মালয়েশিয়া থেকে কাঁদতে কাঁদতে দেশে ফিরছেন প্রবাসীরা

সহায় সম্বল বিক্রি করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে মালয়েশিয়ায় এসেও ফিরতে হলো বাংলাদেশিদের। প্রতারণা যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশি কর্মীদের। আর প্রতারণার মাস্টার মাইন্ডরা সব সময় থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাঁদতে কাঁদতে মালয়েশিয়া বিমানবন্দর ছাড়লেন বাংলাদেশিরা।

কে করবে এসব মাস্টারমাইন্ডের বিচার? স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে আড়াই দিন না খেয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে ১৩ অক্টোবর রাতে ৬৫ জন অসহায় কর্মী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে এসেছেন। মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিক বিমানবন্দর থেকে এসব কর্মীকে নিতে না আসায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফিরতি ফ্লাইটে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে অসুস্থ কর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা প্রতারক প্রান্তিক ট্রাভেলসের মালিক গোলাম মুস্তাফা ও মালয়েশিয়ার দালাল ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের জোর দাবি জানিয়েছেন।

বিমানবন্দর কল্যাণ ডেক্সের উপ-পরিচালক তানভীর আহমেদ এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দশ সিন্ডিকেটের একটি প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের মাধ্যমে গত ১১ অক্টোবর এসব কর্মী সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন।

প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটের পার্টনার আরিফ আলম এসব কর্মীদের মালয়েশিয়ার দালাল ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান খানকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সুপার ম্যাক্স গ্লোভ ম্যানুফেকচারিং এসডিএন বিএইচডি থেকে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র এনে প্রান্তিক ট্রাভেলসের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাঠায়।

মালয়েশিয়ার দালাল বাদলুর রহমান খান দেশটির স্থানীয় এজেন্ট এ্যারেকলীকে কোনো টাকা পরিশোধ না করে গা-ঢাকা দেয়। এ নতুন কিছু নয়! বিগত দিনগুলোতেও ‘আয়ারল্যান্ডে’ পাঠানোর নাম করে হাজার হাজার শ্রমিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ রিঙ্গিত হাতিয়ে নেয় এই প্রতারক বাদল।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘বাদলুর রহমান আগামী সংসদ নির্বাচনে কালিহাতী থেকে বিএনপির হয়ে নমিনেশনের জন্য ঘুরছেন! ব্লাকমানি সাদা করতে এমপি হওয়াটা তার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে বলে অনেকেই বলছেন।’

এসব কর্মীদের কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে গ্রহণের জন্য সুপার ম্যাক্স কোম্পানিকে অবহিত করেনি বাদল। ফলে কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সুপার ম্যাক্স কোম্পানির লোকজনকে না পাওয়ায় চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়। বিমানবন্দরে এসব কর্মী প্রায় আড়াই দিন না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কুয়ালালামপুর থেকে চান্দিনার আমান উল্লাহ, মিন্টু মিয়া, ফারুক হোসেন, আলাউদ্দিন, কালা ফারুক এ তথ্য জানিয়েছেন। কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপার ম্যাক্স কোম্পানিকে চাপ দিয়ে ৬৫ জন কর্মীর বিমানের ফিরতি টিকিট ক্রয় করে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

মালয়েশিয়া অভিবাসন আইনের ৮(৩) ১৯৫৯/৬৩ ক্ষমতা বলে আসা ওই ৬৫ জন শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়। এক শ্রেণির রিক্রুটিং এজেন্সির ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর পদ্ধতি ‘জি-টু-জি’ (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)। কম খরচে ও অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনে কর্মী পাঠানোর সরকারের এ উদ্যোগ ব্যর্থ করতে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে কতিপয় আদম ব্যবসায়ী।

মালয়েশিয়ার নিয়োগকারীদের ম্যানেজ করে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে দেশের সরকারের নীতি-নির্ধারকদের পাশ কাঠিয়ে কর্মী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর গতি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে ও জি-টু-জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় আসা নতুন কর্মীদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে এসব তথ্য। আদম ব্যবসায়ীদের এই অপতৎপরতা অব্যাহত থাকলে আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে তৈরি জনশক্তি রফতানিকারক ১০ প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে সাড়ে ৫ হাজার কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শুধু তারাই নয়, শত শত কর্মী মালয়েশিয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার সরকার-নির্ধারিত খরচের চেয়ে প্রতিজনে খরচ হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অর্থাৎ, একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে নির্ধারিত খরচের ১০ থেকে ১৫ গুণ টাকা গুণতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, খরচের বিষয়ে তাদের মুখ খুলতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। মুখ খুললে তাকে আর মালয়েশিয়া পাঠানো হবে না। এমন কি জমাকৃত টাকাও ফেরত দেয়া হবে না। নানা কারণেই কর্মীরা সরকার নির্ধারিত খরচের কথাই সব জায়গায় বলে যায়। বাড়তি ৫ লাখ টাকা আড়াল হয়ে যায়। সিন্ডিকেটের এমন ভয়ে দেশের লাখ লাখ তরুণ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

ভুক্তভোগী অনেকেই হতাশার সুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা খুব শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যা করছে তা কোনো মানুষের কাজ না। দানবেও এমন নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে না। দেশের গরিব মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কর্মীরা সেখানে খেয়ে পরে এক পয়সাও বাড়িতে পাঠাতে পারে না। যে চাকরির কথা বলে তাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছে তার ধারের কাছেও কেউ চাকরি পায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী বলেন, আপনাদের হাতে কলম আছে-আপনারা এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির বিরুদ্ধে লেখেন। দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হবে না।

এদিকে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী ও শ্রমিকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনিভাবে বাড়ছে নানা সঙ্কট ও সম্ভাবনাও। খুব শিগগিরই এসব সমস্যা নিরসন করে সম্ভাবনাগুলো কাজে না লাগালে মালয়েশিয়ার এই বৃহৎ শ্রমবাজারে বাংলাদেশ কাঙ্খিত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত