বায়ু দূষণে মৃত্যুহারে বাংলাদেশ পঞ্চম

প্রতিবছর বাড়ছে বায়ু দূষণে মৃত্যুহার। দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বুধবার (০৩ এপ্রিল) প্রকাশিত বৈশ্বিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ (এসওজিএ-২০১৯) প্রতিবেদনটি যৌথভাবে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনস গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ প্রজেক্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ু দূষণে ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে। বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ু দূষণ।

দূষণে মৃত্যুর হারের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। ২০১৭ সালে বায়ু দূষণে বাংলাদেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

এসওজিএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ু দূষণের জন্য মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বিশ্বের যে ১০টি দেশে, তার মধ্যে এশিয়ার দেশই রয়েছে ৬টি। বাংলাদেশ ছাড়াও সেই তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, চিন ও ফিলিপিন্স। ওই তালিকায় আফ্রিকার একটি দেশ রয়েছে, নাইজিরিয়া। আর রয়েছে আমেরিকা, রাশিয়া ও ব্রাজিল।

বায়ুদূষণে মৃত্যুহারে শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত। ২০১৭ সালে চীনে বায়ু দূষণে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ। ভারতেও সংখ্যাটা একই, ১২ লাখ।

২০১৭-য় বায়ুদূষণে পাকিস্তানে মৃতের সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ২৮ হাজার। ইন্দোনেশিয়ায় ওই বছর বায়ুদূষণে মৃত্যু হয়েছিল ১ লক্ষ ২৪ হাজার মানুষের। ফিলিপিন্সে সেই সংখ্যাটা ছিল ৬৩ হাজার।

যারা বায়ু দূষণের সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও জ্বালানির উদ্ভাবন করে চলেছে, সেই আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলিতেও ২০১৭ সালে মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ লক্ষ ৮ হাজার এবং ৯৯ হাজার। ২০১৭-তে ব্রাজিলে বায়ুদূষণের কারণে মারা গিয়েছিলেন ৬৬ হাজার মানুষ।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ সর্বোচ্চ পিএম ২ দশমিক ৫ মাত্রার বায়ুদূষণের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশের বাতাসে ২০১৭ সালে পিএম ২ দশমিক ৫-এর উপস্থিতি ছিল ৬১ মাইক্রোগ্রাম।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিসূক্ষ্ম পিএম ২ দশমিক ৫ সহজেই মানুষের শ্বাসতন্ত্রে ঢুকে পড়ছে, পরবর্তী সময়ে যা পুরো শরীরকে আক্রান্ত করছে। এ থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এ বস্তুকণা মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধি সৃষ্টি করছে। দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বায়ুদূষণে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে শিশুরা। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের তথ্য বলছে, বায়ুদূষণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের গড় আয়ু ২০ মাস কমে যেতে পারে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বায়ুদূষণের কারণে হাসপাতালে ভর্তির হার ও অক্ষমতা বেড়েছে। এছাড়া শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এমনকি নিউমোনিয়ার মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যু বেড়েছে। বিশ্বে ফুসফুসজনিত জটিলতার কারণে ৪১ শতাংশ, টাইপ টু ডায়াবেটিসের কারণে ২০, ফুসফুস ক্যান্সারে ১৯, হৃদরোগে ১৬ এবং স্ট্রোকের কারণে ১১ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণ।

প্রতিবেদনটিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বায়ুদূষণ তিন নম্বরে ঠাঁই পেয়েছে। ধূমপানের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বায়ুদূষণের থেকে কম। এসওজিএ রিপোর্ট আরও বলছে, অপুষ্টি, মদ্যপান, ম্যালেরিয়া, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনার চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন বায়ুদূষণের কারণে।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী অভ্যন্তরীণ দূষণ, ইটভাটা ও নির্মাণকাজ। ইটভাটার কারণে বাতাসে সূক্ষ্ম নানা ধরনের ধূলিকণা মিশে যায়। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দুই পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা, সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে। ফলে বাড়ছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত