২০২০ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আলোচিত যত ঘটনা

প্রকাশিত: ডিসে ৩১, ২০২০ / ০৯:২৮অপরাহ্ণ
২০২০ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আলোচিত যত ঘটনা

২০২০ সালটা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার। পুরো বছরটিতে টাইগারদের জন্য ঠাসা সূচি। করোনা কারণে সব কিছুই ভেস্তে গেছে। তাই বছরটি ছিল টাইগারদের জন্য হতাশারই। ব্যস্ত সূচির জন্য অধীর আগ্রহে ছিল টাইগাররা।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর ভয়াবহতায় এ বছর মাত্র দুটি টেস্ট খেলতে পারে বাংলাদেশ। তারপরও তাদের উথান-পতনের মধ্যে দিয়ে বছরটি পার করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল । করোনা মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ জয় ছিল দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অর্জন।

সুযোগ মিস করার বছর

বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি ব্যস্ততম বছর হওয়ার কথা ছিল। কমপক্ষে দশটি টেস্ট ম্যাচ এবং বেশ কিছু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার কথা ছিল। তাই টাইগাররা হতাশ, কারণ তারা সাধারণত বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলার যথেষ্ট সুযোগ পায় না। কেননা বিশ্ব ক্রিকেটে বড়-বড় দল বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে আগ্রহী থাকে না।

করোনার কারণে বাংলাদেশের আটটি টেস্ট স্থগিত হয়। তিনটি করে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এবং দেশের মাটিতে দুটি করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং সাথে বেশ কয়েকটি ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিও। এ বছর বাংলাদেশ দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে। এরমধ্যে একটি টি-টোয়েন্টি পরিত্যক্ত হয়।

শুধুমাত্র জাতীয় দলই নয়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রস্তুতির জন্য বেশ কয়েকটি দেশে সফর এবং বেশ কয়েকটি দেশকে দেশের মাটিতে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়াতে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

মহামারীর কারণে তাদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাবাদ দিতে বাধ্য করে। তবে বেশ কিছুদিন পর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল এবং বিসিবি স্থগিত সিরিজগুলো পুনরায় আয়োজন করতে অন্যান্য বোর্ডের সাথে যোগাযোগ রাখে।

মহামারীর কারণে বাংলাদেশ ‘এ’ দল ও নারী দলেরও বেশ কিছু সিরিজ স্থগিত হয়েছে। দেশের জনপ্রিয় ঘরোয়া আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) প্রথম রাউন্ডের পর পরিত্যক্ত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যকার টি-টোয়েন্টি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল বিসিবি। কিন্তু সেটিও করোনার কারণে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেল

এ বছর তিন ফরম্যাটে ১০টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও দুটি টি-টোয়েন্টি। এরমধ্যে একটি টেস্টে পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ও ৪৪ রানে হেরেছে তারা। টানা চার ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারের লজ্জা পায় টাইগাররা।

তবে ঘুড়ে দাঁড়াতে সময় নেয়নি বাংলাদেশ। মুশফিকুর রহিমের তৃতীয় ডাবল-সেঞ্চুরিতে সিলেটের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ও ১০৬ রানে সিরিজের একমাত্র ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ। সেটি ছিল দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে জয়। আর ১১৯ ম্যাচে ১৪তম টেস্ট জয়।

এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজের টানা চতুর্থবারের মত জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। তিন ম্যাচের ঐ সিরিজে বাংলাদেশের জয়ের চিত্র ছিল যথাক্রমে ১৬৯, ৪ ও ১২৩ রানে।

প্রথম ওয়ানডেতে ১৬৯ রানের জয় বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে রান ব্যবধানে বড় জয় ছিল। ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টি সিরিজেও জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দুটি ম্যাচ যথাক্রমে ৪৮ রান ও ৯ উইকেটে জিতে তারা।

তার আগে পাকিস্তানের মাটিতে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়, ফলে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা থেকে রক্ষা পায় টাইগাররা।

পাকিস্তান সফরের সম্মতি

অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ বছরের শুরুতে পাকিস্তান সফরে যায় বাংলাদেশ। ১২ বছর পর পাকিস্তান সফরের আগে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা দল।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে যে ধরনের নিরাপত্তা দেয়া হয়, তা কেবল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী পেয়ে থাকেন। সিরিজের জন্য সফরটি তিন ধাপে ভাগ হয়েছিল। প্রথম ধাপে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। যেটিতে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে হারে।

জানুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে ফেব্রুয়ারিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের জন্য সফর করে বাংলাদেশ। লংগার ভার্সনের সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ।

প্রথম টেস্টটি ইনিংস ও ৪৪ রানে হারে বাংলাদেশ। পাকিস্তান সফরের তৃতীয় ও শেষ ধাপে বাকী একটি করে টেস্ট ও ওয়ানডে খেলতে যাওয়ার কথা ছিল টাইগারদের। কিন্তু করোনা কারণে থমকে যায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন।

প্রথমবারের মতো আইসিসি ট্রফি জয়

এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জনের স্বাদ নেয় বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা আইসিসি বিশ্বকাপ জয় করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের ফাইনালে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশ ৩ উইকেটে হারায় ভারতকে। ফলে প্রথমবারের মত আইসিসির কোনো ট্রফি জিততে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ৪৭.২ ওভারে ১৭৭ রানে অলআউট হয় ভারত। এরপর বৃষ্টির কারণে জয়ের জন্য ৪৬ ওভারে ১৭০ রানের টার্গেট পায় বাংলাদেশের যুবারা। জবাব দিতে নেমে ১০২ রানে ৬ উইকেট হারায় তারা। তবে অধিনায়ক আকবর আলির অধিনায়কোচিত ইনিংসের সুবাদে ৩ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। অপরাজিত ৪৩ রান করেন আকবর। ৭৭ বলে ৪টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন আকবর।

প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে বাংলাদেশের যুবারা। চার বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে অবিস্মরণীয় জয় তুলে নেয় আকবরের দল। এই দলটিই এর আগে, ইংল্যান্ড ও এশিয়া কাপে দুটি ত্রিদেশীয় ফাইনালে তাদেরকে হারিয়েছিল। তবে যেদিন শিরোপা জয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেদিনই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ট্রফি জিতে নেয় বাংলাদেশ। ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরার পর আকবর-হৃদয়দের বীরের মত সংবর্ধনা দেয়া হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদের বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত হিসেবে অভিহিত করে বিসিবি। ইতোমধ্যে আকবরসহ বেশ কিছু ক্রিকেটার ঘরোয়া আসরে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের জায়গা পূরণ করার মত পারফরমেন্স করেন।

তামিমের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি

বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন জাতীয় দলের ওপেনার তামিম ইকবাল। এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে ইসলামী ব্যাংক ইস্ট জোনের হয়ে তিনি খেলতে নামেন। ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোনের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৩৪ রান করেন দেশসেরা ওপেনার। দেশে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এটিই কোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। এর আগে রকিবুল হাসান ৩১৩ রান করেছিলেন। ২০০৭ সালে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) সিলেট বিভাগের বিপক্ষে বরিশাল বিভাগের হয়ে ঐ স্কোর করেছিলেন রকিবুল।

৪২৬ বলে ৩৩৪ রান করেছিলেন তামিম। তার ম্যারাথন ইনিংসে ৪২টি চার ও তিনটি ছক্কা ছিল। তামিমের ৩৩৪ রানে পৌঁছানোর পর ইনিংস ঘোষনা করে ইস্ট জোন। এটি, ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। তামিমের এই ট্রিপল সেঞ্চুরিতে, ১৩ বছর এমন কীর্তি দেখলো বাংলাদেশ। অবশ্য ২০১৮ সালে ট্রিপল সেঞ্চুরির কাছে গিয়েও তা করতে ব্যর্থ হন নাসির হোসেন। ট্রিপল সেঞ্চুরি থেকে ৫ রান দূরে থাকতে আউট হন তিনি।

বিসিএলের শ্রেষ্ঠত্বে মুকুট সাউথ জোনের

করোনার সংক্রমণ বাড়ার আগে শেষ হয়েছিল দেশের প্রধান প্রথম শ্রেণীর টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল)। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টুর্নামেন্টের অষ্টম আসর ছিল সেটি। দেশের সেরা ক্রিকেটারদের নিয়ে চারটি জোনে বিভক্ত করে বিসিবি। পাঁচ দিনের ফাইনাল ম্যাচে ইসলামি ব্যাংক ইস্ট জোনকে ১০৫ রানে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় সাউথ জোন। তবে অন্যান্য ম্যাচগুলো চারদিনের ছিল। অষ্টম আসরের মধ্যে সাউথ জোনের এটি পঞ্চম শিরোপা। তারাই সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয় করেছে।

মাশরাফির অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতি

ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি বিন মুর্তজার সড়ে দাড়ানোয় এ বছরটি মনে রাখতে হবে। তবে তিনি ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি। মাশরাফি বলেছিলেন, টিম ম্যানেজমেন্ট যদি তাকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা করে তবে সাধারন ক্রিকেটার হিসেবে খেলে যাবেন। লাখ-লাখ ভক্তের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়া মাশরাফি ৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান । অধিনায়ক হিসেবে তার শেষ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচের পর তিনি নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন। মাশরাফির শেষ অধিনায়কত্বের ম্যাচে ১২৩ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। যা ছিল অধিনায়ক হিসেবে ওয়ানডেতে মাশরাফির ৫০তম জয়।

তার আগে, মাশরাফি বলেছিলেন, অবসর নেয়ার সিদ্ধান্তটি তার উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যদি তাকে অধিনায়ত্বও ছাড়তে বলে তবে তিনি সেটিও করবেন। তবে নিজ থেকেই অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন মাশরাফি। কিন্তু বিসিবির সাথে কয়েক মাস মাশরাফির চলে শীতল সম্পর্ক। তবে দেশের সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণামূলক অধিনায়ক হিসেবে বিবেচিত মাশরাফি বলেন, ২০২৩ বিশ্বকাপের জন্য দল গঠনের জন্য নতুন অধিনায়ককে সময় দেয়া উচিত বলেই এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ছেন।

লিটন দাসের দুর্দান্ত একটা বছর

এ বছর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেছেন ওপেনার লিটন দাস। গত মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয়টিতে ১৪৩ বলে ১৬টি চার ও ৮টি ছক্কায় তিনি ১৭৬ রান করেন। ওপেনিংয়ে তার সঙ্গী তামিম ইকবাল আগের ম্যাচে ১৫৮ রান করেছিলেন। তার কাছ থেকে পরের ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি দখলে নেন লিটন। ওই ম্যাচে তামিমও ১২৮ রান করেন।

লিটনের সাথে ওপেনিং জুটিতে ২৯২ রান যোগ করেন লিটন। যা যেকোন উইকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটি ছিল। ফলে ভেঙ্গে যায় সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সর্বোচ্চ রানের জুটি। ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে ২২৪ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে অবিস্মরণীয় এক জয়ের স্বাদ দেন সাকিব-মাহমুদউল্লাহ।

জুটিতে রেকর্ড গড়া ৪৩ ওভারের ম্যাচে ৩ উইকেটে ৩২২ রান করেছিল বাংলাদেশ। বৃষ্টির কারণে ২ ঘন্টা ৩৮ মিনিট খেলা বন্ধ ছিল।এই জুটিতে ২১ বছরের পুরনো রেকর্ডও ভাঙ্গেন তামিম-লিটন। ১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৪ রান করেছিলেন শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ ও মেহরাব হোসেন অপি।

রাজশাহীর বিপিএল চ্যাম্পিয়ন

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সপ্তম আসরটি (২০১৯) বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু বিপিএল’ নামে নামকরন করা হয়। বিপিএলের বিশেষ আসরটিতে পুরনো কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিল না। বিসিবির সাতজন ডিরেক্টর সাতটি দলের দায়িত্বে ছিলেন। আসরটি এ বছরের ১৭ জানুয়ারি শেষ হয়। ক্রিস গেইল, হাশিম আমলা, ডেভিড মালান, কেসরিক উইলিয়ামস ও শেন ওয়াটসনের মত তারকারা আসরে অংশ নিয়েছিলেন। বিপিএলের বিশেষ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজশাহী রয়্যালস। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রাজশাহী ২১ রানে হারায় খুলনা টাইগার্সকে।

করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ক্রিকেটাররা

করোনা শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্থ করেনি, ক্রিকেটারদেরও সমস্যায় ফেলেছে। ঘরোয়া ক্রিকেটাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটারদের ক্ষতির পরিমানটা ছিল বেশি। কিন্তু বিভিন্ন দেশের বোর্ডের মত নিজ দেশের ক্রিকেটারদের কোন বেতন কাটেনি বিসিবি। তবে বোর্ডে আর্থিক ক্ষতিটা অনেক বেশিই।

