হাসপাতালে চাপ বাড়ছে করোনা রোগীর, মৃত্যু বাড়ছে শ্বাসকষ্টে

প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২১ / ১২:০৮অপরাহ্ণ
হাসপাতালে চাপ বাড়ছে করোনা রোগীর, মৃত্যু বাড়ছে শ্বাসকষ্টে

গত মাসের শেষ ও চলতি মাসের গোড়ার দিকেও করোনাভাইরাস দেশে প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বলেই মনে হচ্ছিল। দৈনিক শনাক্ত নেমেছিল ২ শতাংশের নিচে। দিন দশেক ধরে হঠাৎ করে আবার বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু। হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী। করোনার নমুনা নেওয়া হয় এমন বুথে বেড়েছে ভিড়।

ইতিমধ্যে হাসপাতালের আইসিইউ বেডের চাহিদা বেড়েছে অনেক। রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে ফেব্রুয়ারি তুলনায় এখন প্রতিদিন দ্বিগুণ করোনা রোগী ভর্তি হচ্ছে। করোনার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এমন বাস্তবতায় করোনা চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে সরকার। দেশের সব হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মার্চের শেষে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা থাকলেও তা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পরিচালক ডা. সারওয়ার উল আলম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন করোনার রোগী ভর্তি হতো। কিন্তু গত কয়েক দিন ৪০ জনের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে।’ এদিকে আইসিইউর চাহিদা অনেক গুণ বাড়লেও সব রোগীকে দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানান এই চিকিৎসক।

হাসপাতালগুলোর কেমন হাল

সরেজমিন পরিদর্শন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হঠাৎ করে রোগী বেড়ে যাওয়ায় করোনা ডেটিকেটেড সরকারি হাসপাতালগুলোর সাধারণ শয্যা থেকে শুরু করে কেবিন ও আইসিইউতে রোগীর চাপ বাড়ছে। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউ ও কেবিন সাপোর্ট দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, কুয়েত মৈত্রী ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউর কোনো শয্যার ফাঁকা নেই বলে জানা গেছে।

গত দুই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চাপ সামলাতে অনেকটা হিমশিম খেতে দেখা গেছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।

রবিবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সকাল আটটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নারী টিকিট কাউন্টারে ৪৩০ জন এবং পুরুষ কাউন্টারে ৮২৯ জনসহ মোট ১ হাজার ২৫৯ জন টিকিট কেটে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের অধিকাংশই জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্টের রোগী বলে জানা গেছে।

প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ জন রোগী শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির একজন চিকিৎসক।

এদিকে পহেলা মার্চ কুর্মিটোলা হাসপাতালে করোনার রোগী ছিল ১৪৬ জন। গতকাল পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে ২৫৬ জনে। ১০ শয্যার আইসিইউ শয্যার একটাও খালি নেই এখানে।

বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ফেব্রুয়ারি মাসে দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন করোনার রোগী ভর্তি হতো। কিন্তু গত কয়েক দিন ৪০ জনের মতো করে ভর্তি হচ্ছে। মুগদা হাসপাতালে বর্তমানে ১৪০ জন রোগী ভর্তি আছে বলে জানা গেছে।

আইসিইউ সংকটের কথা তুলে ধরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের পরিচালক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘করোনার শুরু থেকে হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় আইসিইউ সংকট ছিল। এখনো আছে। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে চাহিদাটা বেড়েছে।’

ঢাকা মেডিকেলের করোনা ইউনিটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে দিনে ৫০ থেকে ৬০ জন ভর্তি হলেও এখন প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। করোনার উপসর্গ নিয়েও আগের চেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। যাদের অনেকে ভর্তির পর শ্বাসকষ্টে মারাও যাচ্ছেন।

করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী একজন আনসার সদস্য ঢাকা টাইমসকে বলেন, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০জন রোগী শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে। খুব ভয়ে ভয়ে দায়িত্ব পালন করছি।

মৃত্যু-শনাক্ত বেড়েছে তিন গুণ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ দিনে মৃত্যু ও নতুন রোগী শনাক্ত তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ মার্চ পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল তিন জনের। ১৫ দিনের ব্যবধানে সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয় ২৬ জনের।

অপরদিকে মাসের শুরুতে ২ মার্চ করোনায় আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন। নমুনা পরীক্ষার হিসেবে শনাক্তের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ১৫ দিনের ব্যবধানে নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭৩ জনে। নমুনা পরীক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আবারও নামছে ভ্রাম্যমাণ আদালত

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্র’মণ বাড়তে থাকায় আবার স্বাস্থ্যবিধি মানাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মাস্ক না পরলে জরিমানা করবে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘যারা মাস্ক না পরে তাদেরকে জরিমানা করা হবে। নো মাস্ক-নো সার্ভিস কর্মসূচিকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গেস্ট কন্ট্রোল করা হবে।’

দেশে করোনার সংক্র’মণ বৃদ্ধির ফলে সারাদেশের সব হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও অক্সিজেনের কোনো স্বল্পতা নেই।’

করোনার ঢেউ মোকাবেলায় দেশের সমস্ত হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা প্রসঙ্গে একই কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. খুরশীদ আলমও।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

রোগতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্র’মণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি (মাস্ক পরিধান করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা) হলেও তা মেনে চলার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে উদাসীনতার কারণে করোনা সংক্র’মণ বেড়েই চলেছে। এখনই কঠোর না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই বলে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যেসব দেশ স্বাস্থ্যবিধি মানেনি, সেসব দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে। আমাদের দেশে এখন কেউ মাস্ক পরতে চায় না, স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন হতে হবে।’

সূত্র : ঢাকা টাইমস

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন