বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কী

বাড়িতে বিয়ের কথা বলতে গেলেই ছেলেদেরকে একটা কমন ডায়লগের মুখে পড়তে হয়। ‘বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কী’! মনে হয় বউরা হচ্ছেন পৃথিবীর সব থেকে বড় খাদক প্রাণী। আর তাদের এই খাবারের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায় বিয়ের পরে। এই খাবার সরবরাহের দায়িত্ব এসে পড়ে সেই বেচারা স্বামীর ওপর।

অনার্স, মাস্টার্স শেষ। এখন একটা চাকরি খুঁজছে হন্য হয়ে। এদিকে কলেজ জীবন থেকে যার সাথে মনের লেনাদেনা সেই মনের মানুষটিও আর কিছুতেই অপেক্ষা করতে পারছে না। করবেই বা কী করে। প্রতিদিন একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাবের হিড়িক। এখন তার একটাই কথা ‘হয় আমাকে বিয়ে করো। আর না হয় আমার সন্তানের মুখে মামা ডাক শুনতে প্রস্তুত হও’। অনেক সাহস করে যখন মায়ের সামনে বলতে গেছি- মা বিয়ে করবো। ঠিক তখনি যেন আকাশ ভেঙে পরে বাবা-মায়ের মাথার ওপর। খুব নির্মমভাবে শুনতে হয় সেই কমন ডায়লগ। ‘বিয়ের পরে বউকে খাওয়াবি কী!’

সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদেরকেই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বেশি। তখন মনে একটা প্রশ্ন কাজ করে। আসলেই কী মেয়েরা সবথেকে বড় খাদক? তারা কি বাপের বাড়িতে না খেয়ে থাকে? নাকি স্বামীর বাড়িতে খাওয়ার জন্যে একবেলা খেয়ে দুই বেলা অনাহারে থাকে?

এ তো গেল গ্রাজুয়েশন শেষ কারার পরের কথা। লেখাপড়া চলমান অবস্থায় আমাদের সমাজে যেন বিয়ের নাম মুখে নেয়াটাও পাপ। আচ্ছা একটা জিনিস খেয়াল করেছেন! অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ কিন্তু আগের থেকে অনেক কমে গেছে। লাভ ম্যারেজ তথা পালিয়ে বিয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আবার দিন দিন বাড়ছে ডিভোর্সের সংখ্যাও। যারা পালিয়ে বিয়ে করছেন। একটা সময় তো ঠিকই মেনে নিতে হয় অভিভাবকদের। তবে মাঝখানে কেন এত ঝাক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়?

আবার আসি সেই কথায় “বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কী”-এ। আচ্ছা যদি ছেলে বউয়ের খাওয়া দাওয়াটাই একমাত্র ফ্যাক্ট হয়, তাহলে আপনারা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে বাড়ির ৩/৪ জন সদস্যের রান্না করা খাবারে আর একজন এক্সট্রা থাকলে আনায়াসে হয়ে যায়। আর তাও যদি আপত্তি থাকে তাহলে না হয় আপনার ছেলের খাবারের অংশটুকু আল্লাহ চাহে তো সে আর তার বউ ভাগাভাগি করে খাবে। ছেলের বউ থাকবে স্বামীর ঘরেই, ঘুমোবে স্বামীর বিছানাতেই। কসমেটিক বা প্রাসংগিক কিছু খরচ তো আপনার মেয়ে থাকলে আপনিই করতেনই যথাসাধ্য। আর আপনাকে তো সারাজীবন ছেলে বউ এর দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছে না, কয়েকটা বছর, বড়জোর ২-৩ বছর। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ছেলের ভালোর জন্য এটা কি খুব কষ্টসাধ্য?

যদি খাওয়া দাওয়া ফ্যাক্ট না হয়, ভাবেন যে ছেলের ক্যারিয়ারে এটা প্রতিবন্ধক, তাহলে জেনে রাখুন বিয়েটা ক্যারিয়ারে কোনো প্রতিবন্ধক না। বরং সাপোর্টিভ। ছেলের শিক্ষাঙ্গনের উন্মুক্ত পরিবেশ, অবৈধ রিলেশনশিপের ব্যাপকতা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা এগুলোই বরং ক্যারিয়ারের জন্য প্রতিবন্ধক, বিপজ্জনকও বটে। অভিভাবকরা কি জানেন? তার ছেলে মেয়ে কখন কোথায় যায়? কী করে? কখন কার সাথে পার্কে ঘুরতে যায়!

স্বাভাবিকভাবে একটা ছেলে/মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির গন্ডি পেরোতেই তার মাঝে ভালোলাগা, ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। বর্তমানে ভার্চুয়াল সংস্কৃতি এটাকে আরো সহজ করে দিয়েছে। ফেসবুক ইন্টারনেট সব কিছুই আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। যার ফলে একটা রিলেশন তৈরি করা খুব সহজ হয়ে পড়েছে। আগে যখন ইন্টারনেট বা মোবইল ফোন হাতের নাগালে ছিল না তখন হয়তো শুধুমাত্র চিঠি-পত্রের মাধ্যমে একটা রিলেশন জড়ানো এতটা সহজ ছিল না। কিন্তু এখন সবকিছুই আমাদের হাতের মুঠোয়। তাইতো ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়া ছেলে-মেয়েদেরও উধাও হওয়ার খবর আসে পত্র-পত্রিকায়।

এবার একটু শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে খেয়াল করি, প্রকৃত অর্থে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের নিদৃষ্ট কোনো বয়স উল্লেখ করা হয়নি। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মাঝে যার কোনো (পুত্র বা কন্যা) সন্তান জন্ম হয় সে যেন তার সুন্দর নাম রাখে এবং তাকে উত্তম আদব কায়দা শিক্ষা দেয়; যখন সে বালেগ অর্থাৎ সাবালক/সাবালিকা হয়, তখন যেন তার বিয়ে দেয়; যদি সে বালেগ হয় এবং তার বিয়ে না দেয় তাহলে, সে কোনো পাপ করলে উক্ত পাপের দায় ভার তার পিতার উপর বর্তাবে। (বাইহাকি ৮১৪৫)মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমের সূরা নূরের মধ্যে এরশাদ করেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”

এখানে যে ব্যাক্তি চরিত্র রক্ষার্থে বিয়ে করতে চান, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাকে রিজিক সহ যাবতীয় ব্যাপারে সাহায্য করার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। তাহলে অভিভাবক হয়ে কেন একটু সহানুভূতি দেখাতে পারছেন না? আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা কি যথেষ্ট নয়? আপনি বলতে চাচ্ছেন, চাকরি বাকরি কিছু একটা হোক তারপর বিয়ে! আল্লাহ রব্বুল আলামিনের এই বাণিতে কি আপনার কোনো ভরসা নেই?

এছাড়াও ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করার মধ্যে রয়েছে অনেক উপকারিতাও। ছাত্রবস্থায় বিয়ে করে ভালোবাসার প্রিয় মানুষটি জীবনসঙ্গিনীটি আপনার সন্তানের কাছে থেকে ক্যারিয়ারের ব্যাপারে যখন উৎসাহ দিবে, তখন সে পাবে একমুঠো পবিত্র ভালোবাসার হৃদয়স্পর্শী উৎসাহ, আর দায়িত্বশীলতা যখন ঘাড়ে চলে আসবে সে নিজে নিজেই ক্যারিয়ার গঠনে আরো উঠে পড়ে চেষ্টা করবে। বিয়ে করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা কোনো প্রতিবন্ধকতাই নয়।

বরং ভালো ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের বিশ্বস্ত সহযোগী। হয়তো ভার্সিটি লাইফ শেষে এখন থেকে ২/৩ বছর পরে আপনার ছেলে বিয়ের সামর্থ্য লাভ করবে, কিন্তু এখন যদি আপনারা সাহায্য করেন তাহলে এই নশ্বর জীবনে কিন্তু তার মহামুল্যবান ২-৩ বছর নষ্ট হবে না, তার দ্বীনও অর্ধেক পূরণ হবে, সে আপনাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ থাকবে। তবে আমরা এই সহজ বিষয়টাকে জটিল করে তুলছি কেন? আরে ভাই, অনার্স পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী প্রেম তো করছেই? তবে সেটা হালালভাবে করলে সমস্যাটা কোথায়?

আর একটা রিলেশনে এমনিতেই যত ব্রেকাপ/ভাঙন হাবিজাবি। সে হিসেবে রেজিঃ/কাবিন করে রাখলে সেই ব্রেকাব ভাঙন হাবিজাবির হাত থেকে তো রক্ষা পাওয়া যাবে নাকি? রেজিস্ট্রেশন করা থাকলে তারাও হালালভাবে প্রেম চালিয়ে যেতে পারবে। তখন আর লুকিয়ে পার্কে ডেটিং করতে হবে না। প্রকাশ্য প্রেম করবে। কেউ কিছু বলবে না।

সব থেকে বড় কথা হচ্ছে আপনার সন্তানের নৈতিক চরিত্র। এই পলিসিতে অন্তত ডাস্টবিন থেকে আর নবজাতকের লাশ উদ্ধার হবে না। আর কোনো ভার্সিটির হলে ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ শুনতে হবে না। পেটে অবৈধ সন্তানের লজ্জা নিয়ে আর কোনো বোনকে দিতে হবে না গলায় দড়ি।

তবে কেন আমরা এই সহজ বিষয়টাকে এত জটিল করে নিচ্ছি? আমরা কি পারি না বিয়ে নামক জটিল ধারনাটাকে সহজ করে দিতে। পারি না একটি অশ্লীলতা, চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে! এর জন্য প্রয়োজন শুধু একটু সহানুভূতির। একটি সুন্দর মানসিকতার। বিষয়গুলো একটু মন থেকে খেয়াল করুন। আমাদের অভিভাবকদের একটু সহানুভূতি ও সুন্দর মানসিকতাই পারে একটু সুন্দর সমাজ উপহার দিতে।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত