Dec 26, 2018 / 06:01pm

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইশতেহার ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন

বয়সের দিক থেকে প্রায় বার্ধক্যে পৌঁছানো একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আজকাল যখনই শুনি কেউ বাংলাদেশকে পাকিস্তানের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে; তখন বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, এক অজ্ঞাত ব্যথা কিংবা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা যেন ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয়, কী শোনার কথা ছিল আর কী শুনছি! এত ত্যাগ-তিতিক্ষা আর কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ পাকিস্তান হতে যাবে কেন? ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ ও দিগ্দর্শনহীন রাজনীতি এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির কারণে পাকিস্তান এখন একটি প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে। পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের শাসন-শোষণ, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদী রাজনীতির কারণে একাত্তরে বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। তারপর এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগ এবং ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ শেষে এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ তাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করেছিল। তার পরও আমাদের দেশের কিছু মানুষের এই অবাঞ্ছিত পাকিস্তানপ্রীতির কারণ কী? যে পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও তাদের অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য এ মুক্ত দেশটির জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরাধ স্বীকার করেনি, ক্ষমা চায়নি, তাদের প্রতি আমাদের এতটুকু দুর্বলতারই বা কী কারণ থাকতে পারে? মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কথিকা প্রচারের অপরাধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদর নামের তাদের এদেশীয় কুখ্যাত দোসররা আমার আত্মীয়স্বজনকেও রেহাই দেয়নি, ভিটেমাটি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করেছে। কাউকেই ছেড়ে দেয়নি তারা। নৃশংসভাবে হত্যা করা থেকে শুরু করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ মা-বোনদের ধর্ষণ করতেও পিছপা হয়নি সেই হায়েনারা। তখন তাদের ধর্মীয় নীতিবোধ ও পরকালের ভীতি কোথায় নির্বাসন দিয়েছিল? কারো ইসলামের প্রতি আনুগত্যকে আমি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছি না, আমি অভিযুক্ত করছি সেসব পাকিস্তানি হানাদার এবং এদেশীয় কিছু কুলাঙ্গারকে, যাদের মধ্যে কোনো বিবেক বা মনুষ্যত্বই কাজ করেনি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার, সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রও একই অপরাধে অপরাধী। কিন্তু চরম দুঃখের বিষয়, তথাকথিত আপস-নিষ্পত্তির চাপে আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক আদালতে তাদের কৃতকর্ম কিংবা মানব ইতিহাসের সে ঘৃণ্যতম অপরাধের দায়ে কোনো বিচার হলো না। তবে এখন থেকে ভবিষ্যতে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ আমাদের চরম আত্মদানের ক্ষেত্রে রক্তের অক্ষরে লেখা একটি বিশেষ দিন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিক, সেটিই কামনা করি।

বাংলাদেশের ৪৭তম বিজয় দিবস উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে এবার গণমাধ্যমে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। অনেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান প্রসঙ্গটি টেনে এনেছেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতকে আশ্রয়দানকারী বিএনপিসহ তাদের ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে তারা আবার বাংলাদেশকে পাকিস্তানের দিকে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে জামায়াত ও তার সহযোগী শক্তি ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ ও বিভিন্ন সহিংসতার মাধ্যমে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সমৃদ্ধির ধারাকে বিপর্যস্ত করবে। পরিণামে বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো আরেকটি দেউলিয়া কিংবা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেসব প্রচারিত অভিযোগ কিংবা প্রকাশিত সংশয়ের বিরুদ্ধে কোনো জবাব দেয়নি অভিযুক্তরা। বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে একটি প্রতিবাদলিপিও গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য ইস্যু করেনি কেউ। বিএনপি একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পক্ষের একটি আপসহীন শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল তাদের পরিচিতি। কিন্তু আজ কোথায় বিএনপির অবস্থান? কী পরিণতি হয়েছে বিএনপির? শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্য জামায়াতের সাহায্য চাই বিএনপির। কী দেখার কথা ছিল আর কী দেখছি এখন? আরো আশ্চর্য হয়েছি গণফোরামপ্রধান এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের পরিবর্তিত অবস্থান দেখে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার বিরুদ্ধপক্ষ জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে মোর্চায় আসতে হবে। কিন্তু বিএনপি নিভৃতচারীর মতো তাদের নিয়েই আবির্ভূত হয়েছে। আর ড. কামাল হোসেন শেষ পর্যন্ত তাদের সাদরে বরণ করে নিয়েছেন। বরং বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা আরেক অবাঞ্ছিত দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। জাতীয় ঐক্যজোটে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। একজন প্রবীণপ্রজ আইনজীবী ও রাজনীতিক হিসেবে বিষয়টি সামাল দিতে পারেননি ড. কামাল। পরে তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলেও সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকের সে প্রশ্নের জবাবটি তো আর পাওয়া যায়নি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি ছাড়া অন্যদের মধ্যে কথিত জামায়াতিরা পেয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মনোনয়ন। যেখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্য শরিকরা সবাই মিলে পেয়েছে ১৮টি মনোনয়ন, সেখানে দলীয় নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতের প্রার্থীরা পেয়েছেন ২২টি মনোনয়ন। এটি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বিচলিত না করলেও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষকে বেশ কিছুটা হতাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে আমি বলছি না যে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা এ দেশের বৈধ কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারবে না। তবে জামায়াতের উল্লিখিত প্রার্থীরা বিএনপিতে যোগ না দিলেও তারা ধানের শীষ মার্কা নিয়েই নির্বাচনে নেমেছেন। তাতে দেশব্যাপী কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা এখনো দেখার বাকি। মনে পড়ে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতকে ছাড়াই বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। এরপর বিগত বছরগুলোতে বিএনপিকে কোথায় নিয়ে গেছেন তার নেতারা? ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি জাতীয়তাবাদী দলের এ ধরনের পরিণতি হতে পারে; তা বিশাস করা কঠিন। নেহাত ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মূল্যবোধের বাহ্যিক পরিবর্তন দলটির প্রাণশক্তিই বিলোপ করেছে বলে অনেকের ধারণা। সে কারণেই হয়তো বিএনপির এত বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন প্রকৃত অর্থে কোনো ফল দেয়নি। দলটির নেতাকর্মীরা উল্লেখযোগ্য কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামেনি। তার জন্য তারা তাদের ভাষায় ক্ষমতাসীন সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ হামলা, মামলা ও নির্যাতনসহ অনেক কিছুর উদ্ধৃতি দিতে পারেন কিন্তু তাতেও আন্দোলনের ব্যর্থতার কথা ঢাকতে পারবেন না। সেখানে হয়তো বা প্রধান উপসর্গ একটিই, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।

রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভেতরে ও বাইরে যথেষ্ট বিতর্ক ও আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। উল্লিখিত প্রার্থীরা ছাড়া তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় কি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আর কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিল না? জামায়াতে ইসলামীর কারণে বিএনপিকে এরই মধ্যে যথেষ্ট খেসারত দিতে হয়েছে। তাতেও বদলায়নি বিএনপির বর্তমান নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ আসন্ন নির্বাচনটি বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ হতে পারত। বিএনপি আবার তার অতীতের মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে যেতে সক্ষম হতো। কিন্তু বিএনপি নেতাদের বক্তব্য শুনে মনে হয় তাঁরা যেন ভুলেই গিয়েছেন যে এ দলটি মুক্তযুদ্ধের চেতনা কিংবা বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে নিবেদিত একটি আদর্শনিষ্ঠ দল। তাঁরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয় ‘ব্যক্তির চেয়ে দল এবং দলের চেয়ে দেশ বড়’ স্লোগানটি এখন আর উচ্চারণ করেন না। তাঁদের কাছে এখন যেন ব্যক্তিই সব কিছুর ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ কথা ঠিক যে রাজনীতিতে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি কিংবা নেতানেত্রীর একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা কিংবা ভাবমূর্তি থাকতেই পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় জামায়াত কিভাবে ভিন্ন দলের নেতানেত্রীকে প্রমোট করবে, যেখানে দেশব্যাপী তার নিজের গ্রহণযোগ্যতাই বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন শরিক দলে বেশ কিছু খ্যাতিসম্পন্ন মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলী রাজনীতিক রয়েছেন। তাঁরা জোটের মনোনয়নদানের প্রশ্নে খুব একটা বুদ্ধিমত্তা কিংবা দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন না। কারণ আসন্ন নির্বাচনের মতো একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিছু ভুল মনোনয়ন দিয়ে তাঁরা বরং ভোটার কিংবা দেশবাসীর বিরাগভাজনই হয়েছেন। বিশাল ভোটার বাহিনীর সহানুভূতি কিংবা সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেরাই একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। সে কারণে নির্বাচন খুব সন্নিকটে হলেও বিভিন্ন বিরোধিতার মুখে মাঠপর্যায়ে তাঁরা চষে বেড়াতে পারছেন না। বর্ষীয়ান নেতা ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে বেশ কিছু অর্থবহ ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দিলেও ক্রমেই যেন স্থবিরতার শিকারে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কিছু দিন আগে জামায়াত সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তিনি কোথাও জামায়াতে ইসলামীকে দেখছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘জামায়াত কোথাও নেই।’ তাহলে তাঁরা ২২টি মনোনয়ন তুলে দিলেন কার হাতে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের সঙ্গে জামায়াতের বিরোধ নীতিগত। অতি সম্প্রতি উদ্যাপিত আমাদের বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে সেসব কথাই উচ্চারিত হয়েছে বারবার। আলোচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে জামায়াতে ইসলামী দলের সংঘটিত বিভিন্ন বর্বরোচিত ঘটনাবলি, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের বিষয়াদি। উল্লিখিত অমানবিক ঘটনাবলির সব কিছুই তারা সংঘটিত করেছে তৎকালীন পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য। বাংলাভাষী একই প্রদেশের মুক্তিকামী মানুষকে যারা একদিন চিহ্নিত করেছিল তাদের শত্রু হিসেবে, তারা কি এখন তা মুছে ফেলতে চায়? তারা কি তাদের রক্তমাখা কলঙ্কময় দলকে স্বেচ্ছায় বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী নতুন প্রজন্মকে নিয়ে একটি দেশপ্রেমিক নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে পারত না?

সেটি না করে তারা কেন বিভিন্ন দলের আশ্রয়ে থেকে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডকে ঢেকে রাখতে চায়? এ প্রক্রিয়ায় পেরেছে কি তারা তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বাঁচাতে? নির্বাচন সামনে রেখে অনেকেই জামায়াতিদের কাছে তার একটি সুস্পষ্ট জবাব চায়। কোনো পক্ষ থেকেই আসছে না কোনো প্রত্যাশিত জবাব। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে বিভিন্ন দল জামায়াতকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু এ ন্যক্কারজনক দুরভিসন্ধিমূলক রাজনৈতিক খেলার জনগণের কাছে কতটুকু মূল্য আছে? যারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে এদের টিকিয়ে রেখেছে, একদিন তাদের অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে। কারণ গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও এখন বুঝতে শিখেছে যে প্রকৃত ইসলাম আর জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য, আদর্শ ও উদ্দেশ্য এক নয়। তারা এটাও ভালো করে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে বাংলাদেশ কখনোই আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হবে না। যত দিন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা, ত্যাগ ও মূল্যবোধ এ দেশের অধিকার ও রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে, তত দিন কেউ এর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারবে না। গত ৪৭ বছরে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চড়াই-উতরাই পেরিয়েও বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে, পাকিস্তান গত ৭১ বছরেও তার ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি। অর্থনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী ভবিষ্যতে যে ১০টি দেশ বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এর পাশাপাশি একটি প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এখন সৌদি আরব ও চীনসহ কয়েকটি দেশের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভিক্ষার ঝুলি হাতে তাঁর দেশকে অচলাবস্থার হাত থেকে বাঁচাতে। সামরিক ও অসামরিক আমলাতন্ত্র, দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ ও পশ্চাৎপদতা পাকিস্তানকে এখনো গ্রাস করে আছে। সে কারণে উন্নয়নের মহাসড়কে চলা বাংলাদেশ কেন তার সে সমৃদ্ধির হাতছানি ছেড়ে পশ্চাৎপদতা ও নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হবে? পাকিস্তান আমাদের দীর্ঘ ২৫ বছর যথেষ্ট হেনস্তা ও অবহেলা করেছে। করেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হেয়প্রতিপন্ন ও অসম্মান। তবুও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ ছিল না। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের জামায়াতিরা চায় আমরা ভারতের সঙ্গে একটা মারদাঙ্গা, অশান্তি ও বিরোধ লাগিয়ে রাখি সার্বক্ষণিকভাবে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের নিকট-প্রতিবেশী ভারত আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হতে পারে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের নির্ভরশীল বন্ধু হতে পারে। কারণ আমরা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি।

নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাছ থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার পাওয়ার আশায় ছিল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ ইশতেহারে ভোটাররা দেখতে চেয়েছে তেমন অঙ্গীকার, যাতে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। থাকবে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার এবং তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ত্বরান্বিত করার প্রত্যয়। সামনে প্রয়োজন হবে উন্নয়ন ও উৎপাদনের ব্যাপক কর্মসূচির সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থ ও সম্পদপাচার, বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ, ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী পদক্ষেপ। যত বাধাবিপত্তি এবং সমস্যাই থাকুক না কেন, গণতন্ত্রকে সর্বস্তরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। আইনের শাসনকে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা কিংবা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সংকট সৃষ্টি হবে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে না। প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ছাড়া উন্নয়নের ধারা টেকসই ও অর্থবহ হবে না। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন না থাকলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহির সংকট দেখা দেবে। বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে একচেটিয়াভাবে করায়ত্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তদুপরি মজুদদারি ভাঙতে না পারলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল করা যাবে না।

তাতে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ বিক্ষুব্ধ ও আন্দোলনমুখর হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে চাই সুষ্ঠু বাজার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সম্পদের যথাসম্ভব সুসম বণ্টন এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আজকের ক্রমবর্ধমান লোকসংখ্যা কিংবা শহর-নগরে জনসংখ্যার চাপের পরিপ্রেক্ষিতে আনুপাতিক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি উন্নয়নশীল দেশগুলোয় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপরে আলোচিত বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধানের নিরিখে চলতি মাসের ১৭ ও ১৮ তারিখ যথাক্রমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ঘোষিত নির্বাচনী অঙ্গীকারের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন হয়ে বিভিন্ন দলীয় সরকারকে পাশ কাটিয়ে চলতে দেখেছি। তবে এবারের ইশতেহারে আওয়ামী লীগ প্রধানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার দেশবাসীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে বলে মনে হচ্ছে। পাশাপাশি সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ উচ্ছেদ করার প্রত্যয়ের মধ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের সদিচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আবার নির্বাচিত হলে দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করার বিশেষ অঙ্গীকারও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সমৃদ্ধি অর্জনের খাতিরে অধিকার সচেতন দেশবাসী এগুলো অবশ্যই মনে রাখবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার আবার ক্ষমতায় গেলে গণমাধ্যমের প্রধান কাজ হবে লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে সূচনা থেকেই ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে উত্তরোত্তর বেশি চাপ প্রয়োগ করা।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা আবশ্যক যে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক ও স্বার্থান্বেষী মহলকে প্রশাসন থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। নতুবা ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকারের অনেক কিছু খাতা-কলমেই লিপিবদ্ধ থেকে যাবে, বাস্তবায়িত হবে না। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আওয়ামী লীগ প্রধানের গ্রামগঞ্জ পর্যায়ে আধুনিক নগর সুবিধার সম্প্রসারণ এবং যুবসমাজকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যকে অধিকার সচেতন নাগরিকদের অনেকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২১ দফা অঙ্গীকার বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, একটি যথোপযোগী অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে অনেকের বিশ্বাস। আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের এক দিন আগেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে। অন্যদের মধ্যে তারা (ঐক্যফ্রন্ট) ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এ বিষয়টি সংগত কারণে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার মানে বিএনপিসহ পাঁচ দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তাতে বিশেষভাবে উল্লেখ করার বিষয় হলো, তারা ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনবে। পর পর দুই টার্মের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।

এবং একটি উচ্চকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছে তারা। তা ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। সরকারি চাকরি আইন সংস্কার এবং বেকার ভাতার বিষয়টি কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বিশ্বাস। তা ছাড়া ব্যাংকিংসহ আর্থিক খাতে দুর্নীতি তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে যেমন কিছু চমক রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু দুঃসাহসী অঙ্গীকার। তাদের ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশপ্রেমিক মানুষের মনে সাড়া জাগাবে বলে মনে হচ্ছে। তবে এ সবকিছুই বাস্তবায়নের জন্য চাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে হানাহানি ও সংঘাত বন্ধ করতে না পারলে কোনোমতেই তা অর্থবহ হবে না বলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। আমরা চাই সম্পূর্ণভাবে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। শান্তির জয় হোক, বাংলাদেশের জয় হোক।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক gaziulhkhan@gmail.com

কমেছে ওমানি রিয়াল রেট

817740

একলাফে বেড়ে গেলো সৌদি রিয়াল রেট

817737

কলসি ভর্তি সোনার আশায় শেষ ২০ লাখ টাকা

ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী কোনো বক্তব্য না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।