এ বছর বাংলাদেশের ১০টি টেস্ট খেলার সূচি ছিল। কিন্তু জাতীয় দল মাত্র দুটি টেস্ট খেলতে সক্ষম হয়। বছরের শুরুতে পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। বর্তমানে টেস্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি ৬ লাখ টাকা। ফলে আটটি টেস্ট পরিত্যক্ত হওয়াতে নিয়মিত ম্যাচ খেলা মুমিনুল হক, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও অন্যান্যরা একেকজন ৪৮ লাখ টাকা পাননি।

ওয়ানডে ফরম্যাটের দিকে তাকালে দেখা যায়, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ ছিল। ওয়ানডে ম্যাচের ফি ৪ লাখ করে এবং প্রত্যক ক্রিকেটার ১২ লাখ টাকা করে পাননি। আয়ারল্যান্ড সফরে বাংলাদেশের চারটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে যদি ধরা হয় প্রত্যক ক্রিকেটারের প্রত্যক ম্যাচের ফি ২ লাখ করে হয়, তবে ৮ লাখ টাকা তারা পাননি।

করোনার মাঝে মানবতার সেবায় ক্রিকেটাররা

করোনা বিশ্বকে থমকে দিলেও ঘরে বসে থাকেননি ক্রিকেটাররা। বিসিবির দেয়া গাইডলাইনে অনুশীলন করে গেছেন। পাশাপাশি অসহায়-দুস্থদের সহায়তায়ও এগিয়ে এসেছিলেন। জাতীয় ক্রিকেটার, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটার, নারী ক্রিকেটার ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা তাদের বেতন থেকে অর্থ প্রদান করে তহবিল গঠন করেন। কিছু ক্রিকেটার, যেমন মাশরাফি বিন মুর্তজা, এমপি, নাজমুল ইসলাম অপু করোনায় আক্রান্ত হন। তারা অসহায়-দুস্থদের সহায়তায় সোচ্চার ছিলেন।

একের পর এক বিতর্কে সাকিব আল হাসান

ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকভিজের সাথে উইজডেন ম্যাগাজিন যৌথভাবে ওয়ানডেতে সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিকেটার ও টেস্টের ষষ্ঠ সেরা ক্রিকেটার হিসেবে সাকিবকে বেছে নেন। আইসিসির এক দশকে সেরা ওয়ানডে একাদশেও তার নাম আছে। তবে এ বছরের অধিকাংশ সময়ই আইসিসির কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলেন সাকিব। তবে করোনা তার জন্য আশীর্বাদ হয়েই এসেছিল। এজন্য অনেকগুলো ম্যাচ মিস করতে হয়নি। গত ২৮ অক্টোবর তার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। ফলে তার ক্রিকেটে ফিরতে আর কোনো বাধা ছিল না। এতে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে জেমকন খুলনার হয়ে মাঠে নামেন সাকিব। বছরের শেষ দিকে একটি পূজা উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সাকিবকে ভার্চুয়া আক্রমণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সাকিবকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে।

ভবিষ্যতের তারকা আকবর

আগামী দশকে আধিপত্য বিস্তার করা ২০জন ক্রিকেটারের মধ্যে জায়গা করে নেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলী। ইএসক্রিকইনফোর মাসিক ম্যাগাজিন বিশ্বব্যাপী ১৫ জন কোচ, স্কাউটস, বিশ্লেষক, ক্রিকেটার এবং পর্যবেক্ষককে জিজ্ঞাসা করে এই তালিকা তৈরি করে। উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান আকবর আলি বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ে বড় অবদান রাখেন। অনবদ্য ৪৩ রান করেন তিনি। ফাইনালে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ।
টম মুডি, মাইক হেসন, দিপ দাশগুপ্ত, এইচডি অ্যাকারম্যান, ইয়ান বিশপ, এআর শ্রীকান্ত, টিম উইগমোর, রাসেল আরনল্ড, পরস মহামব্রে, হাসান চিমা, শ্রীনাথ বশিয়াম, তামিম ইকবাল, অ্যান্ডি মোলস, জারোড কিম্বার এবং রবিন পিটারসনরা ভবিষ্যতের সেরা ২০জন ক্রিকেটারকে বাছাই করেন।

নারী ক্রিকেটারদের জন্য হতাশার বছর

করোনার কারণে দেশের ক্রিকেট থমকে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য পেয়েছিল পুরুষ দল। তবে নারীদের দলের জন্য বছরটি হতাশার ছিল। এ বছর তারা কেবল মাত্র চারটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে পারে। নারীদের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ঐ চার ম্যাচে কোন জয়ের স্বাদ পায়নি বাংলাদেশ। ভারতের কাছে ১৮ রানে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৮৬ রানে ও নিউজিল্যান্ডের কাছে ১৭ রানে ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে ৯ উইকেটে হারে নারী দল। পুরো আসরে ব্যাট হাতে বাজে পারফরমেন্স ছিল নারী দলের ক্রিকেটারদের। কোন ব্যাটসম্যানই হাফ-সেঞ্চুরি করতে পারেননি।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট’স কাপ ও বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ :

করোনার মধ্যে সাহসিকতার সাথে দুটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে বিসিবি। ক্রিকেটকে মাঠে ফেরাতে টুর্নামেন্ট দুটি বিসিবির বড় উদ্যোগের অংশ। এই দুটি টুর্নামেন্ট জুড়ে ক্রিকেটার, কর্মকর্তা এবং অন্যান্য স্টোকহোল্ডারদের জৈব-সুরক্ষা পরিবেশে রাখা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা হিসেবে জৈব-সুরক্ষা পরিবেশ কীভাবে কাজ করে সেটি দেখাই প্রধান লক্ষ্য ছিল বিসিবির।

কোনো সমস্যা ছাড়াই পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করে বিসিবি। বিসিবি প্রেসিডেন্ট’স কাপে ৫০ ওভারের টুর্নামেন্টে তিনটি দল মাহমুদউল্লাহ একাদশ, তামিম একাদশ ও নাজমুল একাদশ অংশ নেয়। তিনটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, তামিম ইকবাল ও নাজমুল হোসেন শান্ত। মাহমুদউল্লাহ একাদশকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদউল্লাহ। তার অধীনে চ্যাম্পিয়ন হয় মাহমুদউল্লাহ একাদশ। ফাইনালে নাজমুল একাদশকে ৭ উইকেটে হারায় তারা।

বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচটি জেলার নামে পাঁচটি দল স্পন্সর করে দেশের নামীদামি কোম্পানী। জেমকন খুলনাকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদউল্লাহ। তার নেতৃত্বে এই ফরম্যাটেও শিরোপা জিতে খুলনা। ফাইনালে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে ৫ রানে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় খুলনা। দুটি টুর্নামেন্টেই বড় অংকের প্রাইজমানি দেয়া হয়েছিল।

মাহমুদউল্লাহর ডাবল শিরোপা

ঘরোয়া আসরে অধিনায়ক হিসেবে টানা দুটি শিরোপার স্বাদ পান মাহমুদউল্লাহ। বিসিবি প্রেসিডেন্ট’স কাপ ও বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় তার দল। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে মাহমুদউল্লাহর দল জেমকন খুলনা ৫ রানে হারায় গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে। সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদউল্লাহ। ৪৮ বলে অপরাজিত ৭০ রান করেন তিনি।

গত অক্টোবরে তিনটি দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত বিসিবি প্রেসিডেন্ট’স কাপের মাহমুদউল্লাহ নেতৃত্বে দল চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই তার অধীনে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির শিরোপা জিতে দল। এতে তার অধিনায়কত্ব প্রশংসিত হয় ক্রিকেট মহলে। করোনার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর দেশে ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে দুটি টুর্নামেন্টই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিকল্পনার বড় অংশ ছিল।

বর্ষসেরা ক্রিকেটার

এ বছর যে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ, তাতে বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচন করা কিছুটা কঠিনই। যাই হোক, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেন লিটন। তিন ম্যাচের সিরিজে ১৫৫.৫০ গড়ে তার সংগ্রহ ৩১১ রান। যা এ বছর বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও লিটনের চেয়ে বড় স্কোর এ বছর আর কেউ করেনি।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে ১৫৫ গড়ে ৩১০ রান করেন তামিম ইকবাল। তাই রানের দিক দিয়ে লিটনের খুব কাছেই ছিলেন তিনি। তবে তামিমকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ রান লিটনের। সেই সাথে এ বছর বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানও করেন লিটন। টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০৩ রানের ইনিংস খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটা ছিল তার তৃতীয় ডাবল-সেঞ্চুরি। কিন্তু লিটনের ইনিংসটিও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন