নির্বাচনের মণিমুক্তা

গত ক’দিন ধরে পত্র-পত্রিকায় একই ধরনের খবর পড়তে পড়তে, টিভির টক-শোগুলোতে একই বিষয়ের ওপর বকবকানি কচকচানি শুনতে শুনতে, (কখনো কখনো নিজেও ‘বকাউল্লাহ’ সেজে আগ্রহী, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনাগ্রহী, ‘শোনাউল্লাহদের’ উদ্দেশে ‘ওয়াজ-নসিহত’ করেছি) যখন দারুণ ‘কেলান্ত’, (দক্ষিণবঙ্গে ক্লান্ত শব্দের এই চমৎকার বিপ্রকর্ষীয় রূপটি শুনতে ভালোই লাগে আমার), তখন আজকের (২ জানুয়ারি ২০১৯) একটি দৈনিকের একটি নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদন পড়ে রীতিমত চাঙ্গা হয়ে উঠলাম। ক’দিন ধরেই তো সংবাদপত্রগুলোর আগাপাস্তলা নির্বাচনী সংবাদে মোড়া, যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক মঞ্চের কবিয়ালদের উতোর-চাপানে ভরতি। এই খবরটি বা প্রতিবেদনটি, যে নামেই ডাকুন, দুইজন বিজয়ী প্রার্থীসংক্রান্ত। এঁরা দু’জনই এবার ঢাকা শহরের দু’টি আসনে বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেছেন। এঁদের একজন ঢাকা-৯ আসনে বিজয়ী প্রার্থী আওয়ামী লীগের খ্যাতিমান নেতা জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী ও অন্যজন ঢাকা-৪ আসনের জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতা সৈয়দ আবু হোসেন (বাবলা)। এঁরা দু’জনেই তাঁদের পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হতে গিয়েছিলেন। সৌজন্য, শিষ্টাচার, বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা ইত্যাদির এই আকালে, বিশেষ করে যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের নিদারুণ অনুপস্থিতির জন্য আমরা অহর্নিশ বিলাপ করছি, মাতম করছি বুক চাপড়িয়ে, সেই রাজনীতিতে এরূপ দু’টি দুর্লভ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে দেখে গাইতে ইচ্ছে করে : এ আগুন ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, সবখানে…।

এই তো ক’দিন আগে বিএনপি’র একজন প্রবীণ নেতা—যিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন মন্ত্রী ও দলের নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ কমিটির সদস্য—ভালো-মন্দ সব কিছুর হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে যখন চলে গেলেন চিরকালের জন্য, তখন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাউকে একটু আহা-উহু পর্যন্ত করতে দেখলাম না। একই ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ ও অন্য দলগুলোর বেলায়ও। এ ধরনের হিমশীতল নীরবতা দেখে মনে হয়, যেন প্রতিপক্ষের জীবিত ব্যক্তিরা দুঃখিত নয়; বরং মনে মনে ভাবেন, ‘যাক বাবা, আপদ গেছে। আর ক’টা দিন আগে গেলেই পারত।’ তা না হলে এই শোকের মুহৃর্তে মুখে কুলুপ এঁটে থাকা কেন? অবশ্য এর ব্যতিক্রমও যে দেখা যায় না, তা নয়। তবে তা খুবই নগণ্য। বেঁচে থাকতে একজন মানুষ অনেকেরই চক্ষুশূল হতে পারেন, তাঁর চিন্তা-চেতনা, কাজকর্ম, কথাবার্তা অনেকেরই ভালো না লাগতে পারে, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে অন্য একজনের মতাদর্শ নাও মিলতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর পর তো তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তখন কি একবার তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করা যায় না? সমবেদনা জানানো যায় না তাঁর পরিবার-পরিজনকে? বিষয়টি নিয়ে ক’দিন আগে ‘এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক’ শিরোনামে এই কলামেই একটি নিবন্ধ লিখেছি (১০.১১.১৮)। রাজনীতিতে শিষ্টাচারের অভাব নিশ্চয়ই একটি বড় রকমের অপসংস্কৃতি।

দুই.

এবারকার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে একেবারে অহিংস ছিল, পরিবেশ যে খুব শান্তিপূর্ণ ছিল, তা বলা যাবে না। তবে অতীতের, বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় হানাহানি অবশ্যই কম হয়েছে, যদিও আগাগোড়াই জনমনে ভয়-ভীতি বিরাজ করছিল এবং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কিছু কিছু সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চলেছিল। মানুষের মনে শঙ্কা বিরাজ করছিল, কারণ তারা ঘরপোড়া গরুর মত সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাচ্ছিল। এরই ভেতর চলছিল বিষোদ্গার, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। তবে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগের একটি তীর সারাক্ষণই ছিল নির্বাচন কমিশনের দিকে। আর তা যে খুব একটা অমূলক ছিল, তা বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা ও নিস্পৃহতা ছিল চোখে পড়ার মত। ৩০ ডিসেম্বরের আগে তাদের আচরণ দেখে কখনো কখনো মনে হয়েছে, যেন-তেন-প্রকারেণ একটা নির্বাচন করতে পারলেই হলো। যেন জিপিএ-৫ কিংবা এ ইত্যাদি পাওয়ার দরকার নেই, কোনো রকমে পাশ করতে পারলেই হলো। আর তারা হয়তো এও ভেবেছেন, ফেলটা করাবে কে? পরীক্ষক তো আমরা নিজেই। নিজেরা পরীক্ষা দেব, নম্বরও দেব নিজেরাই। এতে সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়লেই হবে। কিন্তু এবার জনগণের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে পয়লা নভেম্বরে ঘটনাবলির নাটকীয় মোড় পরিবর্তনের পর। জনগণ ভাবতে শুরু করল, খেলার নিয়ম-কানুন শতকরা এক শ ভাগ মেনে একটা সুষ্ঠু সুন্দর ‘খেলা’ দর্শকদের উপহার দেওয়ার জন্য বোধ হয় এবার সংশ্লিষ্ট সবার বোধোদয় হয়েছে। মনের ভেতর ভয়-ভীতির মেঘ যতই জমা থাকুক, মানুষ আশার ফানুস ওড়াতে শুরু করল : এবার বহুদিন পর দেশে একটি চমৎকার নির্বাচন হবে। (দক্ষিণবঙ্গের কোথাও কোথাও লোকে চমৎকার বলে না, বলে চমেৎকার। আমার কাছে এটাও শুনতে চমৎকারই লাগে।)… তারপর? তারপর যা হয়েছে তা তো সিনেমার অ্যাডের ভাষায় বলা যায়—বাকি অংশ ‘রুপালি পর্দায় দেখুন’। অবশ্য এখন তো শুধু বাকি অংশ নয়, পুরো অংশই দেখা হয়ে গেছে আমাদের। যদি জিজ্ঞেস করেন, কেমন দেখলেন? জবাবে পুরান ঢাকার ঢংয়ে বলব : ‘আবার জিগায়।’ তার পরও যদি ঝুলাঝুলি করতে থাকেন, ‘বলেন না, কেমন হয়েছে ইলেকশন? একটু ঝেড়ে কাশুন’, আমি বলব, ‘এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কফ জমে বুকে বসে গেছে, কাশতে পারছি না। আর আল্লাহ পাক আপনাকেও দু’টি চোখ, দু’টি কান দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন আমাকে। অতএব, আপনি যা দেখেছেন-শুনেছেন, আমিও তা-ই দেখেছি-শুনেছি, একটুও খাদ মেশাতে পারব না।

আসলে নির্বাচন নিয়ে কথা বলাবলি-চালাচালি তো শুরু হয়ে গেছে জিতু পার্টি-হারু পার্টির পক্ষ থেকে। আর বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আসল হকদার তো তারাই। আপনি-আমি বাইরের লোক। আমরা কেন খামাকা তাদের ব্যাপারে নাক গলাতে গিয়ে নিজেদের ভোক্সওয়াগন মার্কা খাদা নাককে আরো একেবারে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা করতে যাব। আসুন, আমরা বরং নিরাপদ দূরত্বে থেকে রাজায় রাজায় যে যুদ্ধ চলছে—এবং চলবে অনাদিকাল পর্যন্ত—তাতে নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা পালন করি। রাজপথে যখন দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে, তখন পুলিশ যেমন কখনো কখনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, নিরপেক্ষ থাকে, অনেকটা তেমনি।

এই সুযোগে সেই নিরপেক্ষ লোকটার গল্পটি হাত সাফাই করে আপনাদের শুনিয়ে দিই। এক লোক কোথাও বিয়ের আসর দেখলেই ঢুকে পড়ে দিব্যি পেটপূজায় লেগে যেত। কোনো দাওয়াত-ফাওয়াতের ধার ধারত না। কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করত, ভাই, আপনি কোন পক্ষের? কনেপক্ষের না বরপক্ষের? সে পাল্টা প্রশ্ন করত, আপনি কোন পক্ষের? উত্তরে যদি শুনত কনেপক্ষ, তবে সে নিজেকে বরপক্ষ বলে পরিচয় দিত। আর প্রশ্নকর্তা বরপক্ষের হলে বলত, আমি কনেপক্ষের। এভাবে দিব্যি ফোকটে সব বিয়েবাড়িতে আমন্ত্রিত না হয়েও সে ভূরিভোজনটা চালিয়ে যেত। একবার এক বিয়েবাড়িতে কনেপক্ষ-বরপক্ষ উভয় পক্ষের লোকদের কেমন সন্দেহ হলো : এই লোককে সব বিয়েতেই দেখা যায়। ব্যাপারটা কী? রোজই কি তার আত্মীয়দের বন্ধুদের বিয়ে থাকে? তারা সল্লা করে উভয় পক্ষ মিলে ‘ঐক্যফ্রন্ট’ করে তার সামনে গিয়ে হাজির হলো। তারপর প্রশ্ন : ভাই সাহেব, আপনি কোন পক্ষের? লোকটি প্রশ্নকর্তাকে একঝলক দেখে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, আপনি কোন পক্ষের? জবাব পেল : কনেপক্ষের। এবার পাশে দাঁড়ানো লোককে বলল, আর আপনি? ‘আমি বরপক্ষের’। আস্তিন গুটানো ষণ্ডামত একজন এগিয়ে এসে বলল, এবার বলুন, আপনি কোন পক্ষের। আমাদের ধড়িবাজ খাদক একবার ডানে একবার বাঁয়ে তাকিয়ে বলল, দেখুন, আমি এসব পক্ষাপক্ষি, দলাদলি মোটেই পছন্দ করি না, আমি নিরপেক্ষ। বলেই সে আবার কোর্মা-পোলাও, কালিয়া কোপ্তা ইত্যাদি সাবড়ানোতে মন দিল। ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন বলল, ও বুঝেছি, উনি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। বরপক্ষের একজন প্রশ্ন ছুড়ে দিল, নিরপেক্ষ যদি তা হলে এই কনেবাড়ির বিয়েতে খায় কেন? কনেপক্ষ থেকে উত্তর এল, বৌভাতের দিন উনি আপনাদের ওখানেও খাবেন। দার্শনিক গোছের একজন বললেন, আসলে ওই মহান বাণীটাই সঠিক : জগতে পাগল আর শিশু ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নয়।

তিন.

সাবের হোসেন চৌধুরী ও সৈয়দ আবু হোসেনের মত সিলেট-১ আসনের এলেমদার বিজয়ী প্রার্থী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনও জয়লাভ করেই ছুটে গেছেন বিজিত প্রতিদ্বন্দ্বী খন্দকার আব্দুল মোকতাদিরের বাড়িতে তাঁর শুভকামনা ও সহযোগিতা চাইতে। আরো কোথাও কোথাও এ রকম সুদৃষ্টান্ত স্থাপনের কথা পত্র-পত্রিকায় এসেছে। এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নাম মনে পড়ছে না। যেখানে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন কোথাও কোথাও প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতাকর্মীদের হাতে প্রহৃত হয়েছেন, গুরুতর আহত হয়ে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যেখানে একদল আরেক দলের মুণ্ডুপাত না করে কোনো বক্তৃতাই শেষ করত না, সেখানে নির্বাচন শেষ হতে না হতেই প্রার্থীদের পরস্পর পরস্পরকে বুকে জড়িয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা, কুশল কামনা করা, সহযোগিতা চাওয়া নিঃসন্দেহে একটি উন্নতমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। দল-মত-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সবারই প্রত্যাশা এটাই। তারা হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণার রাজনীতিকে যেমন অন্তর থেকে ঘৃণা করে, তেমনি রাজনীতিতে সাধারণ সৌজন্য, শিষ্টাচার ও ভব্যতার অভাবকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। আমাদের ছোট-বড় সব দলই তো রাজনীতি করেন সাধারণ মানুষের জন্য, তাদের কল্যাণের জন্য। তবে কেন তারা মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে পারেন না? আমরা শৈশবে স্কুলে লালমনিরহাটের কবি শেখ ফজলুল করিমের ‘স্বর্গ-নরক’ শীর্ষক ছোট্ট কবিতাটি পড়েছিলাম। সেই যে ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর/মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক মানুষেই সুরাসুর’—এই চরণ দু’টি দিয়ে শুরু যে কবিতাটির। কবিতাটি কবি শেষ করেছেন এই বলে : প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে মিলি যবে পরস্পরে/স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদের কুঁড়েঘরে।

প্রতিপক্ষের হাতে নিগৃহীতা বিএনপির প্রার্থী আফরোজা আব্বাসও লাঞ্ছিত, প্রহৃত আরেক প্রার্থী তাঁর স্বামী মির্জা আব্বাসকে দেখতে গিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী যেমন আবারও প্রমাণ দিলেন, তিনি সত্যিই একজন নিপাট ভদ্রলোক, তেমনি আব্বাস-পরিবারের হৃদ্যতাপূর্ণ ও উষ্ণ আতিথেয়তাও নিশ্চয়ই সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। তেমনি মুগ্ধ করেছে সৈয়দ আবু হোসেন এবং ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বিশাল হৃদয়ের পরিচয়। এই নির্বাচনের এক হাজার একটা কুদৃষ্টান্তকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠিয়ে আমরা দুর্লভ মণিমুক্তার মত এইসব সুন্দর আচরণকে কি হৃদয়ে স্থান দিতে পারি না? হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা, সংঘাত-সহিংসতা নয়, এগুলোই হোক না কেন আমাদের আগামী দিনের পথচলার পাথেয়?

সবাইকে খ্রিস্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন। বাংলাদেশ ভালো থাকুক, আরো ভালো থাকুক। হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা, ছলচাতুরী-শঠতা চিরতরে নির্বাসিত হোক এ দেশ থেকে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
mkarim06@yahoo.com

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত