নুসরাত হত্যা নিয়ে যে ‘বিস্ফোরক তথ্য’ দিলেন ফেনীর সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যার পর সেখানকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন জেলার সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা। সেখানে সোহেল রানা সোনাগাজী থানার ওসি, ডিবির এএসপি ও স্থানীয় এক নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেছেন। সোহেল রানার হুবুহু তুলে ধরা হলো:

আপনারা সবই জানেন, তাও বলি, সত্য সূর্যের মতই.. দিনে দুপুরে ছিনতাই হয়েছে বিজয়সিং দিঘীতে। ছিনতাইয়ের শিকার যুবকের করা মামলা নেয়নি ওসি রাশেদ চৌধুরী। মামলা নিতে চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে। তারপরও নেয়নি মামলা। এরপর, অন্তত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আমি থানায় পাঠিয়েছি ভিকটিমদের।

ওসি মামলা নেয় নাই। জিডি করতে বাধ্য হয়েছে ভিকটিমরা। আমার জিজ্ঞাসা কেন মামলা নেয়নি ওসি? ছিনতাইয়ের কী জিডি হয়? ফেনীতে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে জায়গা দখল করেছে এক কাউন্সিলর, অন্যখানে আর একজন প্রভাবশালী নেতা। তাকে জায়গা দখলে সুরক্ষা দিয়েছে স্বয়ং সদর থানার ওসি।

আমি বাধা দিতে চেয়েছি, আমাকে থামানো হয়েছে। কে থামাতে চেয়েছে সেটা আর না-ই বললাম। ফেনী শহরজুড়ে অনেকগুলো পতিতালয় আছে৷ যেখানে মানুষকে নিয়ে ভিকটিম বানিয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। এবং তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা উদ্ধার করা হয়। এরকম ঘটনা আমার কাছে এসেছে অসংখ্য।

এসব পতিতালয়ের নিয়ন্ত্রক কারা? প্রকাশ্যে জনিকে অস্ত্রসহ ধরার পর পুলিশকে আসতে বলি স্পটে। সেখানে পুলিশ আসে এবং আমাকে সাহায্য করে। আমি পুলিশকে অস্ত্র আইনে মামলা করতে বলি, পুলিশ মামলা করতে অপারগতা জানায়। কেন? আমাকে পুলিশ এও বলে যে আমি ধরেছি আমাকেই মামলা করতে হবে। অথচ পুলিশ আমার সাথেই ছিলো। হাস্যকর না!

ফেনীর এক চেয়ারম্যান আমাকে চোরাচালানের তথ্য দেয়ার জন্য রাজনৈতিক বড় নেতা থেকে শুরু করে সিন্ডিকেটের সবাই তাকে শাসিয়েছে। ডিবির এএসপি আমিনুল তাকে বলেছে সে কীভাবে নির্বাচন করে সেটা সে দেখে নিবে। ফেনীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি জমির মাটি কাটা নিয়ে শুরু করে, মাদক, স্বর্ণ চোরাচালান প্রায় প্রতিটি বিষয়ে যতটা না অপরাধীদের সাথে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এই সিন্ডিকেটের সাথে। ফেনীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রকদের শাস্তি প্রদানে কাজ করতে পারিনি আমি।

একটা বছর ধরে পুরো সিন্ডিকেট মিলে আমাকে পদে পদে বাধা প্রদান করেছে। নির্বাচনে আমার গাড়ি থেকে প্রটেকশন উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সারারাত জেগে আমার পরিবারকে পাহারা দিতে হয়েছে। এই শহরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি চিনি। শহরের প্রতিটি ইটের ভাষাও আমি জানি। সংগ্রামটা অবিশ্বাস্য হলেও শুধু আমার একারই ছিলো, আমি ভয়ানক একাই ছিলাম।

শুধু আমার দুএকজন বস আর ফেনীর সাধারণ মানুষ ছিলো সাথে। তাদের কারণেই এক ইঞ্চি মাঠও ছাড়ি নাই। তবে অনেক সময়ই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না, থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য নিজেকে প্রায়ই অপরাধী মনে হয়। পুরো প্রশাসন হয় উদাসীন, নয় অপরাধের সাথে জড়িত, সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত, অন্যায়ের সাথে, দুর্নীতির সাথে জড়িত। ঔদাসীন্যও এক ধরনের অপরাধ। এদের মুখে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনলে আমার থুতু দিতে ইচ্ছে হত। এগুলো কিছুই সাংবাদিকরা লেখেনি।

আমি লিখতে বলেছি, এরা ভয়ে লেখে নাই। রয়েছে এমন শত শত ঘটনা। এসব ঘটনা বলার কারণ, এগুলো অন্যায়, ভয়াবহ অন্যায়। এই সমাজ এই অন্যায়গুলোর ধারক ও বাহক। এদের কাছে আপনি কীভাবে নুসরাত হত্যার বিচার পাবেন? স্বেচ্ছায় বিদেশে এসেছি পড়তে, দেশে ফিরব পড়াশোনা করে। সরকার চাইলে কাজ করব, নাহলে চাকরি ছেড়ে দিব। প্রত্যয় এটুকুই- যুদ্ধের জীবন চলছে, চলবে। উল্লেখ্য, ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত