বিমান ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু কথা

আমরা দেখেও কিছু শিখতে রাজি নই। বিশ্বের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমরা এখনো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পুরনো মডেল আঁকড়ে বসে আছি। আমরা পশ্চাতে পড়ে আছি কি না এটা ভালোভাবে বোঝা যাবে যদি আমরা আমাদের বাংলাদেশ বিমানের ও ঢাকা বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার দিকে লক্ষ করি। বিশ্বের বড় এয়ারলাইনসের বেশির ভাগই লাভে আছে। আরো বেশি লাভ করার জন্য অনন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক বিমান সংস্থা থেকে অন্য বিমান সংস্থা আরো ওপরে পৌঁছতে যাচ্ছে। আর আমরা আমাদের বিমান বাংলাদেশ নিয়ে যেন পেছনেই যাচ্ছি। পেছনে যাওয়ার গতিটা যেন থামছেই না। আর্থিকভাবে এই সংস্থা কী অবস্থায় আছে, তা জানা যেত যদি কোনো হাই অডিট ফার্ম দ্বারা এই সংস্থার লাভ-লোকসান জনগণের কাছে পেশ করা যেত।

সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যারান্টি দিয়ে এই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য অত্যাধুনিক এয়ার ক্যারিয়ার সংগ্রহ করছে। কিন্তু এসব অর্থ ব্যয়ের কস্ট বেনিফিট হিসাব করে একবারও কি দেখা হয়েছে? সরকার এ পর্যন্ত এই সংস্থাকে যে অর্থ দিয়েছে তার থেকে কী লাভ পেয়েছে তা একবারও কি জাতিকে জানিয়েছে। নতুন এয়ারক্রাফট এলো ড্রিমলাইনারস। কিন্তু এগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে চালানোর সেই সামর্থ্য বর্তমান বিমান বাংলাদেশ ব্যবস্থাপকদের আছে কি? সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উল্লেখ করার মতো কোন এয়ার কম্পানি আজও চলছে, তা আমাদের জানা নেই। এক দশক বা আরো দু-এক বছর আগে বিমান বাংলাদেশকে লিমিটেড কম্পানিতে রূপ দেওয়া হলো। তাতেও কিছুই বদল হয়নি। সরকারি মালিকানায় পাবলিক লিমিটেড কম্পানি আর সরকারি এন্টারপ্রাইজের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু কাগজে-কলমে। বাস্তবে বিমানের পরিচালনা বোর্ড গঠন থেকে অন্য ব্যবস্থাপনা আগের মতোই রয়ে গেছে। বরং বলা চলে আগের থেকে বিমান বাংলাদেশ এখন পেছনে চলে গেছে। অনেকটা নিবু নিবু। সর্বত্রই একটা পর্যুদস্ত ভাব। অথচ এই বোর্ডে নতুন লোকেরা এসেছেন-গেছেন। বিমান বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন মন্ত্রীও এসেছেন-গেছেন। কিন্তু এই এয়ারলাইনস ব্যাবসায়িক সক্ষমতা অর্জন করেছে কি?

অবস্থাটা হলো, অন্য সরকারি সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক হয়েও যেমন প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক হতে পারেনি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরও একই অবস্থা। শত শত কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি খাতের কোনো সংস্থা এভাবে লোকসানে চললে অনেক আগেই সেটা বন্ধ হয়ে যেত। ব্যাংকক থেকে ঢাকার ফ্লাইট সময় হলো দুই ঘণ্টার। বাই এয়ারলাইনস বা এয়ার করপোরেশনও দৈনিক একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে। বিমান বাংলাদেশও করে। তবে পার্থক্য হলো বাই এয়ারলাইনস ফুল ক্যাপাসিটিতে যাতায়াত করে। আর বিমান বাংলাদেশ যাত্রী সংকটে ভোগে। কেন এমন হবে! বিশেষ করে যেখানে বাই এয়ারলাইনস টিকিট মূল্য বিমান বাংলাদেশের প্রায় ডাবল বা দ্বিগুণ চার্জ করছে? কিন্তু সত্য হলো, কম মূল্যে টিকিট বিক্রি করেও বাংলাদেশ বিমান যাত্রী পাচ্ছে না? সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমাকে ব্যাংকক যেতে হয়েছে। টিকিট নিলাম বিমান বাংলাদেশেরই। ভাগ্যক্রমে সেদিন ঢাকা-ব্যাংকক রুটে বিমানের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারস্ পেয়ে গেলাম। কেবিন ক্রুরা বললেন, প্রতিদিন এই রুটে ড্রিমলাইনারস্ দেওয়া হয় না। তবে এলে দেওয়া হবে। কারণ এরই মধ্যে আরো দুটি ড্রিমলাইনারস ফ্লিটে যোগ হয়েছে। কিন্তু দুঃখ পেলাম এই দেখে যে এই ড্রিমলাইনারসও যাত্রী সংকটে ভুগছে। মাত্র অর্ধেক ক্যাপাসিটিতে সেদিন বিমান বাংলাদেশ সেই অতি মূল্যের ড্রিমলাইনারস ব্যাংকক গেল। অন-বোর্ড সার্ভিসও খারাপ নয়। বরং থাই এয়ারলাইনস অন-বোর্ড সার্ভিস বিমান বাংলাদেশের থেকে কিছুটা নিম্নমানের। তাদের এই রুটের (জড়ঁঃব) এয়ারক্রাফটটি পুরনো। কিন্তু তার পরও কেন বিমান বাংলাদেশ পূর্ণ ক্যাপাসিটিতে যাত্রী পাচ্ছে না?

প্রশ্নটার উত্তর আছে অনেক। মূল সমস্যা হলো বিমানের ইমেজ বা ভাবমূর্তির সংকট। প্রায় সবাই ভাবে বিমান মানে অনিয়মিত, বিমান মানে কখন কী হয় জানি না। তাই এমনকি বাংলাদেশিরাও অধিক অর্থ ব্যয় করে বিদেশি এয়ারলাইনসের যাত্রী হচ্ছে। এই যে বিমান বাংলাদেশ ঢাকা-ব্যাংকক রুটে ড্রিমলাইনারস যোগ করল, এটাও অনেক যাত্রী জানে না। কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। বিমানের ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। মতিঝিলে টিকিট বিক্রি করার জন্য এখনো একটি অফিস আছে, যে অফিসটা একসময় বিমানের প্রধান কার্যালয় ছিল। আমি ওই সেলস অফিস থেকেই তিনটি টিকিট নিলাম। কিন্তু কেমন যেন নিস্তেজ নিস্তেজ ভাব। আলো ঝলমল একটা সেলস অফিস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সেলস অফিসের আলোগুলো কেমন যেন নিবু নিবু। বিড়ম্বনায় পড়তে হলো ব্যাংককে গিয়ে টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। সেদিন ছিল সোমবার। আমাদের তিনটি টিকিটের মধ্যে একটি টিকিটের ফ্লাই তারিখ দুদিন পেছনে নিতে চাইলাম। ট্রাভেল এজেন্টকে বললাম রিটার্ন যাত্রার তারিখ দুদিন পিছিয়ে দেওয়া হোক। তখন ব্যাংকক সময় ৩টা। তিনি যোগাযোগ করে ব্যাংককের বিমান অফিসটা বন্ধ পেলেন। কোনো সাহায্য পাই কি না সে জন্য ঢাকায় যোগাযোগ করলাম। ঢাকা বলল, ব্যাংকক অফিস তো বন্ধ হওয়ার কথা নয়। শেষ পর্যন্ত আমাকে একটা মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে বলল ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে। করলাম। উত্তর এলো অফিস এখন বন্ধ হয়ে গেছে। দুদিন পর যোগাযোগ করুন। হায়রে বিমান বাংলাদেশ! সবাই যখন কাজ করছে তুমি তখন বন্ধ হয়ে আছ! শেষে রিস্কে (risk) না থেকে ফিরতির জন্য থাই এয়ারলাইনসের টিকিট নিতে হলো।

এসব বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে অন্য এয়ারলাইনসের যাত্রী হতে পছন্দ করে। ব্যাংকক বিমানবন্দরের নাম হলো সুবর্ণভূমি। হাজার হাজার যাত্রী প্রতি ঘণ্টায় এই বিমানবন্দর দিয়ে যাচ্ছে আর আসছে। সুবর্ণভূমিতে একসঙ্গে কয়েক ডজন বিমান সংস্থার জন্য বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়। কাউন্টারে লাইনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয় না। বিদেশিদের ভ্রমণের প্রধান গন্তব্য থাইল্যান্ড। গত বছর প্রায় চার কোটি পর্যটক থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন। সে তুলনায় আমরা যেন আমাদের দেশটাকে বন্ধ করে ফেলে রেখেছি। বিদেশিদের অভিবাদন জানাতে আমাদের যেন অনীহা। ঢাকা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে বিদেশিদের ১০-১৫ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যথা পেলাম। কজন বিদেশি এ দেশে আসছেন! তাঁদেরও জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কেন আসছেন, কোথায় যাবেন ইত্যাদি। লক্ষ করলাম, এই বাংলাদেশে শুধু এমন বিদেশিরাই আসছেন, যাঁরা না এলেই নয়। শুধু বেড়াতে বাংলাদেশে কোনো বিদেশি আসছেন বলে মনে হয় না।

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনাই বা কি! সারা বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনা এক ধরনের, আমাদের বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা আরেক ধরনের। ঢাকা-ব্যাংককে ফ্লাইট আওয়ার দুই ঘণ্টা। তবে ঢাকা বিমানবন্দরে বেল্ট থেকে লাগেজ নিতে লাগে এক ঘণ্টা। লক্ষ করলাম কোনো বিদেশি পারতপক্ষে কোনো লাগেজ বুকিং দেন না। তাঁরা অন-বোর্ডে হাতে করে যা আনতে পারেন তা-ই আনেন। এত দিনে তাঁরা হয়তো জেনে গেছেন ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ বা স্যুটকেস নিতে ফ্লাইট আওয়ারের সমান সময় লেগে যেতে পারে। পুরো বিমানবন্দর অব্যবস্থাপনায় ভর্তি। বোর্ডিং পাস নেওয়ার জন্যও লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। ফ্লাইট অব্যবস্থাপনায় যাত্রীদের ভিড় থাকে অনেক। তবে বোর্ডিং পাস যে হলে দেওয়া হয়, ওই হলে বাইরে থেকে প্রবেশ করার জন্য মাত্র দুটি গেট খোলা থাকে। অর্থাৎ যাত্রীরা ঢুকতেই বিড়ম্বনার শিকার হয়। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অনেক বিদেশিই ঢাকা বিমানবন্দরকে এড়িয়ে বিশ্বের অন্যত্র যাতায়াত করেন। বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরগুলো লাভজনকভাবে চলছে। এগুলো জনগণের কাছ থেকে পুঁজি নিয়ে পাবলিক লিমিটেড কম্পানি হয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আর ঢাকার এয়ারপোর্ট এখনো সরকারি মালিকানায়। আর চালাচ্ছে সিভিল অ্যাভিয়েশন নামের আরেক সরকারি সংস্থা। বিমান বাংলাদেশ লিমিটেড কম্পানি হয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাহলে দক্ষতা বাড়াতে জবাবদিহিও কোথায়? আজকে বিমানবন্দরে যে নোংরা এবং নিবু নিবু পরিবেশ বিরাজ করছে, তা অনেক আগেই দূর হয়ে যেত। জনগণ সেবার জন্য অর্থ দিতে রাজি আছে। কিন্তু সেই অর্থ তো নিতে জানতে হবে। কেন আমরা আজ পর্যন্ত গ্রাউন্ড ব্যক্তি খাতের কোনো নামি কম্পানির কাছে ইজারা দিতে পারলাম না? এসব সেবা প্রদান অনেক আগেই অন্য দেশে ব্যক্তি খাতে চলে গেছে। আমরা শুধুই ভাবছি, তবে সে ভাবার কোনো শেষ নেই।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত