কাউন্সিল ডেকে বিএনপির পুনর্গঠন চায় অনেকে

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবিলম্বে চাই একটি সাংগঠনিক পুনর্গঠন। এর কোনো বিকল্প নেই। সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট নেতৃত্বের শূন্যতায় এ দলটি এখন অনেকটাই বিপর্যস্ত। সে কারণে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস এবং বৃহত্তরভাবে দলের পুনর্গঠনের জন্য কাউন্সিল অধিবেশন ডাকা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির তিন বছর স্থায়ী কার্যকাল আগামী মার্চে শেষ হয়ে যাবে। এ দলের সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯ মার্চ ২০১৬-তে। সেটি ছিল দলের ষষ্ঠ কাউন্সিল। তার পর থেকে এ দলটির ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারা অন্তরীণ হয়েছেন। এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমান বিভিন্ন দণ্ড মাথায় নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন দলের অনেক প্রবীণ কেন্দ্রীয় নেতা এবং বার্ধক্যের কারণে জরাগ্রস্ত হয়েছেন আরো অনেকে। এ অবস্থায় জরুরিভাবে দল পুনর্গঠন ছাড়া বিএনপির অস্তিত্ব অবশ্যই একটি মহাসংকটের মুখে পড়বে। বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যাঁরা ব্যর্থ বলে সমালোচিত হয়েছেন, তাঁদের পদ ছেড়ে দিতে হবে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও তরুণদের হাতে। এ কথাটি বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উল্লিখিতদের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজিত সাম্প্রতিক সময়ের সভাটিকে বহু কারণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক তথ্যাভিজ্ঞ মহল। সে অনুষ্ঠানে বিএনপির পুনর্গঠন কিংবা নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের ব্যাপারে যেসব বক্তব্য এসেছে তাকে অনেকেই সময়োচিত ও সুদূরপ্রসারী বলে মনে করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, যেখানে কেউ কোনো দিন অবসরে যান না কিংবা নেতৃত্ব স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেন না, সেখানে তরুণ, ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের জন্য পদ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। অনেকের দৃষ্টিতে দেশের একাদশ সংসদীয় নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলগতভাবে বিএনপির জন্য একটি অস্তিত্ব সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সেটা থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক এবং বিশেষ করে সাংগঠনিক কৌশল বিএনপিকেই নির্ধারণ করতে হবে। তা ছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল (সংসদের বাইরে) হিসেবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইটা এখন মূলত যেন বিএনপির দায়িত্বেই চলে যাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, নীতিগতভাবে জনগণের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকা বিএনপি বিতর্কিত হতে শুরু করেছিল কখন থেকে? সে প্রসঙ্গে অবশ্যই পরে আসছি। তবে বর্তমানে দলের পুনর্গঠন নিয়ে না হলেও জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দুটি মত আছে বিএনপিতে। দলীয় নেতাদের শেষোক্ত অংশটির মত হচ্ছে—এ মুহূর্তে দলের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে দলনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। এখনই আন্দোলনে না গিয়ে সারা দেশে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত করে আনা। শূন্য পদ পূরণ করা। তাঁরা বলছেন, দলনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আগে কোনোভাবেই কাউন্সিল আয়োজন করা ঠিক হবে না। কিন্তু কেন ঠিক হবে না তার যথার্থ কারণ তাঁরা উল্লেখ করেননি। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি এখন অনেকখানিই নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর। কেউ জানে না তিনি কখন কিভাবে মুক্তি পেতে পারেন। অন্যদিকে পুনর্গঠিত হওয়ার আগে কেন্দ্রীয়ভাবে অসংগঠিত এ দলটির পক্ষে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তা ছাড়া কাউন্সিল ছাড়া শূন্যস্থান পূরণ করে দলে কোনো আন্দোলনের গতি সঞ্চার করা যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। এ অবস্থায় দলীয় কর্মকাণ্ড আরো নেতিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কাউন্সিলের পক্ষে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে আগামী এপ্রিলের কোনো একসময় কাউন্সিল ডাকা যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। এর মধ্যে কাউন্সিলের প্রস্তুতির জন্য যতটুকু সময় নেওয়ার তা নেওয়া যেতে পারে বলে প্রেসিডিয়ামের কেউ কেউ মত দিয়েছেন।

বর্তমানে দেশব্যাপী দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ বলে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের কেউ কেউ বলছেন। তাঁদের মতে, দলের নেতাকর্মীদের জন্য রাজনৈতিকভাবে কোনো সুখবর নেই। সুতরাং তাঁদের ঐক্যবদ্ধ এবং চাঙ্গা করে তোলার জন্য কিছু কর্মসূচি প্রয়োজন। দলনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য এই মুহূর্তে তাঁদের হাতে বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। সে কারণে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান নাকি বিভিন্ন পর্যায়ে স্কাইপের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। বিভাগওয়ারি দলীয় নেতাদের সঙ্গেও আলাদা আলাদাভাবে কথা বলতে আগ্রহী তিনি। তাতে বোঝা যাচ্ছে, তারেক রহমানের কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগে কোনো কিছুই এগোবে না। তবে এর আগে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন যে দল চলবে প্রেসিডিয়ামের যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর। এখন দলের প্রেসিডিয়ামে আরো দু-একটি পদ শূন্য হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের মৃত্যু। তার পাশাপাশি আরো কয়েকজনের অসুস্থতা। সব মিলিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে এখন নেতৃত্বের একটা শূন্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশব্যাপী দলকে সংগঠিত করে কোনো গণ-আন্দোলনে যাওয়া সম্ভব হবে বলে অনেকেই মনে করেন না। কেউ কেউ মনে করেন, নীতি ও আদর্শগত দিক থেকে দলের পেছনের দিকে ফিরে তাকানোর সময় এখন। এ বিষয়টি মূলত তাত্ত্বিক হলেও দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। কারণ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন দলের ভেতরে ও বাইরে গণতন্ত্র। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশকে রাজনৈতিকভাবে জঞ্জালমুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তিমালিকানায় দেশের অর্থনীতিতে গতিবেগ সৃষ্টির পাশাপাশি গ্রামপর্যায়ে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বহুমুখীকরণ করতে। পাহাড় থেকে সমতল ভূমির বাংলাদেশি নাগরিকদের ঐক্য, সংহতি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে একটি মধ্যপন্থার দল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এখানে ধর্মীয় মৌলবাদ কিংবা জঙ্গিবাদের কোনো অবকাশ ছিল না। তেমনি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেও ছিল না কোনো জাতিগত হিংসা কিংবা বিদ্বেষের ছোঁয়া।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯০-এর শুরু থেকে আন্দোলন যখন ক্রমে ক্রমে তুঙ্গে ওঠে, তখন থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপির তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। কিন্তু ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাময়িকভাবে হাত মেলালেও পরে আবার ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়েছিল। সে নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের জামায়াতবিরোধী বক্তব্য ক্রমেই সোচ্চার হয়ে ওঠে। এর অন্যতম প্রধান কারণ খালেদা জিয়ার জোট সরকারে জামায়াতের দুজন নেতাকে মন্ত্রী বানানো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের বিচারের ঘোষণা প্রবলতরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। জামায়াত তখন থেকেই তার পরিণতি টের পেয়ে আশ্রয়ের জন্য বিএনপির গভীরে অনুপ্রবেশ করে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্ব মনে করেন যে জামায়াতে ইসলামী তাদের সঙ্গে একাত্ম থাকলে তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না কেউ। কিন্তু সেটি হয়নি ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। আগে থেকেই বিএনপির প্রগতিশীল অংশ জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের মন্ত্রী বানানো কিংবা তাদের সঙ্গে স্থায়ী জোট গড়ে তোলার কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তার মধ্যে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়াসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসংখ্য নেতাকর্মী ছিল। বিএনপি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত একটি রাজনৈতিক দল। তারা কোনোমতেই বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের স্থায়ী সম্পৃক্ততাকে মেনে নিতে পারেনি।

এ অবস্থায় কথা উঠেছে, বিএনপির উচিত জামায়াতিদের স্বাধীন বা আলাদাভাবে কাজ করতে দেওয়া। প্রয়োজন হলে তারা একাত্তরের পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে পৃথকভাবে একটি নতুন দল গঠন করুক। এবং ধর্মীয় ভাবধারায় গণতান্ত্রিকভাবেই তারা তাদের রাজনীতি করুক। তাতে আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বলে কোনো বিরোধ থাকবে না। তাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। বিএনপির বরং উচিত হবে একটি নতুন দল গঠনের ব্যাপারে তাদের সাহায্য করা এবং নিজেদের বিভিন্ন অভিযোগ থেকে মুক্ত করা। রাজাকার-আলবদরমুক্ত হওয়া। এর পাশাপাশি বিএনপির উচিত দলের ভেতর অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একটি শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা। তাতে বিএনপি দুর্বল হবে না এবং আরো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

ওপরে উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে বিএনপির সামনে এখন নতুন করে সুযোগ এসেছে দলটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। বিএনপিকে তৈরি করতে হবে ভবিষ্যতে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। সেদিকে লক্ষ রেখেই কাউন্সিল ডেকে দলের পুনর্গঠন করতে হবে। নতুবা সংগঠন শক্তিশালী হবে না এবং আন্দোলন গড়ে তোলারও কোনো প্রশ্ন ওঠে না। বর্তমানে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে দলের ভেতরে এক বিভ্রান্তিকর রাজনীতি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতি তিন বছর অন্তর দলের কাউন্সিল হওয়ার কথা, সেখানে গত ৪০ বছরে বিএনপির কাউন্সিল ডাকা হয়েছে ছয়বার। এবার এপ্রিল কিংবা মে মাসের দিকে কাউন্সিল ডাকা হলে সেটি হবে দলনেত্রী খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে প্রথম কাউন্সিল। তবে কাউন্সিল ডাকার ব্যাপারে দলনেত্রী কিংবা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান কোনো নির্দেশ দিয়েছেন বলে এখনো জানা যায়নি। অনেকের মতে, দল টিকিয়ে রাখতে হলে এখন থেকে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার কথা গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। নতুবা শুধু আন্দোলন নয়, দলের সাংগঠনিক শক্তিও বৃদ্ধি পাবে না। সে কারণেই বর্তমান সময়টি বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সিল ডেকে দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও জরুরি আলোচনা হতে পারে। তা ছাড়া রয়েছে দল পুনর্গঠনের বিষয়টিও।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)
সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত