যেভাবে শ্লীলতাহানি চেষ্টার ঘটনাকে নাটক বানাতে চেয়েছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি (ভিডিও)

অধ্যক্ষ দ্বারা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে আরেক দফা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত।

এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিওটি করেছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি নিজেই।

ভিডিওটি প্রকাশের পর ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে একজন নারীর অভিযোগ নেয়ার সময় তার অনুমতি না নিয়ে এমন ভিডিও করা যাবে কিনা! আইন কী বলে?

তাছাড়া ভিডিওতে পাওয়া যায়নি কোনো নারী পুলিশ বা নারী আইনজীবীর অস্তিত্ব। এমন অভিযোগের সময় নারী পুলিশের অনুপস্থিতি বিষয়েও নজর পড়েছে সচেতনদের।

এসব প্রশ্নে ইতিমধ্যে আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ভিডিও ধারণের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, আইন না মেনে কারোর ভিডিও করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘ভিডিও করা তো দূরে থাক, অভিযোগকারীকে হেনস্তামূলক কোনো প্রশ্ন করার অধিকারও ওসির নেই।’

তিনি আরও বলেন, অভিযোগকারীর বক্তব্য শুনে যদি মনে হয়, মামলাটি নেওয়ার মতো তাহলে ওসি মামলাটি নেবেন। আর ওসি মামলা না নিলে অভিযোগকারী কোর্টে গিয়ে নালিশ করবেন।’

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৬ ধারা অনুসারে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন সোনাগাজী থানার ওসি।

নুসরাতের পরিবার চাইলে সোনাগাজী থানার ওসির বিরুদ্ধে ওই ধারায় মামলাও করতে পারবেন বলে জানান এই আইনজীবী।

এ বিষয়ে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা জানান, ‘ সুনির্দিষ্ট আইনিপন্থা না মেনে অশালীন উপায়ে এ ধরনের কোনো ভিডিও করা মানে এটি তার ব্যক্তিগত বিচ্যুতি। তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।’

ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন নুসরাত। আর সেই কান্নার ভিডিও করছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি। নুসরাত তার মুখ দু’হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ভেতরে নুসরাতকে জেরা করা হচ্ছে- ‘কিসে পড়া? ক্লাস ছিল?’ ঘটনা জানাতে গিয়ে নুসরাত বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সে সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হয়- ‘কারে কারে জানাইসো বিষয়টা?’

নুসরাত যখন জানায়- তাকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। তখন প্রশ্ন করা হয়- ‘ডেকেছিল, নাকি তুমি ওখানে গেছিলা?’ পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল বলে নুসরাত জানালে প্রশ্ন করা হয়- ‘পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল? পিয়নের নাম কী?’ নুসরাত সে সময় পিয়নের নাম বলেন- ‘নূর আলম।’

পুরো ভিডিও জুড়েই নুসরাত কাঁদছিলেন। একসময় ভিডিওধারণকারী তাকে ধমকের সুরে বলে- ‘কাঁদলে আমি বুঝবো কী করে, তোমাকে বলতে হবে। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে কাঁদতে হবে।’

ভিডিও’র শেষে নুসরাতের কথা বলা শেষ হলে ধারণকারী বলেন- ‘এইটুকুই?’ আরও কিছু অশালীন উক্তির পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ করে বলেন- ‘এটা কিছু না, কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব। কিছু হয়নি। রাখো। তুমি বসো।’

সবশেষ নুসরাত আকুতি করে বলে, আমি আর বাঁচব না স্যার।

দায়িত্বে অবহেলার দায়ে গত ৯ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কে এই ভিডিও করেছিল প্রশ্নে সোনাগাজী থানার ওসি (তদন্ত) বলেছেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আজকে অনেকে বিষয়টি জানতে চেয়ে ফোন করায় আমি জানতে পেরেছি।’

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত