সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে

বাংলাদেশ এখন একটা সন্ধিক্ষণে এসেছে। আমরা দেখেছি যে ধারাবাহিকভাবে আমাদের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি খাতে কাজ হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা খুব ভালো লক্ষণ। ৬-এর ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা ৭-এ চলে এসেছি। ভবিষ্যতে এটা আরো বৃদ্ধি পাবে। এখন আমাদের করণীয় হচ্ছে—প্রবৃদ্ধিটা বাড়াতে হবে। আমরা যদি সমতাভিত্তিক এবং সত্যিকারের উন্নয়ন চাই, তাহলে প্রবৃদ্ধিটা বাড়ানোর জন্য জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নের ফসলটা যেন সবার কাছে পৌঁছায়, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এত দিন কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। সেটা ভালো দিক। সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এটার দরকার। আমি বলব যে সঙ্গে সঙ্গে এর সুফলটা যদি সাধারণ মানুষ না পায়, তাহলে কিন্তু সত্যিকারের উন্নয়ন হয় না। এর ধারাবাহিকতায় আমরা বলব যে ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক যে সূচক তাতে যে উল্লম্ফন দেখেছি, এর নেতিবাচক যে ফল—সম্পদ এবং আয়ের বৈষম্যটা বেড়েছে। এ বিষয়টির প্রতি নজর দিতে হবে। খুব সম্প্রতি কতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানও বলছে, এই বৈষম্যটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু সত্যিকার সার্বিক উন্নয়ন নয়। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমাদের লক্ষ্য ছিল। এ দুটি জিনিস আমাদের একসঙ্গে অর্জন করার কথা ছিল।

আশার কথা হচ্ছে, এখন ক্ষেত্রগুলো তৈরি হয়েছে। আমাদের দ্রুত এই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে। সমানভাবে দৃশ্যমান হয় এমন সামাজিক উন্নয়ন এবং সুশাসনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এসব বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সামনে এখন অনেক সম্ভাবনা আছে। পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। প্রথমে যেটা করা দরকার—সঠিক নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে। সঠিক নীতি বলতে সামাজিক উন্নয়ন, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন সুবিধা এবং সামষ্টিক অর্থনীতি। তার মানে ভারসাম্যপূর্ণ একটা নীতি গ্রহণ করা এবং সেসব চলমান রাখতে হবে।

কিন্তু এসব বাস্তবায়ন নির্ভর করে সাধারণত আমাদের দেশের নীতি ও কৌশল যদি অনেক ভালো থাকে। এ ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া দুর্বলতম দিক। কাজের কথা হচ্ছে, নীতির বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দরকার সঠিক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ লোক, নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এসব যদি সঠিকভাবে করা যায়, তাহলে আমাদের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি সুন্দরভাবে এগোতে পারবে। শতভাগ বাস্তবায়ন হয়তো সম্ভব হবে না, তা কোনো জিনিসই হয় না। কিন্তু ৮০ বা ৯০ শতাংশ যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বলা যেতে পারে কাজটা ফলপ্রসূ হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে, যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন এবং উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠান, যেমন বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

পরের ধাপে আছে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই সঙ্গে বাজার—যেটাকে আমরা মার্কেট বলছি, যোগাযোগব্যবস্থা সেগুলো। এগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে সামাজিক উন্নয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। কাজেই এগুলোকে ঠিক করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।

একটা কথা আমরা বারবারই বলে আসছি যে রিফর্ম বা সংস্কার দরকার। আর সংস্কারটা হতে হবে নিয়মিত। এটা কিন্তু আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। সংস্কার কী কী করা দরকার এবং কোথায় করতে হবে এগুলো কিন্তু জানা। কাজেই এগুলোকে আবিষ্কার করার কিছু নেই। যাঁরা কাজ করবেন এবং যাঁরা দায়িত্বশীল তাঁরা জানেন, কোন কোন খাতে সংস্কার করতে হবে। এ জন্য যেটা করতে হবে—দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে এবং তাদের নায্য মজুরি ও প্রণোদনা দিতে হবে। আমাদের শ্রম খাতে সংস্কার কিন্তু পিছিয়ে আছে। যে কারণে প্রায়ই গার্মেন্ট খাতে কয়েক দিন পর পর অসন্তোষ দেখা যায়। এরপর ব্যাংকিং এবং ইনস্যুরেন্স সেক্টর, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করার জন্য যে সংস্কার দরকার, সেসব থেমে আছে। আর বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা সামাজিক সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, সেসবের অনেকই জরুরি সংস্কার দরকার। এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে সামষ্টিক ও সমতাভিত্তিক উন্নয়ন অনেক এগিয়ে যাবে।

সব মিলিয়ে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে—সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষা, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা খাতের সেবাটা বাড়াতে হবে, যে উন্নয়নগুলো মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনকে স্পর্শ করে। সঙ্গে জীবনের মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো মানুষের জীবনের চালিকাশক্তি। সামষ্টিক উন্নয়নের ভেতরে এগুলোও অন্তর্ভুক্ত।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ শিক্ষিত তরুণসমাজ। যাদের জন্য কর্মসংস্থান অপ্রতুল। যারা কম শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত, তারা তবুও মার্কেটে বা দেশের বাইরে শ্রম বিনিয়োগ করে কিছু কাজ করছে এবং আয় করছে; কিন্তু যারা শিক্ষিত তরুণ, তারা সেভাবে কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। অতএব কর্মসংস্থানমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং তাদের জন্য ব্যবসার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য এ ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে। জবলেস গ্রোথ বা জিরো জবলেস গ্রোথের কোনো মানে হয় না। এটা কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না।

আমাদের যে প্রবৃদ্ধি, সেটা সবচেয়ে বেশি আসছে সার্ভিস সেন্টার থেকে, সেবা খাত থেকে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির বিরাট একটা অংশ আসতে হবে ইন্ডাস্ট্রি থেকে, ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর থেকে, কৃষি থেকে; যেখানে মানুষের কর্মসংস্থান বেশি এবং সংশ্লিষ্টতা বেশি। এসব খাতের যত প্রসার ঘটবে তত ভালো। এরপর প্রবৃদ্ধি আসতে হবে ছোট ও মাঝারি শিল্প থেকে। তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে। নিঃসন্দেহে সেবা খাতের প্রয়োজন আছে। তবে সার্বিকভাবে এর ওপর নির্ভর করলে কাজ হবে না।

আরেকটি জরুরি বিষয় হচ্ছে, যেকোনো উপায়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও গতিশীল করা। যেভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছে, ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, এসব সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। তা না হলে কোনোভাবেই এ খাতকে দাঁড় করানো যাবে না। কারণ ব্যাংকিং খাতকে বলা যায় অর্থনীতির নার্ভ বা চালিকাশক্তি। অর্থনীতির সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করে। অতএব এ খাতকে সংস্কার না করলে আমরা বেশিদূর এগোতে পারব না।

এখন যদি সম্ভব হয়, একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন যদি করা যায় এবং শুধু বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। এটা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবেন; বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র, মহিলা উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করবেন; অর্থনীতিবিদ এবং যাঁরা বিনিয়োগ করেন তাঁদের সঙ্গে আলাপ করবেন, একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ করবেন। এরপর ব্যাংকিং খাতে তাঁরা কিছু মৌলিক ও জরুরি সংস্কারের জন্য বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেবেন। এর মধ্যে যে বিষয়গুলো থাকতে পারে—যুগোপযোগী ঋণদান প্রক্রিয়া, নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা, নতুন ধরনের আর্থিক প্যাকেজ প্রণয়ন করা, সুলভ ও দ্রুত আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা। অর্থনীতির আকার-পরিসর বাড়ছে, বিশ্বায়নের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতএব বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরো প্রগতিশীল, উন্নত ও দক্ষ করে তুলতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ব্যবস্থাপনা সর্বোপরি এর স্বকীয় সত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর; অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত