সৌন্দর্যের রানি সাজেক ভ্যালি

খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালির ভ্রমণ নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ইভেন্টের ব্যানারে লাল টালি দেওয়া রিসোর্টের ছবিটি অনেকদিন ধরে আমাকে টানছিল। ৩৬ জনের একটি দলে পরিবারের কোনও সদস্য, বন্ধু বা সহকর্মী ছাড়াই যোগ দেওয়ার একটি ইভেন্ট দেখে যেতে মন চাইলো। ব্যাপারটা কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার মাথায় ছিল। কিন্তু ভয় ছিল একা যাওয়া ঠিক হবে কিনা। শেষ পর্যন্ত আগের দিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকার সময় কিছুটা হুট করেই জানিয়ে দিলাম যাচ্ছি।

এটাই আমার প্রথম ভ্রমণ যেখানে পরিচিত একজন মানুষও ছিল না। তবে একা গেলেও ফেরার সময় দেখলাম, ১০ জন ভালো বন্ধু পেয়েছি। বাসে যাত্রার সময়ও জানতাম না, এই তিন রাত দুই দিনের ভ্রমণের পরে জীবন কতটা বদলাতে চলেছে। তাই এই জার্নি আমার জীবনে বিশেষ হয়ে আছে।

রাত ১০টায় ফকিরাপুল থেকে ছাড়ার পরদিন খুব ভোরে বাস খাগড়াছড়ি শহরে নামিয়ে দেয় আমাদের। এখানে বলে রাখতে চাই, যেকোনও ভ্রমণে যাওয়ার আগে আয়োজক গ্রুপের ব্যাপারে একটু ভালোভাবে যাচাই করে নেবেন। তাদের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মতো ঘুরেছিলাম বলে এই জার্নি আমার জন্য আনন্দময় ছিল। তার মানে এই নয় মূল পরিকল্পনায় কোনও পরিবর্তন আনতে হয়েছিল।

সকালের নাশতার সময়ই সহযাত্রীদের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি। ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় অপেক্ষার পর বুটের ডাল, ডিম ভাজি, রুটি ও চা দিয়ে সকালের নাশতা দেওয়া হয়। এরপরেই চান্দের গাড়িতে চড়ে সাজেক ভ্যালির উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হয়।

আগেরবার বান্দরবানে ওপরের দিকে ওঠার সময় কিছু শারীরিক সমস্যা হচ্ছিল। সাময়িক ভেবে তখন অগ্রাহ্য করেছিলাম। এবারও সেই সমস্যা হওয়ায় বুঝলাম সাময়িক নয়, এটা মোশন সিকনেস। যদিও খুব সিরিয়াস নয়। ওইবার বান্দরবান যাওয়ার সময় এই সমস্যার কারণে চুপ করে থাকায় সবাই প্রথম দিকে আমাকে অসামাজিক ভেবেছিল। এবার সমস্যা শুরুর আগেই অন্যমনস্ক থাকার জন্য কানে ইয়ারফোন দিয়ে রেখেছিলাম। জানি না কে কী ভেবেছিল।

হাজাছড়া ঝরনার কাছে নিয়মিত বিরতি পেয়ে দো-মনা করে শেষ পর্যন্ত আশেপাশের সবার সঙ্গে মিলে ঝরনা দেখতে চলে গেলাম। নাফাখুম ট্রেকিংয়ের পর থেকে ট্রেক করে ঝরনা দেখার ব্যাপারটা আমার কাছে একঘেঁয়ে লাগে। প্রথম থেকে নিজেই সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করলেও ঝরনায় পৌঁছার পর আমিই নিচে ভিজতে যাওয়ার প্রস্তাব রাখলাম। এখানেই ছিল এই ভ্রমণে নতুন অভিজ্ঞতার প্রথম ধাপ। যদিও ঝরনা দেখে আহ্লাদিত হওয়ার মানুষ আমি নই, তবুও আমার বেশ ভালো লাগছিল। কোনও প্রস্তুতি ছাড়া ঝরনায় দলবেঁধে গোসল সেরে টাটকা পাহাড়ি ডাব আর আনারসের স্বাদ নিলাম। তারপর ভেজা পোশাকেই চান্দের গাড়িতে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত বাকি যাত্রাটুকু শেষ করলাম।

সাজেক ভ্যালিতে পৌঁছানোর সময় চারপাশের সৌন্দর্যে মন ভরে উঠেছিল। সেখানে আদিবাসীদের জীবনধারা একটু একটু করে চোখের সামনে ধরা পড়তে লাগলো। কোথাও কোনও একটি গাছের ছায়ায় মা তার ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোথাওবা বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে একমনে পাহাড়ি হুঁকা টানছেন এক বৃদ্ধ। এসব দেখতে দেখতে যার যার নির্ধারিত কটেজে পৌঁছে গেলাম।

ভরদুপুরে গরম অনুভূত হওয়ায় গোসল সেরে নেওয়াই জরুরি কাজ বলে মনে হলো। আগেরবার থানচি ও রেমাক্রিতে দেখা বাথরুমের কথা মনে পড়ায় ধরেই নিয়েছিলাম সাজেকেও হতাশ হতে হবে। কিন্তু টিনের তৈরি অত্যন্ত মনোরম কটেজের ভেতরে রীতিমতো কমোডওয়ালা বাথরুম দেখে অবাক হয়েছি। সেই সঙ্গে ছিল আধুনিক ট্যাংকের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। ভরদুপুরেও সেই পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। পরে জানতে পারি প্রতিটি কটেজেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে। সাজেকে তখনই আরও অনেক নতুন নতুন কটেজ তৈরি হতে দেখেছিলাম। সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এই এলাকায় ইন্টারনেট এখনও সহজলভ্য না হলেও সব জায়গায় আধুনিকতার ছোঁয়া।

দুপুরের খাবারে পাহাড়ি রান্নার স্বাদ ছিল উপভোগ্য। খেয়ে একটু বিশ্রামের পর রুইলুই পাড়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলাম। এখানে বসবাসরত কয়েক ঘরের অধিবাসীরা বাংলাদেশে লুসাই উপজাতির সবশেষ সদস্য। উপজাতিদের রাজপরিবারের সদস্য একজন ভদ্রমহিলা আমাদের দলটিকে তার পরিবারের তথা লুসাই গোষ্ঠীর বসতির পুরো ব্যবস্থাপনা ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছেন। রাজার ঘর থেকে শুরু করে পুরো রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কীভাবে কোন ধরনের বাড়িতে বসবাস করতেন, সেসব আমাদের দেখানো ও বুঝানো হলো। কেউ চাইলে এই স্থানে উপজাতিদের পোশাক পরে ছবি তুলতে পারেন। আমরা সবাই এখানে ইচ্ছেমতো ছবিও তুলে নিলাম।

সেখান থেকে সেনাবাহিনী পরিচালিত হেলিপ্যাড ও এর আশেপাশের এলাকায় ঘুরে দেখতে গেলাম। এখানেই আমার কাঙ্ক্ষিত লাল টালির ছাদওয়ালা রিসোর্টের দেখা পেলাম। এটিও সেনাবাহিনীর অধীনস্থ। কিন্তু আমার কাছে সাজেক ভ্যালির উপজাতীয় কটেজের ঢঙে তৈরি কটেজগুলোই বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। এই হেলিপ্যাড থেকে ভারতের সীমান্তে অবস্থিত পাহাড়ের অনন্য সৌন্দর্য এককথায় নয়নাভিরাম। ক্যামেরায় ধারণ করে তা বোঝানো সম্ভব নয়। এ যেন চক্ষু মেলিয়া দেখার সৌন্দর্য! যতই দেখি না কেন মন ভরার নয়।

সাজেক থেকেই আমাদের ১১ জনের দলটির বন্ধুত্বের শুরু। সন্ধ্যায় ভ্যালিতে হালকা বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টিভেজা পাহাড়ে সবাই একসঙ্গে লুচি, চা আর বার-বি-কিউ করা মুরগি দিয়ে পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় সন্ধ্যার নাশতা সেরে নিই। বার-বি-কিউ এখানে সবসময় আগে থেকে অর্ডার করে রাখা জরুরি নয়। এখানকার বার-বি-কিউতে এক ধরনের আলাদা ঝাঁঝ আপনাকে বুঝিয়ে দেয় এটি পাহাড়ি খাদ্য। তবে পাহাড়ি চায়ে চুমুক দেওয়ার অভিজ্ঞতা বরাবরের মতো হতাশাজনক ছিল।

একটি আধুনিক ক্যাফেতে বসে ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে চলতে থাকে আমাদের রাতের আড্ডা। আড্ডার পরে নৈশভোজে ছিল প্রসিদ্ধ বাঁশের ভেতর রান্না করা মুরুগির মাংস। পাকা আমের সঙ্গে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী ব্যাম্বু রাইস খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পাকা আমের অভাবে তা আর হয়ে ওঠেনি।

পরদিন ভোর ৫টার পরিকল্পনায় ছিল কংলাক পাড়া ভ্রমণ। কিন্তু আমি ও আমার রুমমেট সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সারারাত গল্প করেছি। এখানে দিনের বেলা যেমন সাংঘাতিক গরম রেগেছে, একইভাবে রাতে ছিল কনকনে শীত। ফ্যান বন্ধ রেখেও গল্পের সময় লেপ গায়ে জড়িয়ে রাখতে হয়েছিল আমাদের। ভোরে আমরা বেরিয়ে পড়ি চা-নাশতার খোঁজে। সকালের চায়ের পর আরেক দফা হেলিপ্যাডে মনভরে ছবি তুলে সবাই একসঙ্গে খিচুড়ি দিয়ে নাশতা সেরেছি।

দুপুরের খাবারের পর আমাদের পরিকল্পনায় ছিল সাজেক ভ্যালি থেকে বেরিয়ে খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, রিসাং ঝরনা ও তারেং ঘুরে দেখবো। আলুটিলা গুহা আমার জন্য রীতিমতো একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ ক্লস্ট্রোফোবিক অর্থাৎ বদ্ধস্থানে দমবন্ধ হওয়ার আতঙ্কে থাকি। আমার দশা দেখেই কিনা জানি না ৭-৮ বছরের একটি ছোট্ট পাহাড়ি ছেলে এসে সাহস দিলো। তার সঙ্গে নাকি যারা গুহার ভেতরে গেছে তারা সবাই কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই এটি পাড়ি দিয়েছে। এই কথা শুনে নিজের আত্মবিশ্বাসের চেয়েও তার আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা আমার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত সফলভাবেই গুহা পাড়ি দিতে পেরেছি।

সাজেক ভ্যালিতে লেখকবৃষ্টির কারণে রিসাং ঝরনার পরিকল্পনা বাতিল করে আমরা চলে যাই তারেং। পুরো জার্নিতে একমাত্র এই জায়গায় আমরা মেঘের কবলে পড়েছি। চারদিক থেকে মেঘ যেন আমাদের ঘিরে ফেললো। বোনাস হিসেবে ছিল জোড়া রঙধনু। সাজেক ভ্যালিতে মনভরে মেঘ দেখতে না পারার অতৃপ্তি এখানে সুদে-আসলে উসুল হয়ে গেলো।

আমার অ্যাডভেঞ্চারের পরবর্তী পর্বে ছিল খাগড়াছড়ির একটি পার্কের ঝুলন্ত সিঁড়ি পারাপার। প্রথম দেখায় ব্যাপারটা বেশ সহজ মনে হলেও সিঁড়িতে সামান্য অগ্রসর হওয়ার পরেই আসল মজাটা টের পাওয়া যায়। তবে জীবনে এমন অভিজ্ঞতা একবার হলেও প্রয়োজন। রাতে বেশকিছু পাহাড়ি ও আধুনিক খাবারের স্বাদ নিয়ে শুরু হয় আমাদের ঢাকায় ফেরার যাত্রা। চলতি পথের পুরোটাই ছিল নতুন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ফুর্তিতে ভরপুর।

জেনে নিন
এই ট্যুরে ব্যক্তিগত খরচসহ মোট গুনতে হয়েছিল ৬ হাজার টাকার মতো। যেকোনও উপজাতির ছবি তোলার আগে অবশ্যই অনুমতি নেবেন। পছন্দ অনুযায়ী কটেজে থাকতে চাইলে আগে থেকেই আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভালো।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত