উন্নয়ন, সুশাসন ও গণতন্ত্রের সমন্বয় জরুরি

নতুন বছরের শুরুতে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে অনেক নতুন বিষয়, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ থাকে। মানুষের অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা থাকে, সরকার গঠনের পরে। এবারের সরকার তো ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে। কাজেই সরকারের অনেক কিছু আগের মতোই হয়তো চলতে থাকবে। কিন্তু এবারের নতুন যে বিষয়টি আমাদের সামনে এসেছে, সেটি হচ্ছে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ। এ বিষয়ে নানা মুনির নানা মত থাকবে, সন্দেহ নেই। অনেকে এবার এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। বিগত মন্ত্রিসভার যাঁরা এবারও নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন, মন্ত্রী ছিলেন; কিন্তু এবার তাঁদের বেশির ভাগই মন্ত্রী হিসেবে সুযোগ পায়নি। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী—সব মিলিয়ে বিগত মন্ত্রিপরিষদের প্রায় ৩৬ জন সদস্য এবার বাদ পড়েছেন। তাঁদের বাদ পড়ার পেছনে কিছু কারণ ও ব্যাখ্যা পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি। কারো কারো ক্ষেত্রে অভিযোগ ও কর্মকৌশলের ব্যাপারে যে তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে, সত্যিকার অর্থেই তা গুরুতর। সেই হিসেবে পুরনোদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিকই মনে হয়েছে। নতুন মুখ মানেই সম্ভাবনা। নতুন সরকারের নতুন সব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নতুন মুখ নিয়ে কাজ করাটা আরো বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও বলব, পুরনোদের মধ্যে অনেক অভিজ্ঞ ও পারদর্শী মন্ত্রীও ছিলেন, তাঁরাও বাদ পড়েছেন। কিছু মন্ত্রীর জন্য বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেত কি না, তা নিয়ে ভাবা যেত। এটি একটি বিবেচনা। আবার নতুন মন্ত্রী-সদস্য, যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সামনেও নতুন সম্ভাবনা এবং ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। এটিও আরেক ধরনের বিবেচনা। কোনো মতকেই এককথায় বাতিল করে দেওয়া যায় না। তবে মানুষের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতাও আছে যে একই মুখ বা ব্যক্তিকে বারবার দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকে না। নতুন মুখ দেখতে চায়।

এবারের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় যাঁরা নতুন মুখ এসেছেন, তাঁদের চিন্তা ও কাজ জনগণের ওপর প্রভাব রাখবে এবং সুন্দর কিছু করবেন তাঁরা, সেই আশাবাদ আমরা পোষণ করি। নতুনদের অভিজ্ঞতা দরকার। কাজের সুযোগ না পেলে তো অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে না। ফলে নতুনদের জায়গা করে না দিলে তাঁরা তো সুযোগ পাবেন না। কিন্তু যেটি বিবেচনায় এনে এই পরিবর্তন করা হয়েছে, পুরনোদের মধ্যে অনেকে যেমন খুব বিতর্কিত আছেন, আবার অভিজ্ঞ এবং দক্ষ মন্ত্রীও ছিলেন। আমার নিজের যেটি মনে হয়েছে, নতুনদের আগামী প্রজন্মের জন্য নেতৃত্বের ভিত তৈরি করার লক্ষ্যে মন্ত্রিসভার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে বলে আমি মনে করি। এটিকে ইতিবাচক ভাবনা বলেই মনে হয়েছে। সিনিয়ররাই যদি জায়গা দখল করে রাখেন, তাহলে তো নতুনরা সুযোগ পাবেন না। নতুনদেরও প্রশিক্ষণ ও সুযোগ দরকার। আবার এটিও চিন্তার বিষয় যে নতুন মন্ত্রীর কাতারে তরুণদের সংখ্যা এত বেশি যে তাঁদের প্রশিক্ষণ ও শেখার যে বিষয় আছে, তাঁদের শেখানোর জন্যও মন্ত্রিপরিষদে লোকবল কম। এটি একটি ঝুঁকি বা সমস্যা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু যাত্রা তো মাত্র শুরু, সামনে কী হবে এখনই বলা যায় না। এটিকে আমরা বড় ধরনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখলে ভালো। আমি সেভাবেই বিষয়টি দেখছি। নতুন মন্ত্রী এবং তরুণ নেতারা আমাদের কী উপহার দেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেসব দেখার জন্য মানুষকে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, সেই সময় পর্যন্ত জনগণ অপেক্ষা করতে পারবে কি না এবং নতুন মন্ত্রীরা এরই মধ্যে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে নতুন কিছু দেখাতে পারবেন কি না, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।

আমি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ নই। দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আরো নতুন এবং নানা বিষয়ে কাজ হবে। অনেক কাজ হয়েছে, তাতে যেমন সন্দেহ নেই, তেমনি সব উন্নয়নই যে উন্নয়ন নয়—এটিও মনে রাখতে হবে। উন্নয়নের যে বিশাল বা মেগা প্রজেক্টগুলো আছে, তাতে খুব বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে এবং কাজের সময়ের সঙ্গে সমন্বয় থাকছে না। কাজ শেষ করতে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আবার সময় বাড়ানো হচ্ছে। এতে আবার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এটি ঠিক নয়। এটি কোনো ভালো দিক নয়। এক হতে পারে, খরচ বেশি দেখানো হয়। অনেক সময় দুর্নীতির কারণে খরচ বেড়ে যায়। দুর্নীতি যে হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এটির পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ।

দেশের একজন সাধারণ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি যেটি প্রত্যাশা করি—নতুন সরকার নির্বাচনকালে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারে, সেসব দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের সব ধরনের সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতা এটির ওপর অনেকখানি নির্ভর করবে বলে আমি মনে করি।

আরেকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে—সুশাসন ও গণতন্ত্র। আমরা নাগরিক সমাজ সব সময় বলে আসছি, উন্নয়ন অবশ্যই করতে হবে; কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসনও প্রয়োজন এবং গণতন্ত্রকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আইনের শাসনের গুরুত্বও থাকতে হবে। মানবাধিকার থাকতে হবে এবং মানুষের অধিকার থাকতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা ও প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মধ্যে সব ধরনের স্বাভাবিক অধিকার, জীবনের নিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এসব ছাড়া শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

আমরা বিগত সময়েও দেখেছি, শুধু উন্নয়ন দিয়ে গণতন্ত্রকে টেকসই করা যায়নি। তা সম্ভবও নয়। উন্নয়ন মানে সামাজিক অবকাঠামোর সব বিভাগে গুরুত্ব দিতে হবে, তা নয়। সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন মানেই তো উন্নয়ন নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তাও উন্নয়নের মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া সব ধরনের মৌলিক বিষয়, যা কিছুর উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠা জরুরি তার সবই ইশতেহারে উল্লেখ ছিল। গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন—সব কথাই বলা আছে। তারা আগেও ইচ্ছা করলে সব কিছু করতে পারত। আগে করেনি, এখন করুক। এখন তাদের সামনে বিশাল সুযোগ ও সময় আছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাক। কাজেই আমার এখন বলার কথা এটিই যে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে সব উন্নয়ন ও গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষ আশা করে। তা না হলে উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

একই সরকার বারবার দেশ পরিচালনায় এলে কিছু সমস্যা আর ঝুঁকিও আছে। আমরা পলিটিক্যাল সায়েন্সের ছাত্র হিসেবে একটি কথা পড়েছি—পাওয়ার করাপটস, অ্যাবসলিউট পাওয়ার অ্যাবসলিউটলি। তো সেই হিসেবে বলা যায়, একই সরকার বারবার ক্ষমতায় এলে কিছু সমস্যা তো হয়ই। নানা ধরনের ভিন্নমতের শক্তির উত্থান ঘটে। আমরাও সেই ঝুঁকির বাইরে নই। কিন্তু এই সরকার তো সব কিছু একটি সমন্বয়ের ভেতরে করার চেষ্টা করছে। দেখা যাক, সামনে কী হয়।

এবারের নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা নিয়ে এখন আর কথা বলে লাভ নেই। নির্বাচন নিয়ে মানুষের নানা মত ও অভিমান আছে। সেদিকে আর না যাই। নতুন সরকার আরো একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে—সেই পথে নানা সমস্যা ও লড়াই আছে। সব সরকারই চায় যে দেশ ও জনগণের জন্য ভালো কিছু করবে। সে জন্য আন্তরিক চেষ্টা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দরকার। নতুন সরকারের সদস্যদের মধ্যে সেসবের অনেক কিছুই আছে। অনেক কিছু নেই। অনেক কিছু যুক্ত হবে। সম্ভাবনা ও প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। একটি বিশেষ টিম দরকার। সেই টিম কী করবে, কতটুকু করতে পারবে, তা তো এখনো বোঝা যাচ্ছে না। দেখা যাক, কী করেন নতুন প্রজন্মের নেতারা।

আরেকটি জিনিসের খুব ঘাটতি আছে বা ঘাটতি থেকে গেল। শক্তিশালী একটি বিরোধী দলের খুব দরকার ছিল সংসদে। সেটি দেখতে পেলাম না। এইচ এম এরশাদের দল জাতীয় পার্টি এখন সংসদে বিরোধী দল। এটি কী করে সম্ভব, তা আমার বোধগম্য নয়। তারা তো সরকারের সঙ্গে জোট করে তাদের সঙ্গে মিলেমিশে নির্বাচন করেছে। গঠনতন্ত্র অনুসারে তারা তো বিরোধী দল হতে পারে না। এটি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি হয় না। এটি একটি লোক-দেখানো বিরোধী দল হয়ে গেল।

বিএনপি যে শেষ পর্যন্ত সংসদে গেল না, তাদের অল্প কয়েকজন সদস্য নিয়ে, এটি নিয়েও অনেক কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এটি ভালো হয়েছে, তারা যায়নি। কারণ এত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের কাছে তারা কিছু করতে পারবে না।

নতুন সরকারের নতুন ধরনের উন্নয়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন বাস্তবায়নের দিকে আমরা তাকিয়ে রইলাম।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

পাঠকের নির্বাচিত আরও

কেন্দ্রীয় নেতাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন প্রার্থীরা

পাঠকের মতামত