Dec 25, 2018 / 12:24pm

শেখ হাসিনার বিচার পরলোকের আদালতে স্থানান্তর করেছেন ড. কামাল

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

তাঁর হুংকার শুনে প্রথম ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যাঁকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার সম্পর্কে হুংকার দিতে শুনিনি; একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা শিবিরের লোক (মুক্তিযোদ্ধা নন) হয়ে মুক্তিযুদ্ধের শত্রু এবং একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের বিচার ও দণ্ডদানে যিনি কোনো ভূমিকাই নেননি, তিনি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের মঞ্চে উঠে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার ও দলকে হুমকি দিচ্ছেন, তাদের তিনি বিচার করবেন, শাস্তি দেবেনই। তারা দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে বিচার এড়ানোর সুযোগ পাবে না।

যদিও তিনি একজন পলায়নবাদী নেতা। সেই মুক্তিযুদ্ধের কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর মধ্যে কোনো আন্দোলনেই সাহসী নেতৃত্ব দেওয়ার বা ভূমিকা গ্রহণের কোনো প্রমাণ নেই। তিনি প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাকে হুমকি দিচ্ছেন। ব্যাপারটা কী? দুই দিন আগেও তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে না থাকুন, মুক্তিযুদ্ধের ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিবিরে তো ছিলেন। সহসা একটি সাধারণ নির্বাচন সামনে আসতেই এই ইউ টার্ন বা সম্পূর্ণ ভোল বদলের কারণটা কী?

শুধু ভোল পাল্টানো নয়, আওয়ামী লীগের শাসনকে স্বৈরাচারী শাসন আখ্যা দিয়ে সাম্প্রতিক অতীতের ঘোর স্বৈরাচারী, সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধাপরাধীচক্রের মঞ্চে গিয়ে উঠেছেন। এর কারণটাই বা কী? কারণ জানতে চেয়ে এক সাংবাদিক তো জবাব পেয়েছেন, ‘কত টাকা প্রশ্নটা করার জন্য পেয়েছ? তোমাকে চিনে রাখব।’ তারপর তিনি যে ভাষায় শেখ হাসিনাকে হুমকি দিয়েছেন, সেই ভাষা খালেদা জিয়ার কাছে ধার করা। শাপলা চত্বরে ব্যর্থ হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় খালেদা জিয়া এই ভাষায় শেখ হাসিনাকে ধমক দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।

তবু খালেদা জিয়ার তখন খুঁটির জোর ছিল। সঙ্গে ঘাতক ও সন্ত্রাসী জামায়াত ও হিংস্র মৌলবাদীগোষ্ঠী। তাঁর নিজের দল বিএনপিও কম শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু ড. কামাল হোসেনের পেছনে সেই খুঁটির জোর কোথায়? তাঁর দল গণফোরামের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্কই নেই। নির্বাচনে দাঁড়ালে জামানত জব্দ হয়। জিয়া অথবা এরশাদ আমলে তখনকার ঢাকার মেয়র আবুল হাসনাত তাঁকে একটা ধমক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দিনই দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।

তাঁর কণ্ঠে এখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হুংকার? এত বড় সাহসটা তিনি কোথা থেকে অর্জন করলেন? তাহলে কি জনরবই সঠিক যে তাঁর পেছনে কোনো খুঁটির জোর নেই, এত দিনে এ কথা বুঝতে পেরে তিনি খুঁটির জোর সংগ্রহের জন্য বিএনপি-জামায়াত শিবিরে শামিল হয়েছেন? বিএনপির অবশ্যই কিছু জনসমর্থন আছে। তাদের আছে সশস্ত্র তারেকবাহিনী। তাই তাদের দলে মিশে ড. কামাল কি ভাবছেন শেখ হাসিনাকে শিক্ষা দেবেন? তাই সহসা মেষ শাবকের চেহারা বদলে ব্যাঘ্রমূর্তি ধারণ করেছেন?

ঐক্যফ্রন্টের নেতা হওয়ার পর ড. কামাল হোসেনের হুংকার শুনে প্রথমে যে একটু ভয় পেয়েছিলাম সে কথা আগেই স্বীকার করেছি। কী জানি, এতকালের ‘কাগজের বাঘ’ সন্ত্রাসী বিএনপি-জামায়াতের কোলে উঠে সত্যি সত্যি রক্ত-মাংসের বাঘ হয়ে উঠলেন কি না! শুধু শেখ হাসিনাকে বিচার করা ও শাস্তি দেওয়ার হুমকি প্রদর্শন নয়, তিনি আওয়ামী লীগকে সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে টিটকারি দিতেও শুরু করেছিলেন। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে টিটকারি দিয়ে সম্প্রতি এক সভায় বলেছেন, ‘আপনারা তো এই নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন, তাই না? বিদায় নেওয়ার আগে কিছু ভালো কাজ করে যান। আমরা তা সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করব।’

যেখানে দুই দিন আগেও ড. কামাল সেজেছিলেন ‘বাঘের বাচ্চা’, তিনি আবার হঠাৎ মেষ শাবক হয়ে গেলেন কেন? দুই দিন আগে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিস্তম্ভে জমায়েত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁদের সঙ্গে অবমাননাকর ব্যবহার করে দুঃখ প্রকাশে বাধ্য হওয়ার পর তাঁর বোলচাল পাল্টে গেছে। যেদিন তিনি শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, ‘সাহস থাকে তো আমাকে গ্রেপ্তার করুন’, তার পরদিনই তাঁর কণ্ঠে ভিজে বেড়ালের সুর। তিনি জানেন, বিএনপি-জামায়াতের ক্রীড়নক হিসেবে বেশি বাড়াবাড়ি না করলে শেখ হাসিনা যাঁকে ‘বিগ আঙ্কল’ ডাকেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন না। সুতরাং খালি মাঠে বীরত্ব দেখাতে আপত্তিটা কী?

কিন্তু লক্ষণীয়, ড. কামালের কণ্ঠে প্রথম দিকের চড়া সুর আর নেই। এই সেদিন যিনি ‘আপনারা হেরে যাচ্ছেন’ বলে আওয়ামী লীগকে টিটকারি করেছেন, তিনি এখন বলছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই।’ কথাটা তিনি আগেও বলেছেন, ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন। কিন্তু হতাশা ও ডিসিটিজমের সুর তাতে এত স্পষ্ট ছিল না। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, এবার তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ঐফ্যফ্রন্টের পক্ষে একটা নির্বাচনী জোয়ার দেখা দেবে। সেই জোয়ার দেখা দেয়নি। বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে এবং জনতার ধাওয়া খেয়ে সম্ভবত সেটা তিনি বুঝতে পারছেন যে এবারও নির্বাচনে পরাজয় অবধারিত। তাই সম্ভাব্য পরাজয়ের লজ্জা ঢাকার জন্য বলতে শুরু করেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব নয়।’ নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার অতীতের বক্তব্য অনুসরণ করে বলবেন, ‘আওয়ামী লীগ আমাদের জয় ছিনতাই করেছে।’ কিন্তু সেই বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে কল্কে পাবে কি?

ড. কামাল যে পরাজয়ের আগেই পরাজিতের মনোভাব (defeatist mentality) দ্বারা আক্রান্ত, তা বোঝা যায় তার এখনকার একটি মন্তব্য থেকে। এত দিন তিনি শেখ হাসিনার বিচার করবেন বলে শাসিয়েছেন। এখন তিনি বলছেন, ‘ইহকালে তাঁর বিচার করা না গেলেও পরকালে তাঁর বিচার হবেই।’ রাতারাতি তিনি শেখ হাসিনার বিচারের দায়িত্বটা নিজ কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে একেবারে পরলোকের আদালতে পাঠিয়ে দিলেন! কিন্তু পরলোকে এই বিচারের দায়িত্বটা গ্রহণ করবে কে? শেখ হাসিনা তো এখনো ইহলোকেই সুস্থভাবে বেঁচে-বর্তে আছেন। এবং আরো দীর্ঘকাল থাকবেন বলে আশা করা যায়। দেশবাসী সে জন্যই আল্লাহর দরবারে নিত্য প্রার্থনা করছে।

এসব সত্ত্বেও পরলোকে শেখ হাসিনার বিচারের জন্য আদালত বসাবেন কে? বিচারপতি কে হবেন? আদালতে হলফনামা কে পেশ করবেন? হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের এবং মামলা পরিচালনায় প্রধান আইনজীবী কে হবেন? ধরে নেওয়া গেল, ইহলোকের আদালতে বসে শেখ হাসিনার সরকারকে উত্খাতের জন্য যে বিচারপতি এস কে সিনহার মদদ পাওয়া গিয়েছিল, তাঁকেই পরলোকের আদালতে নিযুক্তি দেওয়া গেল। ড. কামাল হোসেন হবেন বাদী বিএনপি-জামায়াত গ্রুপের পক্ষে মামলা পরিচালনায় প্রধান আইনজীবী। কিন্তু তাঁরা তো দুজনই এখনো ইহলোকে। নাকি শেখ হাসিনার দ্রুত বিচার ও শাস্তিদানের লক্ষ্যে তাঁরা দুজন আগেই পরলোক যাত্রা করবেন? বালাই ষাট! আমি তাঁদের জন্য কখনোই এই কামনা করব না। কোনো কারণেই করব না।

আমার কামনা, শেখ হাসিনা শতায়ু হোন। আসন্ন নির্বাচনে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হোন। দেশে যে উন্নয়নের ধারা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাঁর সরকার সৃষ্টি করেছে, তা অব্যাহত থাকুক। এবারের নির্বাচনে হিংস্র ধর্মান্ধতা এবং গণবিরোধী অপশক্তির চূড়ান্ত পরাজয় হোক। শেখ হাসিনার গত দুই দফার শাসনামলে যে কর্মসূচিগুলো অসমাপ্ত রয়েছে, যেমন দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দেশকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা, আইনের শাসন আরো বলবৎ করা, জনগণের জন্য দেশকে একটি প্রকৃত ওয়েলফেয়ার স্টেটে পরিণত করা, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্যের শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া—এসব লক্ষ্য পূরণে শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলেই যেন সর্বতোভাবে সফল হতে পারেন।

ড. কামাল হোসেনের জন্য আমার প্রার্থনা, তিনি বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হওয়ার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা থেকে সরে এসে যেন প্রয়াত আতাউর রহমান খান ও প্রয়াত শাহ আজিজুর রহমানের পরিণতি বরণ না করেন। আতাউর রহমান খান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের একজন। প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সুনামের অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তাঁর কিছু বন্ধুর পরামর্শে এবং ক্ষমতার মোহে পথভ্রষ্ট হলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় সমর্থন দিতে পারলেন না। কয়েকজন প্রবীণ আওয়ামী লীগার বন্ধু নিয়ে ঘোঁট পাকালেন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। পাল্টা রাজনৈতিক দল (জাতীয় লীগ) গঠন করলেন। ড. কামালের গণফোরামের মতো ছিল সে দলের অবস্থা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর পতন সম্পূর্ণ হয়। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নীরব। এরপর ক্ষমতার মোহে তিনি সামরিক শাসক এরশাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁর পুতুল প্রধানমন্ত্রী হন। এই সময় তিনি কিভাবে এরশাদের হাতে পদে পদে অপমানিত হন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হন তার বিবরণ আছে তাঁরই লেখা ‘ওজারতির দুই বছর’ বইয়ে।

শাহ আজিজুর রহমানের ইতিহাস আরো লজ্জাকর। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা এবং পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই ঘাতকদের সঙ্গে হাত মেলান এবং জিয়াউর রহমানের পুতুল প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। পরে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন। আজ তাঁর নাম রাজাকারদের তালিকাভুক্ত। আতাউর রহমান খান ও শাহ আজিজুর রহমান অন্ধ বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষে ভুগে দেশের এবং নিজেদের সর্বনাশ করেছেন। এখন সেই একই হাসিনাবিদ্বেষে ড. কামাল হোসেন ভুগছেন এবং তাঁর অগস্ত্যযাত্রা শুরু হয়েছে।

আমার একান্ত প্রার্থনা, বাংলার ইতিহাসে মীরজাফর ও মোশতাকের সঙ্গে যেন ড. কামাল হোসেনের নাম যুক্ত না হয়।

লন্ডন, রবিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮

কমেছে ওমানি রিয়াল রেট

817740

একলাফে বেড়ে গেলো সৌদি রিয়াল রেট

817737

কলসি ভর্তি সোনার আশায় শেষ ২০ লাখ টাকা

ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী কোনো বক্তব্য না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।