ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন: সব খোলা থাকলে শপিংমল মার্কেট নয় কেন

প্রকাশিত: এপ্রি ৭, ২০২১ / ০৮:৫৭পূর্বাহ্ণ
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন:  সব খোলা থাকলে শপিংমল মার্কেট নয় কেন

করোনায় প্রথম ধাপের ‘লকডাউনে’ অর্থনৈতিকভাবে মার্কেট ও শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। তখন ক্ষতি হয়েছে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।

এ অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশের সবকিছু খোলা থাকলেও মার্কেট ও শপিংমল কেন বন্ধ রাখা হয়েছে-এমন প্রশ্ন ব্যবসায়ী নেতাদের।

দুই ঈদ ও বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যবসা বন্ধ থাকায় পথে বসার উপক্রম লাখ লাখ ব্যবসায়ী ও তাদের কর্মচারীদের। মঙ্গলবার যুগান্তরের কাছে এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সবকিছু খোলা। গার্মেন্টস, ব্যাংক, শেয়ারবাজার এবং বইমেলা সবকিছু চলছে। নতুন করে গণপরিবহণও চালু হয়েছে। কিন্তু দোকান, মাকের্ট ও শপিংমল বন্ধ।

এটি কেমন বিচার। তিনি বলেন, গত বছর আমাদের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। আশা ছিল, এবার তা কাটিয়ে উঠব। কিন্তু আবারও লকডাউন। যা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মূলত দুই ঈদ এবং পহেলা বৈশাখে ব্যবসা করেন।

মোট মুনাফার বড় অংশই এই উৎসবের সময়ে আসে। কিন্তু এ সময়ে ব্যবসায় বড় ধাক্কা এসেছে। তিনি বলেন, বৈশাখ ও ঈদের পণ্য উৎসবের পর কেউ কিনবে না। বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের সময় চলছে।

কিন্তু পাইকারি ব্যবসা বন্ধ থাকায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কেট, শপিংমল বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল হবে উলটো। কারণ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমেছেন।

এতে করোনা বেশি ছড়িয়ে যাচ্ছে। বরং এদেরকে দোকানে রাখলে করোনা সব জায়গায় ছড়াত না। এ কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল না-থাকলে সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে ঈদ ও পহেলা বৈশাখ। এ কারণে ব্যাংক ঋণ, ক্ষুদ্রঋণ, জমিবন্ধক অথবা দারদেনা করে এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন তারা। কিন্তু মার্কেট বন্ধ থাকায় পড়েছেন তারা চরম বিপদে।

কতদিন এ অবস্থা চলবে স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের হতাশাও বাড়ছে। ফলে ব্যবসা তো দূরের কথা, প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখাই কষ্ট। এ কারণে চরম ক্ষুব্ধ তারা। সারা দেশে বিভিন্নভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদও করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে এ খাতে ২ কোটির বেশি মানুষ জড়িত। ফলে সামাজিক দূরত্ব মেনে যারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে চায়, তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত।

মিরপুরের আর কে অ্যাপারেলসের মালিক কবির উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে বেশকিছু সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টসগুলো খোলা রেখেছে। এখানে পণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু পাইকারি মার্কেট বন্ধ।

ফলে উৎপাদিত পণ্য ফ্যাশন হাউসগুলো কার কাছে বিক্রি করবে। শ্রমিকদের বেতন কোথা থেকে আসবে। অন্যদিকে যেসব পণ্য ঈদের জন্য বানানো হয়, ঈদের পর তা কেউ কিনবে না। বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খুলে দেওয়া উচিত। কারণ, এর সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ লোকের রুটিরুজি জড়িত।

দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মূলত দুই ঈদ এবং পহেলা বৈশাখে ব্যবসা করেন। এক্ষেত্রে মোট মুনাফার বড় অংশই এ উৎসবের সময়ে আসে। এর মধ্যে ফ্যাশন হাউস ও কাপড়ের ব্যবসা অন্যতম।

এ কারণে ব্যাংক ঋণ, ক্ষুদ্র অথবা দারদেনা করে এ খাতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন। এ উৎসবের সময়ই স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এটি দিয়ে তারা সারা বছর চলেন। কিন্তু গত বছর ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ছিল। এ সময়ে ৬৬ দিন ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে করোনায় গত বছর বেচাকেনা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন তাদের ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ৫ থেকে ১১ এপ্রিল লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

ফলে পরপর দু-বছরের লোকসানের কারণে তারা চরম বিপাকে পড়তে যাচ্ছেন। দোকান মালিক সমিতির আশঙ্কা, এবার তা বেড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, যে পদ্ধতিতে লকডাউন করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। বিকল্প চিন্তা করতে হবে। ভাবতে হবে। যে নিয়মে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে তাতে কাজ হবে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য সরকার প্রশাসনিকভাবে সব ধরনের কঠোরতা আরোপ করতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির জন্য রাস্তায় যেভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, তা মার্কেটের ভেতরেও পরিচালনা করা যেতে পারে।

তবুও মার্কেট, শপিংমল বন্ধ করে মানুষের আয়-রোজগার বন্ধ করা যাবে না। তারা বলেন, বাংলাদেশ উন্নত দেশ নয়। ফলে লকডাউন দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার মতো ঘরে ঘরে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়।

এ ফলে মানুষের আয়ের পথ চালু রাখতে হবে। তারা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হলে সব খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

চট্টগ্রামের সানমার ওশান সিটি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আহসান উল্লাহ হাসান যুগান্তরকে জানান, এই মার্কেটে তিন শতাধিক দোকান রয়েছে। এখানকার ব্যবসায়ীরা সারা বছর তাকিয়ে থাকেন রমজান মাসের দিকে।

কারণ, ওই এক মাসেই বেচাকেনা বেশি হয়। যদি রমজানেও এভাবে লকডাউন থাকে, তাহলে মার্কেটের সব ব্যবসায়ীকে দেউলিয়া হয়ে পথে বসতে হবে।

দোকান মালিকদের এই নেতা আরও বলেন, রমজানের প্রথমদিকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা এবং শেষের দিকে আরও দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ১০ পর্যন্ত খোলা রাখতে হবে।

গতবার ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন জীবিকা নয়, জীবন আগে। এবার বলতে বাধ্য হচ্ছেন, জীবন নয়, জীবিকা আগে। চট্টগ্রাম নগরীর সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বিক্রয়কেন্দ্র টেরিবাজারের ব্যবসায়ীরাও দোকানপাট সীমিত আকারে খোলা রাখার পক্ষে।

টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, এই বাজারে ৮২টি ছোট-বড় মার্কেটে প্রায় তিন হাজার দোকান রয়েছে। পুরো ব্যবসাই ঈদকেন্দ্রিক। গতবার ক্ষতি হয়েছিল এক হাজার কোটি টাকা।

এবারও যদি রমজানে বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে আরও এক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি যোগ হবে। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। নিউমার্কেট মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ছাগীর বলেন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করে যেন দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখার অনুমতি দিতে হবে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন