ফেসবুকের কল্যাণে ১৭ বছর পর বাবা-মায়ের খুঁজে পেল তানিয়া

প্রকাশিত: জানু ১০, ২০২১ / ১১:৩৪অপরাহ্ণ
ফেসবুকের কল্যাণে ১৭ বছর পর বাবা-মায়ের খুঁজে পেল তানিয়া

তানিয়া বয়স আট বছর। বাবার সঙ্গে ঢাকা দেখতে এসেছে। ফুফুর বাসা থেকে এক দিন বে’ড়ি’য়ে যায়। বাড়ি খোঁ’জে না পে’য়ে ছু’টে যায় ফুফাতো বোনের স্কুলে। কিন্তু স্কুলের দারোয়ান স্কুলে ঢু’কতে দে’য়নি। এরপর ব’দলে যায় তানিয়ার জী’বন কা’হিনী।

এক দিনের জন্য তানিয়ার ঠাঁ’ই হয় এক পরিবারে। পরের দিন আরেকটি পরিবার ঠাঁ’ই দিয়ে তানিয়াকে মেয়ে হিসেবেই বড় করে তো’লে। বিয়ে দেয়। তানিয়ার কোল জুড়ে আছে দুই সন্তান। তবে বাবা-মাকে হা’রা’নো’র বে’দ’না এখনো ক’ষ্ট দিয়ে বে’ড়ায়। কথা হলেই এ নিয়ে গল্প জুড়ে দেয় স্বামীসহ অন্যদের সঙ্গে।

কথা প্রসঙ্গেই স্বামী আনোয়ার হোসেন ও তাঁর এক বন্ধু তানিয়ার হা’রি’য়ে যা’ওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এ চোখ ওই চোখ হয়ে ন’জরে আসে শত মাইল দূরে থাকা বাবা-মায়ের। ১৭ বছর পর তানিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় বাবা-মায়ের। এ যেন নতুন জীবন শুরু। স্বামী সন্তান নিয়ে তানিয়া যাচ্ছে বাবার বাড়ি।

এটি সিনেমার কোনো গল্প নয়। গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া পশ্চিমপাড়ার তানিয়া আক্তারের বাস্তব জীবনের গল্প এটি। রবিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে স্বামী সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে যাচ্ছেন তানিয়া।

তানিয়াসহ পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার একটি বাস কাউন্টারে কর্মরত মো. সুন্দর আলী ২০০৪ সালে তাঁর সাত বছর বয়সি মেয়ে তানিয়ার আব’দার মেটাতে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকার আগারগাঁও এ সুন্দর আলীর বোনের বাড়িতে ছিলেন তারা। সবার অজান্তে তানিয়া এক দিন বাসা থেকে বে’র হয়ে যায়। বাসা চি’নতে না পেরে তানিয়া ছুটে যায় ফুফাতো বোনের স্কুলে। সেখানকার দারোয়ান তাকে ঢু’কতে দে’য়নি। রাস্তা-ঘাট না চে’নায় এক পর্যায়ে একটি বাসে করে সংসদ ভবনের কাছে আসে তানিয়া। সেখানে একটি দোকানে টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাত হয়ে যায়। তখন বাসায় যেতে তানিয়া অনেক কা’ন্না’কা’টি করে। কিন্তু ঠিকানা ব’লতে না পা’রায় এক হিন্দু লোক তাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। পর দিন তানিয়াকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সে অনেক জা’য়গায় খোঁ’জা’খুঁ’জি করেন।

তানিয়া বলেন, ‘এক পর্যায়ে কলাবাগান এলাকায় আরজুদা খাতুন মিলন ও তার ছেলে রিপনের সঙ্গে দেখা হলে তারা বিষয়টি জেনে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর থেকে ওই বাড়িতে আমি বড় হতে থাকি। রিপনকে আমি বাবা বলে ডাকি। খুব আদর যত্ন তারা করতেন। ওই পরিবার থেকেই আমার বিয়ে হয়।’ তানিয়া জানায়, রিপনের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার রায়তলা গ্রামে।

তানিয়ার স্বামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর এলাকার শান্তিনগরের আনোয়ার হোসেন জানান, রিপন নামে ওই ব্যক্তি তাঁর পূর্ব পরিচিত। সব কিছু জেনে শুনেই তিনি তানিয়াকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে এখন এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তানিয়া প্রায়ই বাবা-মাকে হা’রা’নো’র কথা বলতেন। এ অবস্থায় তিনি ও এক বন্ধু তানিয়ার ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। সেই সূত্র ধরেই বিষয়টি জানতে পেরে তানিয়ার বাবা-মা শনিবার রাতে আখাউড়ায় ছুটে আসেন।

১৭ বছর পর নিজেদের তানিয়ার সঙ্গে বাবা-মায়ের দেখা হলে এক আবে’গ’ঘ’ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আনন্দে কা’ন্না’য় ভে’ঙে প’ড়েন তারা। জ’ড়ো হন এলাকার লোকজন। দিনভর অতীত স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন পরিবারের লোকজন।

তানিয়ার ছোট বোন সোনিয়া খানম বলেন, ‘বোনের ছোট বেলার অনেক স্মৃতি মনে আছে। বোনকে হা’রা’নো’র পর সব সময় মন খা’রা’প থা’কত। ভাবতাম বোনকে বু’ঝি ক’খনো পা’ব না। তবে আম্মা প্রায়ই বলতেন এই দেশটা ছোট। এক দিন না এক দিন আমি আমার মেয়েকে ঠিকই ফি’রে পা’ব। বোনকে পেয়ে আমরা খুশি।’

তানিয়ার বাবা সুন্দর আলী রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বলেন, ‘প্রতিবেশি রুমা নামে একজন ফেসবুকে তানিয়ার বিষয় নিয়ে লেখালেখির কথা আমাদেরকে জানায়। এরই সূত্র ধরে ঠিকানা বের করে মেয়ের বাড়িতে আসি। এখন মেয়ে ও তাঁর স্বামী সন্তান নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি। এভাবে মেয়েকে খোঁ’জে পা’বো কখনো ভা’বি’নি।’ তিনি এ জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন