মসজিদে হামলাকারীর পরিবার পুলিশে ফোন করেছিলো!

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ৪৯ জনকে হত্যাকারী ব্রেন্টন হ্যারিসন টেরেন্ট এর পরিবার তাদের সন্তানের কাণ্ড দেখার পর পুলিশে ফোন করেছিলো। তারা পুলিশকে তাদের সন্তানের কর্মকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ব্রেন্টনের পরিবার অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস এর গ্রাফটন শহরে বাস করে।

নিউ সাউথ ওয়েলস এর পুলিশ কমিশনার মাইক ফুলার বলেন, খুনি ব্রেন্টন গত চার বছরে অস্ট্রেলিয়ায় খুব কম সময়ই অবস্থান করেছিলেন। আর পুলিশও তাকে খুব একটা চিনতো না। কয়েকবার মাত্র তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করার অভিযোগ এসেছিল।

তবে এখন তার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তের পরে তার বিরুদ্ধে আরো গুরুতর কিছু অভিযোগও আনা হতে পারে।

টেরেন্ট অনলাইনে তার মতাদর্শ সম্পর্কে ৭৩ পৃষ্ঠার যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিলেন তাতে তিনি নিজেকে ‘একজন সাধারণ শেতাঙ্গ পুরুষ’ বলে বর্ণনা করেন।

টেরেন্ট জানান তিনি ‘শ্রমিক শ্রেণির, নিম্ন আয়ের পরিবারে’ জন্ম গ্রহণ করেছন। ‘যে কিনা তার নিজ জনগণের ভবিষ্যত নিরাপদ করার জন্য একটি বিশেষ মতাদর্শিক অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

টেরেন্ট বলেছে, ‘ইউরোপীয়দের দেশগুলোতে অভিবাসনের হার সরাসরি কমানোর জন্যই সে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’

স্কাই নিউজ জানিয়েছে, গ্রাফটন শহরের মানুষেরা তার মতো একজন নম্র-ভদ্র ও শিষ্টাচার সম্পন্ন তরুণ এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে শুনে হতবাক হয়ে গেছেন।

স্থানীয়রা জানান টেরেন্ট স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করতো। এবং একটি জিমে কাজ করতো। ওই জিমে তার সাবেক বস জানান, টেরেন্ট শিশুদেরকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণও দিতো।

২০১০ সালে তার বাবা হঠাৎ করেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পরের ৭ বছর টেরেন্ট বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে।

তার সাবেক বন্ধুদের ধারণা ওই ৭ বছর সময়কালেই টেরেন্ট উগ্র কোনো মতবাদে দীক্ষিত হয়।

স্কাই নিউজ জানিয়েছে, গ্রাফটন শহরে বসবাসকারী তার পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে পড়েছে। তারা এখন পুলিশকে তাদের খুনি সন্তানের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্তে সহায়তা করছেন।

টেরেন্টের টুইটার অ্যাকাউন্টে ২০১৬ সালে ফ্রান্সে নিসে বাস্তিল দিবসে জঙ্গি হামলায় নিহত একজনের ছবি ছিলো। ছবিটি তুলেছিলেন রয়টার্স এর ফটোগ্রাফার এরিক গেইলারর্ড। সেদিন এক ইসলামি জঙ্গি নিসের রাস্তায় উৎসবরত জনতার ওপর দিয়ে ট্রাকলরি চালিয়ে দিলে ৮৪ জন নিহত হয়।

টেরেন্ট জানায়, নিউজিল্যান্ডে মসজিদে তার হামলার উদ্দেশ্য ছিলো, ‘আগ্রাসনকারীদেরকে এটা দেখানো যে, আমাদের ভুমি কখনোই তাদের হবে না। আমাদের দেশ শুধু আমাদেরই। আর একজন শেতাঙ্গ মানুষ বেঁচে থাকা পর্যন্ত তারা কখনোই আমাদের দেশ দখল করতে পারবে না। তারা কখনোই আমাদের মানুষদের জায়গা নিয়ে নিতে পারবে না।’

টেরেন্ট অনলাইনে প্রকাশিত তার ইশতেহারে আরো জানায়, সে গত ২ বছর ধরেই মুসলিমদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলো। আর তিন মাস আগে সে ক্রাইস্টচার্চে হামলার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

টেরেন্ট বলেন, হামলার জন্য নিউজিল্যান্ড তার আসল পছন্দ ছিলো না। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের আর যে কোনো জায়গার চেয়ে নিউজিল্যান্ডে হামলা করলেই বেশি নজর কাড়া যাবে; এই চিন্তা থেকেই সে এখানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। তার ভাষ্যমতে, ‘নিউজিল্যান্ডের মুসলিমদের ওপর হামলা করলেই আমাদের সভ্যতার ওপর আগ্রাসনের প্রকৃত চিত্রটা সবার নজরে আসবে। তারা তখন দেখতে পারবে নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তিপূর্ণ জায়গাও আর মুসলিমদের হাত থেকে নিরাপদ নয়। তারা আমাদের সব দেশগুলোতেই হাজির আছে। এমনকি পৃথিবীর একেবারে শেষপ্রান্তটিও মুসলিমদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সেখানেও তারা গণহারে অভিবাসিত হচ্ছে।’

নিজেকে কোটি কোটি ইউরোপীয় মানুষ এবং অন্যান্য পশ্চিমা নৃতাত্বিক জাতীয়তাবাদীদের প্রতিনিধি দাবি করে টেরেন্ট বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের নিজেদের জনগণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং শেতাঙ্গ শিশুদের ভবিষ্যত নিরাপদ করতে হবে।’

টেরেন্ট তার ওই হামলাকে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ভিনদেশি মুসলিমদের হামলার ফলে যে শত-সহস্র মানুষ মরেছে তার বদলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামি আগ্রাসনকারীরা অতীতে ইউরোপে হামলা চালিয়ে লাখ লাখ মানুষকে দাস বানিয়েছিলো; তার বদলা নিতেই এই হামলা। আর ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ইসলামি সন্ত্রাসীদের হামলায় যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলো তারও বদলা নিতে এই হামলা। এমনটাই দাবি টেরেন্টের।

সে আরো বলে, ২০১৭ সালে সুইডেনের স্টকহোমে সন্ত্রাসী হামলায় এবা অ্যাকারলুন্ড নামের যে ১১ বছর বয়সী মেয়েশিশু নিহত হয়েছিলো তার প্রতিশোধ নিতেও এই হামলা।

নিজের ইশতেহারে টেরেন্ট আরো বলে, স্টকহোমের ওই হামলার কারণেই সে এই হামলা চালানোর অনুপ্রেরণা পায়। বিশেষ করে ওই ১১ বছরের মেয়েশিশুটির মৃত্যু তাকে পীড়িত করে।

অথচ ওই মেয়েটির মা জেনেট অ্যাকারলুন্ড আজ সুইডেনে এসভিটি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে টেরেন্টের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এবা যেসব মূল্যবোধ ধারণ করতো সেসবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়েছে টেরেন্টের এই হামলা।

২০১৭ সালে ফ্রান্স ভ্রমণ থেকেও তিনি এই হামলার অনুপ্রেরণা পান বলে দাবি করেন টেরেন্ট। টেরেন্ট বলেন, গত কয়েকবছর ধরে আমি শুধু শুনছিলাম ফ্রান্সে অশেতাঙ্গরা আগ্রাসন চালাচ্ছে। কিন্তু আমি সেসব বিশ্বাস করতাম না। আমার কাছে সেসবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত গালগপ্পো মনে হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে ফ্রান্স ভ্রমণের পর আমি দেখতে পেলাম যে সেসব মিথ্যা নয়। ফ্রান্সের প্রতিটি শহরেই আমি অশেতাঙ্গ আগ্রাসনকারীদের দেখতে পাই।

সূত্র: স্কাই নিউজ

পাঠকের মতামত