নির্বাচনোত্তর রাজনীতির ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি সম্পন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু তাৎপর্যপূর্ণই নয়, এ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিতবহ। বলতে হয়, স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে এবারকার নির্বাচনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলে আমার বিশ্বাস। বিশদ আলোচনায় তা স্পষ্ট হবে।

১৯৯১-এর পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ যে ধারা-বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলেছিল, তাতে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার অভাব ছিল। সাম্প্রদায়িকতার বীজ সমাজে অধিক হারে অঙ্কুরিত হতে দেখা গেছে এবং তা রাজনৈতিক দল বিশেষের প্রশ্রয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্নীতি ও নৈরাজ্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কথিত স্বৈরশাসনের অবসান ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে সুস্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী কয়েক দশকে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটা ছিল সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যকার পারস্পরিক বিরূপতা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বদলে হিংসা-প্রতিহিংসার চরিত্র অর্জন করে। এর পরিণাম শুভ হয়নি। সাম্প্রদায়িক নির্যাতন, নারী নির্যাতন বেড়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে। বেড়েছে প্রভুত্ববাদী রাজনীতি। অনেক ঘটনা তার প্রমাণ। ঘটেছে রাজপথ রক্তাক্ত করার মতো ঘটনাও। রাজনৈতিক পরিবেশ এতটা ঘোলাটে যে ‘মাইনাস টু’র মতো বিচিত্র ঘটনাও দেখা দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আবার পূর্বপথে যাত্রা, তবে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে দুই দলের পরস্পরবিরোধিতার অবসান ঘটেনি। এ পর্বে বিএনপিতে তরুণ তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রাধান্য, চরম রাজনৈতিক নৈরাজ্য, তারেক-বাবরদের চক্রান্তে প্রতিপক্ষের ওপর গ্রেনেড হামলার মতো অনৈতিক ঘটনার পরিণামে রাজনীতির পালাবদল। এবার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।

কিন্তু রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন, আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দূরেই থেকে গেল। শুধু গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা বাংলাদেশে আত্মস্থ করা যায়নি। বিএনপির বছরের পর বছর সংসদ বয়কট, নির্বাচন-সংলাপে অংশগ্রহণ না করার মতো অদূরদর্শী অবিচক্ষণতা তাদের জন্য সর্বনাশের ইঙ্গিতবহ হয়ে ওঠে। সংগঠনে ভাঙন, তবু সংশোধনের বিচক্ষণতা প্রকাশ পায়নি। একনায়কি শাসন প্রায়ই নেতৃত্বে আত্মঘাতী দুর্বলতার প্রকাশ ঘটায়। বিএনপির রাজনৈতিক পরিণাম অনেকটা তেমনই।

দুই.

নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে অবস্থান করে বিএনপি ও তার জোট নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ তার একদলীয় নির্বাচনের ভুল সংশোধনের চেষ্টা চালায় ২০১৮-তে পৌঁছে, অবশ্য নিজের পরিকল্পনামাফিক। ব্যাপক দুর্নীতির দায়ে প্রতিপক্ষের আইনি আঘাতে দুর্বল, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত বিএনপি জোট তৈরি করেও অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি বিচক্ষণতার অভাবে এবং দুর্নীতির দায়ে রুজু করা মামলার কারণে।

আওয়ামী শাসনে উন্নয়নের পাশাপাশি দেখা দেয় প্রভুত্ববাদী রাজনৈতিক আচরণ, যা সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অবশ্য সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের দেখা যায় ব্যাপক হারে ক্ষমতাবলয়ের চারপাশে বিচরণ করতে। তেমনি সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীকুলকে, মুনাফাবাজি এতই বেড়ে যায় যে সমাজে নতুন শ্রেণির উদ্ভব ঘটে ‘অতিধনী’ পরিচয় নিয়ে। আন্তর্জাতিক মহলে এ বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলে, স্বদেশে এ বিষয়ে দেখা যায় লেখালেখি। অর্থনৈতিক শ্রেণি-বৈষম্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

এতদসত্ত্বেও ‘উন্নয়ন’ শব্দটি এবং এর বাস্তবতা সমাজের একাধিক স্তরে গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকে—এর সুফলভোগী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাই নির্বাচনের তোড়জোড়, হঠাৎ করে তারিখ নির্ধারণ। ইতিমধ্যে নতুন ঘটনা ড. কামাল হোসেনের গণতান্ত্রিকব্যবস্থা উদ্ধারের নামে বিএনপির সঙ্গে যোগসাজশে নির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ঐক্যফ্রন্ট নামে মহাজোটে অংশগ্রহণ। চলে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি, বিএনপির বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেই এবং তা বিতর্কিত জামায়াতসহ। কামাল হোসেনের মতো আইনবিশেষজ্ঞ রাজনীতিকের কাছে এটা প্রত্যাশিত ছিল না।

অবশেষে নির্বাচন ৩০-এ ডিসেম্বর। সময়, তারিখ, তফসিল ঘোষণা ইত্যাদি ছিল ঘটনাক্রমে আওয়ামী লীগের পক্ষে। ছিল সমাজের সুধীসমাজ, শিক্ষাঙ্গন, এমনকি ব্যবসায়ীকুল সবাই তাদের পক্ষে। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টসহ অতি স্বল্পসংখ্যক এলিট বিপরীত মঞ্চে। এদের অভিযোগ—সরকারসহ মূল গায়েন নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের পক্ষে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভাবিত বিজয়। বেশির ভাগ আসন তাদের দখলে। পাঁচ-সাতটা বিএনপি ও তাদের জোটের অধিকারে। স্তব্ধ, স্তম্ভিত ড. কামাল ও মির্জা ফখরুল। অবশ্য নির্বাচন কমিশন যতই বলুক, নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সহিংস ঘটনা বাদে; সার্বিক পরিস্থিতি এতটা সহজ, সরল ও স্বচ্ছ ছিল না। এমন দাবি গুটিকয় সংবাদপত্রের, এমনকি বিবিসির বয়ানে।

বাংলাদেশি সংবাদপত্রের কোনো কোনোটিতে রেখেঢেকে এ ধরনের তথ্যই প্রকাশ করেছে। দু-একটি উপসম্পাদকীয়তে এমন মতামত প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও নির্বাচনপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও মুক্তচরিত্রের ছিল না। একাধিক দৈনিকের শিরোনামে তা প্রকাশ পেয়েছে, যদিও সতর্কভাষ্যে। একটি উপসম্পাদকীয়তে জনৈক অধ্যাপকের মন্তব্য: ‘এটা ঠিক, নির্বাচনটি ভালো হয়নি’। কিছু ত্রুটির কথাও তাতে রয়েছে।

স্বভাবতই বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট দাবি তুলেছে, তিন মাসের মধ্যে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের। বলাবাহুল্য, এ দাবিতে কোনো ‘সুফল মিলবে না, আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট সংসদে অংশ নিতে অনিচ্ছুক। কিন্তু তাতে কি কোনো সুফল মিলবে? অতীতের ঘটনাবলি তেমন কোনো সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় না।

স্বভাবতই বিএনপি, ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে সংসদে অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। সময় তাদের পক্ষে নয়। তার বড় প্রমাণ বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শুধু ভারতই নয়, মোটামুটি হিসেবে গোটা আন্তর্জাতিক মহল এ নির্বাচনের ত্রুটিগুলো আমলে না এনে নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু বিচারে গ্রহণ করে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, রাজনৈতিক বিশ্বে বহু কথিত চীন-ভারত বৈপরীত্য ও বিরোধিতার পটভূমিকে উপেক্ষা করে চীন এ নির্বাচনের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে, অভিনন্দিত করেছে বিজয়ীদের।

একে বলা যায় বিশ্বরাজনীতির নতুন সমীকরণ, মেরুকরণ যদি না-ও বলি। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। রয়েছে বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং বিশ্বরাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় আপাতত বাংলাদেশ সম্পর্কে চীনের আগ্রহ। শেখ হাসিনার রাজনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের হিসাব-নিকাশের সুফল হাতে পেয়েছে। আবারও বলতে হয়, ঘটনা এবার বিএনপির পক্ষে নয়, তা মির্জা ফখরুল যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকের সঙ্গে যতই সংলাপে বসুন না কেন।

তিন.

এ নির্বাচনের বিচার-বিশ্লেষণে অনেকের লেখায়ই একটি মতামত উঠে এসেছে যে শেখ হাসিনার গত ১০ বছরের উন্নয়নকর্মের সুফল হিসেবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের সম্ভাবনাই ছিল অধিক। একাধিক কারণে বিএনপি ছিল অসংগঠিত, বিপর্যস্ত, সর্বোপরি ক্ষমতাসীন দলের দাপটে দৌড়ের ওপর। তাদের পক্ষে নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল গৌণ। অবস্থাদৃষ্টে অসম্ভবের পায়ে মাথা খোঁড়া।

তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কেন এতটা অস্থির ও চিন্তিত ছিল, এটি একটি বড় রাজনৈতিক তাৎপর্যবাহী প্রশ্ন। সে তাৎপর্য না বোঝার মতো কিছু নয়। তাই একাধিক উপসম্পাদকীয় নিবন্ধে এমন মতামত ব্যক্ত হয়েছে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ফলাফল নিয়ে এতটা অস্থির ও সংশয়গ্রস্ত না হলে এবার ক্ষমতাসীন দলের অধীনে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হতে পারত। যেমন লিখেছেন পূর্বোক্ত অধ্যাপক তাঁর নিবন্ধে। তাঁর আক্ষেপ, এর ফলে নির্বাচন নিয়ে সমস্যাগুলো থেকেই গেল।

এ ঘটনার বড় একটি নেতিবাচক দিক হলো ভবিষ্যতের নির্বাচন নিয়ে জটিলতা, বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা। সেই সঙ্গে অবাঞ্ছিত নির্বাচনের একটি ধারা তৈরি। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের একচেটিয়া ফলাফল ক্ষমতাসীন দলকে শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকতাকে উপেক্ষা করতে প্ররোচিত করতে পারে। কারণ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। এ পরিস্থিতি ধরে রাখার ঝোঁক ক্ষমতাসীন দলকে গণতান্ত্রিক আচরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারে। কেননা একচেটিয়া ক্ষমতা প্রায়ই সুব্যবহারের পথ ধরে চলতে চায় না। কখনো একনায়কত্বের জন্ম দেয়।

তা সত্ত্বেও লেখালেখি, আলোচনা ইত্যাদি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা দেশ ও দশের স্বার্থে ক্ষমতাসীন দল তাদের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পথ ধরে চলবে। বিরোধীপক্ষকে মামলায়-হামলায় বিপর্যস্ত করবে না। একটি সুষ্ঠু, সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মতো সুবুদ্ধির পরিচয় রাখবে। আর বিরোধী দলও কোনো প্রকার নাশকতার পথ ধরে চলবে না। এগুলোই আমাদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়। আর বিএনপির পক্ষে বড় কাজ হবে গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে মান্য করে দলকে নতুন করে সংগঠিত করে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়া।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত