ভূতের উৎপাত থেকে রেহাই পেতে তারা শুরু করল ভিন্নতর খেলা। পূর্বঘোষিত, প্রতিশ্রুত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তৈরি করতে মাঠে নামাল প্রশাসনকে। কিন্তু এখানেও দেখা দিচ্ছে দুর্ভেদ্য জটিলতা। আইন আর নথিপত্রের যথাযথ সমর্থন নেই। নেই বাস্তবের স্বীকৃতি।

নদীতীরে চরাঞ্চলে জঙ্গল লাগোয়া গ্রামীণ এলাকায়—উজান, নিম্ন আসাম ও দক্ষিণ আসামের ছোট-বড় শহরে যেসব বাংলাভাষী যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে, তাদের মর্যাদা আর অস্তিত্বে ঘা পড়ছে; তারা এখন ক্ষুব্ধ, অশান্ত, অপমানিত। সরাসরি বলছে, কংগ্রেসের অপশাসন থেকে রেহাই পেতে সাচ্চা ইমেজের প্রবক্তাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েও বিদেশি অপবাদের কবল থেকে মুক্তি আরো বেশি দুষ্কর হয়ে উঠছে। সন্দেহ আর হয়রানি অনবরত ধাওয়া করছে। যদিও আইন তাদের সঙ্গী, অসমিয়া শুভবুদ্ধি তাদের বন্ধু, ইতিহাসও তাদের নিরপেক্ষ সমর্থক, তবু অভিযোগ আর রটনা অনবরত ধাওয়া করছে। মামলার পর মামলা হচ্ছে, দলিলপত্র পেশ করেও স্বস্তি নেই। সপ্রমাণ সন্ধান নেই বিদেশিদের। অতএব দুর্বল নথিপত্র আর আরোপিত সন্দেহের ভিত্তিতে জেলের ভেতর জেল, যার নাম ডিটেনশন ক্যাম্প—তৈরি করে পূর্ববঙ্গ থেকে এককালে আগত উদ্বাস্তু (যাদের আমরা শরণার্থী বলে সম্বোধন করব) এবং আসামের কৃষিব্যবস্থার সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে পরিশ্রমী উৎপাদক জনগোষ্ঠীর একাংশকে বিনা বিচারে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার কৌশল তৈরি করে শাসক আর প্রশাসন জানাতে চাইছে যে আমরা বসে নেই। আমরা সতর্ক। আমরা নাগরিক পঞ্জিকরণের নির্ভেজাল কর্মী।

বিতর্কিত প্রতিশ্রুত পঞ্জির ভবিষ্যৎ আমাদের জানা নেই। কতজন বিদেশি চিহ্নিত হবে, কেউ কেউ যদি সত্যি শনাক্ত হয়, তাদের অদৃষ্ট কোথায় ঝুলবে, কোথায় পুরবে—তাদের ভবিষ্যৎ কী, নির্বাসন না বন্দিশালায় দিনযাপন—সবই অনিশ্চিত। হ্যাঁ, কয়েকটি বিষয়ে আমরা খানিকটা নিশ্চিত হতে পারছি, তা হচ্ছে—ডি ভোটার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া বজায় থাকবে, অনুপ্রবেশের অপবাদ চওড়া হয়ে গ্রামে-শহরে আতঙ্ক ছড়াবে, ছড়াতে থাকবে, জেগে রইবে হুমকি আর কল্পিত বিদেশি সমস্যাকে বাঁচিয়ে রাখার সুপরিকল্পিত রাজনীতি। ঠিক আগের মতো, রক্তপিপাসু অদৃশ্যের পায়ের ছাপের মতো; যে ভয় দেখাবে, গুজব ছড়াবে, বাড়িয়ে তুলবে নিরীহের আতঙ্ক। উর্বরা, জলময় আসামকে নির্জলা এবং আরো বেশি দুর্নীতিময় করে রাখার অন্য রকম ফন্দি আঁটবে। এতে তার মুনাফা কী? আসামের মানচিত্রের আয়তন কমবে, লড়াই বাড়বে। জ্যান্ত আকার নিয়ে বৃহত্তর, নিরপেক্ষ অসমিয়া জাতি গঠনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে ভয় দেখাবে বর্ণমালার প্রথম হরফ অ-র নিচের অজগর। আর এই সুযোগে প্রশস্ত আরো প্রশস্ত, দীর্ঘ, দীর্ঘতর হয়ে উঠবে দুর্নীতির লঘুগুরু হাত।

এই অপ্রিয় সত্যটাই বলতে আমরা ব্যর্থ। সংকোচ আর সাহসের অভাব আমাদের আটকে দিচ্ছে। ঘেরাও করছে ভয়। যারা লিখি, লেখায় রক্তক্ষরণের চিহ্ন নেই। যারা মাঠেঘাটে গলা ফাটাই, তাদের ভাষণে অকপট উচ্চারণ নেই। অনেকেই ‘আমরা বনাম ওরার’ বেড়াজালে বন্দি। বিভাজনের আগ্রাসনে দিগ্ভ্রান্ত। ভেতরের সত্যকে, স্তম্ভিত আর্তনাদকে আরোপিত সংশয় যখন চারদিক থেকে চেপে ধরে তখন মিথ আর মিথ্যা হাজার হাজার শাখা ছড়ায়। এআরসির অ্যানার্কিও মিথ্যার উৎস ও বিস্তারে বিস্তর রসদ জোগাচ্ছে। ‘অ্যানার্কি’ রুখতে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস কই? মানুষ কি এতটাই দুর্বল? এতটাই ক্ষীণ আর দুর্বল তার আত্মশক্তি?

লেখক : ভারতীয় কলাম লেখক

সম্পাদক, মাসিক আরম্ভ পত্রিকা

bahar.uddin.editor@gmail.com