কংগ্রেসের নতুন ব্রহ্মাস্ত্র প্রিয়াঙ্কা

ঋজু হাঁটার ভঙ্গি, সর্বদাই প্লিটেড শাড়ি, চুলের ধাঁচ—সব দিক থেকেই ঠাটে-বাটে নাতনি দেখতে তাঁর ঠাকুমা, তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতোই। সেই নাতনিই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে পা দিয়েছেন। এত দিন সারা দেশই জানত প্রিয়াঙ্কা কংগ্রেস রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু সচেতনভাবেই রাজনীতির ব্যাকইয়ার্ডেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। তাঁর পরিচয় ছিল মা সোনিয়া গান্ধী এবং দাদা রাহুলের নির্বাচনী কেন্দ্র রায়বেরিলি ও আমেথির প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও ঘরের মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কংগ্রেস নেতাকর্মীরা তো বটেই; উত্তর প্রদেশসহ গোটা দেশই জানে প্রিয়াঙ্কার মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যতের ইন্দিরা। বস্তুত সেই অঙ্কেই লোকসভা ভোটের ঠিক আগেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে নিয়ে আসা হয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক মহল এমনও মনে করছে, যদি দেখা যায় নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে কেন্দ্রে সরকার গড়ার মতো জায়গায় চলে এসেছে কংগ্রেস, সে ক্ষেত্রে দলের হাল নিজের কাঁধে রেখে রাহুল গান্ধী হয়তো সরকারের কাণ্ডারিণী নিজের প্রিয় ভগ্নিকেই করে দেবেন।

একে অবশ্য কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পারিবারিক শাসনের অভিযোগ আরেকটু জোরালো হবে, কিন্তু উত্তর প্রদেশসহ হিন্দিবলয়ের ব্যাপক অংশের মানুষের মধ্যে নেহরু পরিবার সম্পর্কে যে দুর্বলতা রয়েছে, তাকে কংগ্রেস যে এখনো ষোলো আনা কাজে লাগাতে চায়, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। ঠাকুমা ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্যের কথা অস্বীকার করেন না প্রিয়াঙ্কাও। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেওছিলেন, আমাকে দেখতে আমার ঠাকুমার মতো। ছোটবেলায় এমন একটা বাড়িতে বড় হয়েছি, যেখানে তিনিই ছিলেন কর্ত্রী। তাঁর একটা প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেছিলেন, তবে স্বভাবের দিক থেকে তিনি অনেকটা তাঁর বাবা রাজীব গান্ধীর মতো নরমসরম।

তবে রাজনৈতিক শিবিরের মতে, শুধু ইন্দিরার মতো দেখতে বলে নয়, শুধু রাজীব গান্ধীর মেয়ে বলেই নয়, অপেক্ষাকৃত নবীন প্রজন্মের কাছে রাজীবকন্যার ক্যারিশমা ও ব্যক্তিত্ব প্রায় লোককথার মতোই। আমেথি এবং রায়বেরিলিতে মা ও দাদার প্রচারসভায় তাঁকে কালেভদ্রে দেখা গেলেও বেশির ভাগ সময়ই তিনি থাকেন রাজনীতি ও প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে। এতেই মানুষের মধ্যে প্রিয়াঙ্কার জনপ্রিয়তা এবং তাঁর সম্পর্কে কৌতূহল তীব্র হয়েছে।

সব মিলিয়ে আর ১০০ দিনও বাকি নেই। খুব সম্ভবত মাস ফুরালেই ঘোষিত হবে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই সাঁড়াশির দুই ফলা চেপে বসতে চলেছে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি, তথা বিজেপির গলায়। হৃত জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের জন্য কী আপ্রাণ কসরতটাই না চলছে এখন দিল্লির শাসক শিবিরে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশজুড়ে রাজ্যে রাজ্যে মানুষ উল্টোমুখো হচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে। একদিকে ‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী দেওয়ার তোড়জোড়, অন্যদিকে দেশজুড়ে কংগ্রেসের পালে হাওয়া ক্রমেই জোরালো হাওয়া। এই জোড়া ফলায় বিজেপি যে ধরাশায়ী হতে চলেছে তা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আর বিজেপির এই ভবিতব্যকে আরো সুনিশ্চিত করে তুলতে গতকাল রণক্ষেত্রে এক ব্রহ্মাস্ত্র হাজির করল কংগ্রেস। অস্ত্রের নাম প্রিয়াঙ্কা। সুনিপুণ অঙ্ক কষে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বুধবার উত্তর প্রদেশের একটি বিশেষ স্ট্র্যাটেজিক অংশের দলীয় নির্বাচনের দায়িত্ব তুলে দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে হাজির করল রাজীব তনয়াকে।

তাঁকে দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। দায়িত্ব পূর্ব উত্তর প্রদেশে। সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্যনাথের ময়দান এবং প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় কেন্দ্রও তাঁর বৃত্তে। সাংগঠনিক রদবদলে সবচেয়ে বেশি লোকসভা আসনের রাজ্যকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করা হয়েছে। পশ্চিমের দায়িত্বে নিয়ে আসা হয়েছে মধ্য প্রদেশের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উত্তর প্রদেশের দায়িত্বে ছিলেন গুলাম নবি আজাদ। তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হরিয়ানায়।

রাজনৈতিক মহলের মতে, অনেক ভেবেচিন্তেই পূর্ব-উত্তর প্রদেশের দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে প্রিয়াঙ্কাকে। প্রথমত, রাজ্যের এই অংশটিই হলো মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্যনাথের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক হেডকোয়ার্টার। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি গোরক্ষপুর মঠেরও সর্বাধ্যক্ষ। ফলে পূর্ব-উত্তর প্রদেশ থেকেই গোটা রাজ্যের নীতি ঠিক করা হয় বললেও অত্যুক্তি হয় না। ঠিক সেখানেই যোগির প্রতি পদক্ষেপে কাঁটা ছড়ানোর কর্মসূচি নিয়েই যে চলতি সপ্তাহেই প্রিয়াঙ্কা ময়দানে নেমে পড়বেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই লোকসভা নির্বাচনের মাসে আদিত্যনাথের কাজ স্পষ্টতই কঠিন হতে চলেছে।

দ্বিতীয়ত, উত্তর প্রদেশের এই প্রান্তেই বারানসি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সংসদীয় কেন্দ্র। আদতে গুজরাটের মানুষ মোদিকে বারানসি থেকে জিতিয়ে আনার গুরুদায়িত্ব অনেকটাই বর্তায় যোগি আদিত্যনাথের ওপর। প্রিয়াঙ্কার সক্রিয় উপস্থিতিতে তাঁর সেই কর্মসূচিও যে পদে পদে ধাক্কা খাবে, তাও সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট। এসব সম্ভাবনা বিবেচনা করেই দেশের রাজনৈতিক মহল মনে করছে, প্রিয়াঙ্কার সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠতে চলেছে।

উত্তর প্রদেশ হলো এমন একটি রাজ্য যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন যারাই দখল করেছে তারাই দিল্লিতে সরকার গড়েছে। এবার ৮০ আসনের ওই রাজ্যে বহুজন সমাজপার্টি এবং সমাজবাদী পার্টির সার্বিক আসন সমঝোতা হয়ে যাওয়ার পর শোনা যাচ্ছে, কংগ্রেসও তাদের সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে। এই সঙ্গে সেখানকার জোটে আছে অজিত সিংয়ের রাষ্ট্রীয় লোকদল। এই জোট যদি শেষ পর্যন্ত নিটোল হয় এবং তার ফলে সেখানে বিজেপিবিরোধী ভোট দ্বিধাবিভক্ত না হয়, তবে যেকোনো অপরিপক্ব মস্তিষ্কের মানুষও বুঝে যাবেন, যোগি গড়, তথা মোদিরও গড় উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসন সংখ্যা পাঁচের বেশি পেরোবে না। আর এই পরিস্থিতিতে আরো অনিবার্য করে তুলবে আসরে প্রিয়াঙ্কার অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা। শুধু বিজেপিকে হারানোই নয়, প্রিয়াঙ্কাকে সক্রিয় রাজনীতিতে নামিয়ে শুধু উত্তর প্রদেশের ওই স্ট্র্যাটেজিক এলাকায় দায়িত্ব দিয়ে গোটা নির্বাচনী আসরে কংগ্রেস নেতৃত্ব তাদের দলকে বাড়তি ও নতুন উদ্দীপনায় হাজির করার কৌশল নিয়েছে, যাতে থমকে যাবেন অখিলেশ-মায়াবতীরাও। সে ক্ষেত্রে ৩৮+৩৮+২+২ এই অঙ্ক বদলে গিয়ে অখিলেশ-মায়াবতীরা কংগ্রেসের জন্য আরো কিছু আসন ছেড়ে রফায় রাজি হতে পারেন। এটাই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

উত্তর প্রদেশ থেকে কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতার সম্ভাবনার বার্তা যদি এভাবে পতাকা ওড়াতে পারে, তাহলে হিন্দিবলয়ের অন্যান্য রাজ্যেও কংগ্রেস আরো বেশি বেশি করে উদ্দীপ্ত হবে। মানুষও কেন্দ্রে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের পুনঃ প্রত্যাবর্তন সুনিশ্চিত জেনে আরো বেশি বেশি করে ‘হাতে হাত’ লাগাতে এগিয়ে আসবে। ফলে গত বুধবার প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে কংগ্রেস যে নতুন ব্রহ্মাস্ত্রটি ছাড়ল, তাতে ঘায়েল হবে অনেক পক্ষই।

এতে অবশ্য কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘পারিবারিক শাসনের’ অভিযোগ আরেকটু জোরালো হবে, কিন্তু উত্তর প্রদেশসহ হিন্দিবলয়ের ব্যাপক অংশের মানুষের মধ্যে নেহরু পরিবার সম্পর্কে যে দুর্বলতা রয়েছে, তাকে কংগ্রেস যে এখনো ষোলো আনা কাজে লাগাতে চায়, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।

লেখক : কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত