কিডনি রোগ নিয়ে ভালো থাকা

প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২১ / ০৮:০৯অপরাহ্ণ
কিডনি রোগ নিয়ে ভালো থাকা

এবারের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল-‘Living Well with Kidney Disease’ (কিডনি রোগ নিয়ে ভাল থাকা)। অর্থাৎ কিডনি রোগী হওয়া সত্বেও কিভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায় এটাই এবারের মূল প্রতিপাদ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৫ সালে সারা বিশ্বে ৫ কোটি মৃত্যুর মধ্যে ৩ কোটি মৃত্যু কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

একবার কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে তার চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মত দেশের ১০ ভাগ কিডনি বিকল রোগী দীর্ঘ মেয়াদী এই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে না (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা)। বাকি ৯০ ভাগ রোগী অর্ধ চিকিৎসা বা বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। অনেক পরিবার বসতভিটা বিক্রি করে সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

আবার অন্যদিকে অর্থ খরচ করেও অনেক রোগী রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য, তার পছন্দ অনুযায়ী বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারে না।

এটা ঠিক যে যারা একবার কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়, তারা আতংকিত হয়ে যায়। ভয় পেয়ে যায় কারণ একবার আক্রান্ত হলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ, এই জন্য যে সময়মত চিকিৎসা না পেলে আস্তে আস্তে রোগটি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং ৫টি পৃথক ধাপ অতিক্রম করে তা রোগীকে একটি জটিল পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

কেউ যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভোগেন তার শেষ পরিণতি হবে কিডনি বিকল, আর কিডনি বিকল হলে তার বেঁচে থাকার উপায় মাত্র দুটি। এক কিডনি সংযোজন, অন্যটি ডায়ালাইসিস। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে চিকিৎসার এই দুটি পদ্ধতিই অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে রোগীকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই চিকিৎসা করাতে হয়। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণে তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে না। নিজের উপার্জনের পথগুলো সচল রাখতে পারে না।

একসময় তারা ঘরে বসে যায়। অর্থ ব্যয়ের অক্ষমতা, সঠিক জ্ঞানের অভাব সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে, ফলে ডাক্তার যে ধরনের ব্যবস্থাপত্র দেন সেটাই তাকে মেনে নিতে হয়।

এতে সে তার নিজস্ব পছন্দ, মতামতের প্রয়োগ, এমন কিছুই করতে পারেন না। এর ফলে একতরফাভাবে তার উপর দেয়া চিকিৎসকের মতামত মেনে নিতে হয়।

এবছরের বিশ্ব কিডনি দিবসের বার্তায় বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, কেউ যদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে যায় তখন কিডনি রোগ সম্পর্কে তার সংশয় এবং ভীতি দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। রোগটি সম্পর্কে তাকে পুরোপুরি ধারণা দিতে হবে।

যখন রোগী তার রোগ, কারণ, পরিণতি ও বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা অর্জন করতে সক্ষম হবে, তখন সে তার পছন্দ অনুযায়ী বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণে চিকিৎসকের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারবে। তার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে তার জন্য উত্তম এবং সঠিক চিকিৎসার পথটি বেছে নিতে পারবে।

এজন্য কিডনি রোগী, তার পরিবারের সদস্য, তার যত্নকারী, বন্ধুবান্ধব, সকলকেই এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। অনেকের জ্ঞান আছে কিন্তু তার আর্থিক সক্ষমতা নেই।

আমরা জানি, উন্নত দেশ গুলোতে চিকিৎসা বীমার সুবিধা আছে। বীমাকৃত নাগরিকদের জটিল রোগ সমূহের চিকিৎসা সার্বিক দায়িত্ব সরকারের তত্ত্বাবধানে বীমা প্রতিষ্ঠান নিয়ে থাকে। ফলে রোগীকে তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয় না।

আমাদের মত দেশে এখনও গরিব মানুষ অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে অক্ষম, অন্য দিকে অনেকে আবার ব্যয়বহুল কিডনি চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

সেজন্যই এবছরের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্যের বার্তাটি হচ্ছে যে, ধনী গরীব সকল কিডনি রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। আর এই কাজটি কে করবে ? সরকার ও নীতি নির্ধারকদেরকে, এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে।

এই সমস্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা অবশ্যই স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।

চিকিৎসক, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসমূহ রোগীদের সচেতন করার জন্য এগিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এই সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মানুষের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে। এভাবে সকলকে যদি সচেতন ও প্রশিক্ষিত করে তোলা যায় তবে রোগীরা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত পথটি বেছে নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যবীমা অথবা আথির্ক সহায়তা দিয়ে যদি সকল রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, তবে হতাশা কেটে যাবে ও তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জন্ম নেবে। যা নিয়ে সে পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিকসহ সব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারবে।

চাকরিজীবী রোগী তার চাকরি চালিয়ে যেতে পারবে, ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক কাজ করতে পারবে। এভাবেই একজন কিডনি রোগী তখন অসহায় ঘরবন্দি না থেকে অন্য দশটা মানুষের মত সমস্ত পারিবারিক সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশীদার হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন