ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে নিহত, প্রবাসীর লাশ খরচের ভয়ে নিচ্ছে না পরিবার

এ যেন নির্মম বাস্তবতা। জীবনের গল্পটা যাদেরকে ঘিরে, সেই তারাই যেন আজ চিনেও চিনছে না। পরিবারের অভাব ঘোচাতে সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে আজ না ফেরার দেশে হতভাগা প্রবাসী। যাদের জন্য এতকিছু তারায় ভুলে গেল সবকিছু। ছিন্ন-ভিন্ন করল সমস্ত বন্ধন। হায় রে মানুষ!

বলছি ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো এক বাংলাদেশির কথা। নাম ইমরান খান ওরফে সুজন। শরীয়তপুরের এই যুবক ভূমধ্যসাগর পাড়ি জমিয়ে তৃষ্ণায় নৌকায় মৃত্যু হয়। সঙ্গে মারা যান আরও অনেকে। পরে কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় তার লাশ রাখা হয় মাল্টার সরকারি মর্গে।

ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে দীর্ঘদিন পরিবারের লোকজন যখন তার কোনো সন্ধান পাচ্ছিলেন না, তখন তারা ধরেই নিয়েছিলেন ইমরান আর বেঁচে নেই। কিন্তু প্রায় আট মাস পরে যখন তার মৃত্যুর খবরটি পরিবার পেলেন তখন তিনি মাল্টার মর্গে। কিন্তু এই মরদেহ দেশে ফেরাতে অতিরিক্ত খরচের কারণে লাশ দেশে নিতে চায় না তার পরিবার।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি নড়িয়া থানার কেদারপুর গ্রামের। মৃত ইমরান খান ওরফে সুজন ওই গ্রামের আব্দুল মান্নান খানের ছেলে। লাশ দেশে আনতে পরিবারের এমন নির্মমতা মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু অসাধু দালালদের প্রলোভনে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাড়ি জমায় ইউরোপের উদ্দেশ্যে। নাম না জানা আরও অনেকেই একসঙ্গে প্রথমে লিবিয়া প্রবেশ করে। মানবপাচার একটি চক্রের শিকার হয়ে তাদেরকে অনেক টাকার বিনিময় ইউরোপে আসার চুক্তি হয়।

‘এভাবে ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়। বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে গোপন অবস্থানে থাকতে হয়। কিছু সময় পাহাড়ের গুহায় অথবা মরুভূমির কোনো এক বালুর ঘরেও। সবকিছুর ইতি ঘটিয়ে ১৬ আগস্ট ২০১৮ সালে ৮৪ জন অবৈধ দেশি-বিদেশি সঙ্গী নিয়ে ইমরান খানও পাড়ি জমায় ভূমধ্য সাগরের বুকে।’

এ হৃদয়বিদারক কথাগুলো বলছিলেন বেঁচে যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক। তারা বলেন, ‘সেই উত্তাল সাগরের বুকে ৮৪ জন লোক ছোট একটি প্লাস্টিকের নৌকায় ৩/৪ দিন ভাসতে থাকে। এমনই একটি ছোট নৌকায় একজনের ওপর ৪/৫ জন বসতে বাধ্য হয়। ছিল না প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি। যেন মিলছে না কোনো শেষ ঠিকানা, মিলছে না কোনো বাঁচার ঠাঁই, তাই এ জীবন যুদ্ধ যেন এখানেই শেষ।’

‘ইমরানের খানের স্বাভাবিক অবস্থা পানির পিপাসায় এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। ২১ আগস্ট তার বন্ধুদের কোলে ঠিকানাহীন সেই সাগরের বুকে জীবন যুদ্ধে হেরে যায়, একটি অসমাপ্ত ফুটন্ত জীবন। পরিশেষে, দিনের শেষে ভাসতে ভাসতে অজানা সাগরের ঠিকানায় মাল্টার কোস্ট গার্ডের কাছে ঠাঁই মেলে।’

ইউরোপীয় আইনে জীবিতদের আশ্রম কেন্দ্রে রাখা হয় এবং সেই মৃত্যু ইমরানকে মাল্টার সরকারি মর্গে রাখা হয়। কিছুদিন পরে বিষয়টি মাল্টায় বসবাসরত কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের নজরে আসে। মসিয়ার রহমানের নেতৃত্বে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তার আপন বোনের সঙ্গে বর্তমানে ইতালিতে অবস্থানরত এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত তার ভাই শোভন খাঁনের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করা হয়।

কিন্তু তারা কোনোভাবেই মৃত্যু ইমরান খানের লাশটি গ্রহণ করতে চাইনি কারণ অনেক টাকা খরচ হবে বলে। বিষয়টি সময়ের ব্যবধানে থেমে থাকে। কিছুদিন আগে মাল্টায় নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগের কমিটি হওয়ার পর সংগঠনের সভাপতি মশিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আপেল আমিন কাওসার এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক, ও মু্ন্সী মোরশেদুল আহমদ, সহ-সভাপতি কাজেম আলী স্বপন এবং সহ-সভাপতি জাকারিয়া মুন্সি, শাহিদ মাস্টার ও শিমুল বড়ুয়া এবং সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব দাসসহ আরো নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে পুনরায় ইমরান খানের বিষয়টি আলোচনায় আনেন।

গত ২/৩ মে ২০১৯ তারিখে মাল্টার স্থানীয় সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়। পরবর্তীতে কথা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মাল্টার প্রশাসনের সঙ্গে। পরে মাল্টা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ-সভাপতিসহ মালটার প্রশাসন নিয়ে লাশটি শনাক্ত করা হয়।

নেতারা জানান, এই লাশটি দেশে পাঠাতে ৬/৭ লাখ টাকা খরচ হবে। যেভাবেই হোক ইমরান খানকে তারা দেশে পাঠাবেন। সব প্রক্রিয়া শেষ করেই এই মাসেই ইমরান খানের লাশটি বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হবে বলেও জানান।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা মাল্টায় অবস্থানরত সব বাংলাদেশিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। নেতারা বলেন, ‘আমরা এখানে অনেক বাংলাদেশি নানা ঝামেলার মুখোমুখি হয়। এদেশে বাংলাদেশির সংখ্যাও অনেক কম। বাংলাদেশি কোনো প্রতিনিধিও নেই। বাংলাদেশ দূতাবাসও নেই।

নেতারা আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি আমাদের ভোগান্তি শিগগিরই শেষ হবে।’ এ বিষয়ে নেতারা বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

তারা বলেন, ‘এখানে সমস্যার কোনো শেষ নেই। পাসপোর্ট নবায়ন করতে অনেক দূরে যেতে হয়। দূতাবাসের কোনোপ্রকার সেবা পাচ্ছি না।’

‘আজকে যদি মাল্টায় দূতাবাস থাকতো তাহলে হয়তোবা ইমরান খানের লাশটার সহজে দেশে চলে যেত। এ রকম অনেক ঘটনাই আছে আমরা দূতাবাসের অবহেলায় অনেক কষ্ট করছি।’

মাল্টা প্রবাসীরা বলেন, ‘আমরা কি বাংলাদেশের নাগরিক না? আমরা কেন দূতাবাসের সেবা পাই না? আমাদের গ্রিসের এথেন্স যেতে হবে সেবা নিতে। একটা পাসপোর্ট নবায়ন করতে ১০০০ ইউরোর মতো খরচ হয়। আবার যারা নতুন পাসপোর্ট করবে তাদের অনেক বেশি খরচ হয়। নতুন পাসপোর্ট করতে হবে এমন ৩০০ জনের অধিক মানুষ আছে। যাদের ১৫ বছর ধরে পাসপোর্টের দরকার কিন্তু করতে পারছে না।’

পরবাসীরা বলেন, ‘এসব কারণে আমরা বাংলাদেশে যেতে পারছি না। কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের কেউ কোনো সহযোগিতা করছে না। আমাদের এটা দাবি থাকবে মাল্টায় অতি দ্রুত দূতাবাসের সেবা চাই। এই ব্যাপারে শিগগিরই সমাধান চাই। আর যেন কারো কোনোদিন ইমরান খানের মতো মর্গে কষ্ট করতে না হয়।’

এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন মাল্টাপ্রবাসীরা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ প্রাণও হারিয়েছেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত