শেখ হাসিনার প্রয়োজন একটি চৌকস আমলাতন্ত্র

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় একজন সফল ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে। এরপর তিনি পালাক্রমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘ভারত রত্ন’ পদকে ভূষিত হয়েছেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে তিনি দিল্লির রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। এরপর রাজীব গান্ধী ও মনমোহন সিংয়ের সময় প্রণব বাবু বেশ সফলতার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালন করেন। মনে-প্রাণে একজন বাঙালি, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকের কাছে কাকাবাবু হিসেবে পরিচিত। দলে তিনি একজন ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তাঁকে যখন রাষ্ট্রপতি মনোনীত করা হয় তখন অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন, কংগ্রেসে সংকট মোকাবেলা করার জন্য আর কেউ রইল না। গত বছর নভেম্বর মাসে তিনি ভারতের আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে দেওয়া এক বিশেষ বক্তৃতায় বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে আমলাতন্ত্র, যা সংস্কার করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এর অর্থ এই নয় যে আমলাতন্ত্র দেশের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা রাখেনি, তবে তাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বটা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং তাদের সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে এবং প্রয়োজনে অনেক ক্ষেত্রে নমনীয় হতে হবে, যাতে আমরা যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত নিতে পারি। বিশ্বের কোনো ব্যবস্থাই সফল হতে পারে না যদি না কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপদ্ধতি ও ব্যবস্থা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমলাতন্ত্র সব সময় কাজে বাধা সৃষ্টি করা ও কাজের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অজুহাত খোঁজে। তারা নিজেদের বাস্তবজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে

(isolationism) এবং চিন্তাকে একটি বাক্সের ভেতর বন্দি করে রাখতে পছন্দ করে (adapted a system of thinking in silos)’, (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৮ নভেম্বর, ২০১৮)। সম্ভবত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের চেয়ে ভারতের আমলাতন্ত্র সম্পর্কে এমন সাহসী কথা বলার উপযুক্ত ব্যক্তি এই মুহূর্তে ভারতে দ্বিতীয় কেউ নেই।

ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের (সিপাহি বিদ্রোহ) পর ভারত উপমহাদেশে (বার্মাসহ) ইংরেজদের শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার জন্য ১৮৫৮ সালে একটি বিশেষ আইন দ্বারা ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) জন্ম। এর আগে ইংরেজদের পক্ষে ভারত শাসনের দায়িত্ব ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির ওপর। নতুন সৃষ্টি এই আমলা বা আইসিএসরা ছিলেন সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়ার অধীনে এবং তিনি সব সময় ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের একজন মন্ত্রী হতেন। শুরুতে এই আমলাদের সবাই ছিলেন সাদা চামড়া এবং ব্রিটেন থেকে তাঁদের ভারতবর্ষে প্রেরণ করার সময় বলা হতো তাঁরা হচ্ছেন রাজা বা রানির প্রতিনিধি এবং ভারতের সব মানুষকে প্রজা হিসেবে দেখতে হবে এবং ভারতের পরিস্থিতি যা-ই হোক ব্রিটিশ রাজকোষাগারে নিয়মিত সম্পদ জমা করতে হবে। সম্প্রতি এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৭৩ বছরের ইংরেজ শাসনামলে ব্রিটেন উপমহাদেশ থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ লুট করেছে। ১৯০৫ সালে প্রথমবারের মতো অবিভক্ত বাংলা থেকে মোট আইসিএস অফিসারের ৫ শতাংশ নিয়োগ পাওয়া শুরু করে। ১৯৪৭ সালে যখন ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যায় তখন মোট আইসিএস অফিসার ছিলেন ৬৮৮ জন, যার মধ্যে ৩২২ জন ছিলেন ভারতীয়। যার একটি অংশ ভারতে রয়ে যায় আর কিছু চলে যায় পাকিস্তানে। সব ব্রিটিশ নিজ দেশে ফেরত যায়। পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ নিজ নিজ সিভিল সার্ভিস প্রবর্তন করে। আবার উভয় দেশের প্রতিটি প্রদেশে পৃথক আমলাতন্ত্রের জন্ম হয়। স্বাধীন ভারতের সুবিধা ছিল শুরুতে নতুন দেশের ভাগ্য গড়ার জন্য তারা পেয়েছিল জওয়াহেরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল, গোখলে, আবুল কালাম আযাদ প্রমুখের মতো কিছু জাঁদরেল রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্রের ওপর যাঁদের নিয়ন্ত্রণ ছিল নিরঙ্কুশ। সেই ভাগ্য পাকিস্তানের হয়নি। কারণ পাকিস্তান আন্দোলনে যাঁরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন বাঙালি আর যেসব অবাঙালি, যেমন জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, সরদার আবদুর রব নিসতার বা পূর্ব বাংলার খাজা নাজিমুদ্দীন—এঁদের কারো সঙ্গে জনগণের তেমন একটা সম্পৃক্ততা ছিল না। আর বাঙালি রাজনীতিবিদদের কখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়নি। এর ফলে দেশ পরিচালনার জন্য পাকিস্তান সরকার অতিমাত্রায় আমলানির্ভর হয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই পাকিস্তানে সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের একটি অশুভ আঁতাত গড়ে ওঠে। যার ফলে বর্তমানে পাকিস্তান একটি পতিত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে কিছুদিনের জন্য ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দীন গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। এরপর এই দায়িত্ব দেওয়া হয় মালিক গোলাম মোহাম্মদকে, যিনি পেশায় ছিলেন একজন আইসিএস অফিসার। তাঁর আমলেই পাকিস্তানের সম্ভাব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কবর রচনার প্রথম কাজটি শুরু হয়, যখন তিনি অত্যন্ত অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদ ভেঙে দেন। সেই পাকিস্তান আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি শক্তিশালী।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে দেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রথমে তিনি যে চ্যালেঞ্জটির সম্মুখীন হন, তা হচ্ছে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আমলার ঘাটতি। কারণ পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে খুব বেশি বাঙালি কেন্দ্রীয় সরকারের আমলা হতে পারেননি আর পর্যাপ্তসংখ্যক আমলা ছাড়া প্রশাসন চালানো সম্ভব নয়। ঘাটতি পূরণ করার জন্য বেশ কিছু প্রাদেশিক আমলাকে নতুন সরকারের আমলা হিসেবে আত্তীকরণ করা হয়। পরিত্যক্ত কলকারখানার দায়িত্ব দেওয়া হয় নতুন সৃষ্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট সাভির্সকে, যাদের অনেককে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয় পূর্ব ইউরোপ থেকে। কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। মুহিতুল ইসলামকে দেওয়া হয় অর্থসচিবের দায়িত্ব, আর সৈয়দ আনোয়ারুল করিমকে নিয়োগ দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর প্রথম পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে। ঘাটতি পূরণ করার জন্য তিনি ১৭ জন শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেন। বঙ্গবন্ধুর সুবিধা ছিল তিনি ও তাঁর সতীর্থরা ছিলেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। আমলারা তাঁদের ডিঙিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস করতেন না। তার পরও বঙ্গবন্ধু আর তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্রগুলো হয়েছে সেগুলোতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। কারণ হচ্ছে, তিনি বাঙালিকে খুব বেশি বিশ্বাস করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের খাদ্য সংকটের পেছনে অনেক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল ঠিক, কিন্তু তাঁর খাদ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টির গুরুত্ব আঁচ করতে পারেনি। সেই সময় খাদ্যসচিব ছিলেন আবদুল মোমেন খান (বিএনপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মঈন খানের পিতা)। তিনি আসন্ন সংকট সম্পর্কে মন্ত্রী বা সরকারকে অন্ধকারে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তাঁকে জেনারেল জিয়া তাঁর খাদ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। জিয়া, এরশাদ দুজনই দেশ পরিচালনায় আমলাদের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার অবস্থাও ভিন্ন কিছু ছিল না। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বেশ কিছু আমলার ভূমিকা তো এখন প্রমাণিত। এই আমলারা নিয়োগ পেয়েছিলেন মূলত দুই সামরিক শাসকের আমলে।

শেখ হাসিনা এদিক দিয়ে কিছুটা হলেও ভাগ্যবতী। কারণ তাঁর প্রশাসনে বেশ কয়েকজন চৌকস আমলা আছেন, প্রজাতন্ত্রের কাছে যাঁদের আনুগত্য ও যোগ্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু সব আমলা সম্পর্কে একই কথা বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে যে কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুশাসন, দুর্নীতি দূরীকরণ, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সমাজ থেকে জঙ্গিবাদ ও মাদক সমস্যা নির্মূল। এ কাজগুলো করার জন্য তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন একঝাঁক নতুন মুখ, যাঁদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো বদনাম নেই। তাঁদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর তো বটেই, জাতির প্রত্যাশাও আকাশচুম্ব্বী। এমন একটি মন্ত্রিসভাকে গতিশীল ও কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন একটি চৌকস দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব আমলাতন্ত্র। কারণ তাঁদের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে নতুন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা। মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের সঠিক পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য সবাই প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ বাড়ে জ্যামিতিক হারে; যা হওয়াটা তাঁর প্রতি একধরনের অবিচার। তিনি তো দেশকে অনেক দিয়েছেন, এখন সময় হয়েছে কিছুটা হলেও তাঁর ভার লাঘব করা। শেখ হাসিনা বর্তমানে একজন প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের একজন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর, একজন অনুকরণীয় প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণের জন্য তাঁকে সময় দেওয়া উচিত। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড দেখাশোনা করবে মন্ত্রীরা আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। এসবের নিশ্চয়তা দিতে পারে একটি কার্যকর, চৌকস ও দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র।

আমলাতন্ত্রকে যতই সমালোচনা করা হোক, যেকোনো সরকারব্যবস্থায় তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের নবযাত্রা শুরু হোক একটি সঠিক আমলাতন্ত্র বাছাইয়ের মাধ্যমে। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কথা মতো যারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে এবং হবে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক যোগ্য দুর্নীতিমুক্ত আমলা আছেন। তাঁদের শুধু কাজে লাগাতে হবে। আর যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা প্রমাণ আছে তাঁদের দ্রুত অব্যাহতি দেওয়া হোক। অকার্যকর পশ্চাত্মুখী আমলাতন্ত্র দিয়ে সুশাসন সম্ভব নয়, আর সুশাসন ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়াও সম্ভব নয়। নতুন সরকারের সফলতা কামনা করি।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত