Bangladesh News24

সব

‘মিত্রপক্ষের গুলি’ ও সরকারি ব্যয়

২০০১ সালে ‘নেহরু বক্তৃতা’য় অমর্ত্য সেন ‘মিত্রপক্ষের গুলি’ (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) নামে একটা ধারণা প্রবর্তন করেন। সেনাবাহিনী সাধারণত শত্রু দেখলে তাক করে গুলি চালায় সত্য, কিন্তু শত্রু-মিত্র ঠাহর করতে না পেরে কোনো কোনো সময় নিজের গুলিতে নিজের লোক মারা যায়। বলা হয়ে থাকে যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ২ থেকে ২০ শতাংশ সৈন্য মিত্রপক্ষের গুলির শিকার হয়। যদি ধরে নেওয়া হয় যে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে পাঁচজন করে সৈন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ সৈন্য মিত্রপক্ষের আক্রমণের শিকার হয়। অমর্ত্য সেন এই মিত্রপক্ষের হামলা (আমরা বলব আত্মঘাতী ব্যয়) বলতে এমন সরকারি ব্যয়ের কথা বলছেন, যা উপকারে না এসে বরং উল্টো অপকারে আসে। মিত্রপক্ষের গুলির কিছু উদাহরণ নিম্নরূপ :

২০০১ সালে ভারতে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ছয় কোটি টনের ওপর। যদিও ভারত সরকারের হিসাব অনুযায়ী ভারতের জন্য ২.৫ কোটি টন আপৎকালীন মজুদই যথেষ্ট। এই মজুদের পরিমাণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের এক সহকর্মী জঁ ড্রেজ লিখেছেন, ছয় কোটি টন খাদ্যশস্যের বস্তা যদি একটির ওপর একটি সাজানো যেত, তা হলে ১০ লাখ কিলোমিটার ওপরে ওঠা যেত; আর এতটুকু পথ পরিভ্রমণ করা মানে চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা। ২০১২ সালে ভারতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে তিন কোটি টন মজুদ ছিল তা বাংলাদেশের খাদ্যশস্যের উত্পাদনের প্রায় কাছাকাছি। তবে দুর্ভাগ্যজনক যে ভারত সরকারের গুদামে এত বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ সত্ত্বেও সে দেশে অপুষ্টির হার ভয়াবহ। একটা দেশে বিশাল মজুদ সত্ত্বেও মানুষ অপুষ্টিতে ভুগতে পারে, এমনকি না খেয়েও মারা যেতে পারে এবং দেশটির অতিরিক্ত মজুদ অন্যান্য দেশের জন্য মৃত্যুকূপ হতে পারে। আর সম্ভবত এই কারণেই অমর্ত্য সেন ভারতের খাদ্যনীতিকে অনেকটা পাগলামির সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমরা বলব, সরকারের খাদ্য মজুদ সত্ত্বেও মানুষের মর্সিয়া।

ভারতে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর পরও শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। তার অর্থ, স্বল্প বেতনই যে শিক্ষার মানের অবনতির কারণ হবে এমন কোনো কথা নেই। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধানের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকা এবং (এর সঙ্গে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নের উপস্থিতি) দায়বদ্ধতার বিচ্যুতি সম্ভবত বেতন ও শিক্ষার মানের বিপরীতমুখী সম্পর্কের জন্য দায়ী।

বাংলাদেশে হস্তচালিত নলকূপের কারণে আর্সেনিক সমস্যা ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গণবিষ প্রয়োগের ঘটনা বলে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে স্বল্প সুদের ঋণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ পেলে শোধ না করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

মানুষের কল্যাণ বা উন্নয়নের জন্য নিবেদিত দেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় রাস্তাঘাট ও যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে জনগণের অভিশাপ কুড়িয়ে জনপ্রিয়তা হারানো।

বাংলাদেশে স্বল্প সুদের ঋণে বিপুল ভর্তুকি সত্ত্বেও বেশির ভাগ গরিব মানুষই বেশি সুদেও ঋণ পাচ্ছে না। গরিবের দুঃখ লাঘব করতে গিয়ে দুর্দশা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত ভর্তুকি ব্যবস্থা অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই ভর্তুকি ভোগ করে থাকে যদিও ধনীর চেয়ে গরিবের ক্ষেত্রে এক টাকার প্রান্তিক উপযোগ অনেক বেশি।

পোল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে কিন্তু বছরের পর বছর শুধু কয়েকটা স্তম্ভ দাঁড়িয়ে পারাপারে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

টিনের ঘরে পরিচালিত স্কুলের জায়গায় দালান দেওয়া এবং তা অচিরেই ধসে পড়ার কারণে টিনের ঘরে পরিচালিত শিক্ষারও পরিসমাপ্তি।

ভারতে সরকার খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে পারলেও গরিবদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারলে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম নির্ধারণের জন্য যে পরিমাণ ভর্তুকির প্রয়োজন, তা দেওয়া সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে এই ভ্রান্তনীতি ভারতের গরিবদের জন্য মিত্রপক্ষের একটি প্রচণ্ড হামলায় পরিণত হয়েছে। খাদ্য উদ্বৃত্ত সত্ত্বেও ভারতে ক্ষুধা, অপুষ্টির ব্যাপকতা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জনগণের ভোগান্তি।

কুইক রেন্টাল পাওয়ার পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির চেষ্টা এবং এর ফলে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধি।

বিদ্যুৎ সরবরাহের খবর নেই অথচ শত শত কোটি টাকার ‘খাম্বা’ কেনা-সংক্রান্ত অপচয়ের কাহিনি কারো অজানা নয়। এ ক্ষেত্রে অপচয় ও দুর্নীতি দুটিই ঘটেছে বলে এন্তার অভিযোগ আছে।

এত গেল সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে মিত্রপক্ষের গুলির কথা। এবার কিছু নিখাদ সরকারি অপব্যয়ের দিকে তাকানো যাক।

আমেরিকার নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা বিভাগে গবাদি পশুর মূত্রত্যাগের অভ্যাস নিয়ে গবেষণা পরিচালনার জন্য তিন মিলিয়ন ডলার (২৫ কোটি টাকা) অনুদান দেওয়া হয়। গবেষকরা জানতে চান, গরু নদী পার হওয়ার সময়, নদীতে নামার আগে, না নদী পার হওয়ার পর প্রস্রাব করে। বেশির ভাগ গবেষক গরুগুলো কখন নীরবে মূত্রত্যাগ করে তা ঠাহর করতে পারেননি। এই ব্যর্থতা নিয়ে নিন্দুকদের কাছে বেরিয়ে এসেছে যে পর্যবেক্ষকদের অনেকে বান্ধবীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে গরু কী করছিল সেটা বেমালুম ভুলে গেছেন। যা হোক, ২০০৮ সালে এই প্রকল্পটি সিনেটর প্রপস্মায়ার পুরস্কার লাভ করে, তবে সরকারি অপচয়ের নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে।

২০০৫ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ক্যাটরিনা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলে আঘাত হানে। ২৫ লাখ দুর্গতকে সাহায্য দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৯ লাখ ছিল ভুয়া, যারা দুই বিলিয়ন ডলার বা ১৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ত্রাণের অর্থ দিয়ে অনেকে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে গিয়েছেন; এমনকি ত্রাণের পয়সায় একজন অস্ত্রোপচার করে লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দক্ষিণ চীনে পতিতাদের কিভাবে দায়িত্বের সঙ্গে স্বল্পমাত্রায় মদ্যপান করতে হয় সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ২.৬ মিলিয়ন ডলার বা ১৮৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চীনের গবেষণালব্ধ ফলাফল পরিবর্তনকালে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার ২০১১ সালে দেশের ৩৮টি জেলায় যে এক কোটি পাঁচ লাখ এনার্জি সেভিং বাল্ব বিনা মূল্যে বিতরণ করেছিল, বাতি জ্বালানোর এক সপ্তাহ পরেই এর ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে এবং গচ্চা গেছে ১০৩ কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই। অথচ প্রতিটি বাতির আয়ুষ্কাল ১০ হাজার ঘণ্টা, যা একনাগাড়ে চললেও ৪১৬ দিন পর্যন্ত টিকে থাকার কথা।

দরিদ্রদের জন্য নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা জাল কর্মসূচিতে যাঁরা সুবিধা পেয়েছেন তাঁদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দরিদ্র নয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে পিএইচপির ১১ শতাংশ সুবিধাভোগী প্রয়োজনীয় কোনো শর্তই পূরণ করে না এবং পিএইচপির প্রায় অর্ধেক সুবিধাভোগী দরিদ্র নয়। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে নির্গত অর্থ (অপব্যয়) ২৬ শতাংশ, মহিলাদের বৃত্তি কর্মসূচিতে লিকেজ ১০ থেকে ১২ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরে মহিলাদের জন্য বরাদ্দকৃত বৃত্তি ২০ থেকে ৪০ শতাংশের হাতে পৌঁছায় না। সার্বিকভাবে এসব কর্মসূচির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ কোনো না কোনোভাবে অপব্যয় করা হচ্ছে।

হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে ৩০০ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।

সরকারি অনুমোদন ও তদারকির অভাব, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে সাভারের ‘রানা প্লাজা’ ধসে পড়ে এক হাজার শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেয়; এই দুর্ঘটনায় আহত হয় কয়েক হাজার।

সংসদ সদস্যদের জন্য বিনা শুল্কে বিলাসজাত গাড়ি আমদানির সুযোগ জাতীয় অপচয় এবং সেই গাড়ি বাজারে বিক্রি করে দেওয়া দুর্নীতি, যা হরহামেশাই ঘটছে।

নির্বাচনপূর্ব বাজেটে রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত প্রকল্প গ্রহণ এবং যে প্রকল্প বছরের পর বছর চলছে তার পেছনে যুক্তিহীনভাবে অর্থ ঢেলে দেওয়া।

উপরোক্ত উদাহরণগুলো থেকে মিত্রপক্ষের গুলি-সংক্রান্ত সরকারের অর্থের অপচয় সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। খুব সম্ভবত সে কারণেই সরকারের বিরুদ্ধে অনেকেই চটে আছেন। যেমন—প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক লাও জু বলতেন, ‘মানুষের কল্যাণের জন্য সরকার যত আইন করবে, যত বিধিনিষেধ আরোপ করবে, মানুষ ততই গরিব হবে।’ মার্কিন রসিক উইল রজার্স লিখেছেন, ‘সরকার কিছু না করলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। সরকার যখন কিছু করে, তখনই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।’ এবং অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান বলেছেন, ‘সরকার ভোক্তাদের রক্ষা করুক, এর চেয়েও অনেক জরুরি সমস্যা হচ্ছে সরকারের খপ্পর থেকে ভোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখা।’

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সরকারি ব্যয় মানেই ব্যর্থতা। সরকার এমন একটা প্রতিষ্ঠান, যা মুনাফামুখী প্রবণতার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণের জন্য নিবেদিত থাকে বলে ধরে নেওয়া হয়। কথায় বলে, মশার সঙ্গে রাগ হয়ে মশারি পোড়াতে নেই, তেমনি মিত্রপক্ষের গুলিতে সৈন্য মারা যাচ্ছে বলে (ক্ষতি হচ্ছে) গুলি বন্ধ করতে হবে, তেমন কোনো কথা ঠিক নয়। এটা করা যাবে না, কারণ তাহলে শত্রু এসে আক্রমণ করতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যা করণীয়, তা হলো মৃতের সংখ্যা যাতে সর্বনিম্নে রাখা যায় সে বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া। বিশেষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে অব্যাহতভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করতেই হবে। যেকোনো প্রকল্পের সার্বিক সাফল্যের জন্য যথাযথ ব্যয়ের প্রয়োজন আছে ঠিকই কিন্তু এই ব্যয় যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে সে লক্ষ্যে মূল্যায়ন, তদারকি, দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থবহির্ভূত প্রভাব পর্যালোচনা করা আবশ্যক।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মতামত...
image-id-784430

ট্রাম্প কি অভিশংসনের পথেই হাঁটছেন

পৃথিবীর প্রথম গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সেই হয়তো কথাটা বলেছিলেন তিনি। প্রাচীনকালের...
image-id-784420

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত না থাকে

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস...
image-id-784231

মুক্তিযোদ্ধা হেলাল-প্রতাপদের মুক্তি কত দূরে?

অনেক দিন থেকেই মাঝেমধ্যে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত দু-একটি খবর পড়ে...
image-id-784228

আইসিসিতে গণহত্যার বিচার স্রেব্রেনিচা থেকে রাখাইন

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্প্রতি। আইসিসির (আন্তর্জাতিক...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2018
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com