ইসলামি শরিয়া আইন চালুর পর ব্রুনাইতে সুলতানের সব হোটেল বয়কট

ব্রুনাইতে ইসলামি শরিয়া ভিত্তিক আইন চালুর পর দেশটির সুলতানের মালিকানাধীন হোটেল বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন বহু তারকাসহ যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসের কর্মকর্তারা। ব্রুনাই বুধবার সমকামিতাসহ বিবাহ বহির্ভূত যৌনতার মতো অপরাধে পাথর ছুড়ে শাস্তির কঠোর আইন চালুর ঘোষণা দেয়। এর পর হলিউডসহ অন্যান্য অনেক তারকা এবং রাজনীতিবিরা বিলাসবহুল ওইসব হোটেল বয়কটের ডাক দিলেন।

ব্রুনাই অর্থনৈতিকভাবে অনেক সমৃদ্ধশালী। দেশটির সুলতান বিশ্বের কয়েকপি দেশে বেশ কয়েকটি শীর্ষ হোটেলের মালিক। এর মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত ৯ টি হোটেলের দু’টিতে হলিউডের হেভিওয়েটদের আনাগোনা আছে। সময়ে সময়ে সেখানে বিনোদোনমূলক বিশেষ অনুষ্ঠানও হয়। এর একটি হচ্ছে বেভারলি হিলস এবং লস এঞ্জেলেসের হোটেল বেল-এয়ার।

অন্যান্য হোটেলগুলোর মধ্যে আছে লন্ডনের ডর্চেস্টার এবং প্যারিসের হোটেল প্লাজা এথিনি। হলিউড তারকা জর্জ ক্লুনি এক টুইটে লিখেছেন, যতবারই আমরা ৯টি হোটেলের কোনোটাতে থাকি, বৈঠক করি কিংবা খাওয়া দাওয়া করি ততবারই আমরা সরাসরি এমন একজন মানুষের পকেটে অর্থ ঢালি যিনি তার দেশের নাগরিকদেরকে সমকামিতা কিংবা ব্যাভিচারের অভিযোগে পাথর ছুড়ে কিংবা বেত্রাঘাত করে মৃত্যু দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।

তবে ক্লুনি বলেন, ওই হোটেলগুলো বয়কট করলেও ব্রুনাই রাজ এতে লজ্জ্বা পাবেন বলে তিনি মনে করেন না। তবে তাদের সঙ্গে যারা ব্যবসা করে, বিনিয়োগ করে তাদেরকে এর মাধ্যমে লজ্জ্বায় ফেলা যেতে পারে এবং অন্যদিকে তাকানোর রাস্তা বেছে নেওয়া যেতে পারে।

মার্কিন টেনিস তারকা বিলি জিন কিং বুধবারই সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, #ব্রুনাইয়ে আজ নৃশংসতা শুরু হল। এর আগে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সঙ্গীতশিল্পী এলটন জন বলেছিলেন, তিনি অনেকবছর ধরেই লন্ডনের ডর্চেস্টার হোটেলে আর থাকেন না।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাইয়ে বুধবার ইসলামি শরিয়া আইন চালু হয়েছে। এ রাষ্ট্রটির সুলতান হাসানাল বলকিয়া এ আইন চালুর ঘোষণা দেন।

নতুন এ আইনে সমকামিতা ও ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। তবে সমকামিতা অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিল ব্রুনাইয়ে। সমকামিতা নিষিদ্ধ করে এর শাস্তির বিধান করা হয়েছিল ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

দেশটির সমকামিতার সমর্থকরা এটাকে ‘মধ্যযুগীয় শাস্তির বিধান’ হিসেবে অভিহিত করে উদ্বেগ জানিয়েছে। দেশটিতে ৮০ শতাংশ মুসলিম রয়েছে।

ব্রুনাইতে নতুন শরিয়া দণ্ডবিধি অনুযায়ী, অভিযুক্তরা যদি নিজেদের সমকামী বলে স্বীকার করেন অথবা অন্তত চারজন প্রত্যক্ষদর্শী তাদের এ ধরনের কাজ করতে দেখেন তবেই তাদের সমকামিতার দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে। তাছাড়া চুরির দায়ে অঙ্গচ্ছেদের মতো দণ্ডও রাখা হয়েছে আইনটিতে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশটির এক সমকামী ব্যক্তি বিবিসিকে বলেছেন, ঘুম থেকে ওঠার পর আপনি অনুভব করলেন প্রতিবেশীরা, আপনার পরিবারের সদস্যরা এমনকি রাস্তার পাশে বসে ভাজা চিংড়ি বিক্রি করা ওই সুন্দরী বৃদ্ধা নারীটিও আপনাকে আর মানুষ বলে ভাবছে না আর তারা পাথর ছুড়ে মারার সঙ্গে একমত।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক নিন্দা

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনানুযায়ী, যে কোনো পরিস্থিতিতে পাথর ছোড়া, অঙ্গচ্ছেদ অথবা বেত্রাঘাত, আইনি সংস্থাগুলোর হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনসহ সব ধরনের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্বাক্ষর করলেও ব্রুনেই দারুস সালাম এখনও নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক শাস্তির বিষয়ে ঘোষণাপত্র অনুমোদন করেনি। ২০১৪ সালে জাতিসংঘে দেশটির মানবাধিকার-সংক্রান্ত পর্যালোচনায় ওই ঘোষণাপত্রের সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করে তারা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মূল ঘোষণাপত্রে যে কোনো ধরনের নির্যাতনসহ ও অন্যান্য নিষ্ঠুর শাস্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ঘোষণা প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এর অধিকাংশ ধারাগুলোই অনুমোদন করেনি ব্রুনাই।

এদিকে ব্রুনাইয়ের এই শরিয়া দণ্ডবিধির প্রথম অংশটি ২০১৩ সালে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।

দণ্ডবিধির মুলতবি বিধানগুলোতে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের নামে শিশুসহ যে কাউকে ঢিল ছুড়ে হত্যা ও অঙ্গচ্ছেদের শাস্তি দেওয়া যাবে। এ আইন নিয়ে ব্রুনাইয়ের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেছেন। তারা এখান থেকে ফিরে আসারও আহ্বান করেন।

সূত্র: বিবিসি ও এএফপি।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত