ব্যবসায়ী থেকে হোয়াইট হাউজের কর্ণধার

প্রকাশিত: নভে ১১, ২০২০ / ০১:১৮অপরাহ্ণ
ব্যবসায়ী থেকে হোয়াইট হাউজের কর্ণধার

দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯তম নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু ৪৬ তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। আবাসন ব্যবসা থেকে শো উপস্থাপক, হোটেল থেকে গলফ ব্যবসা সবই করেছেন জীবনে।

নিজ গুণে টিভি তারকা থেকে ২০১৬-তে পৌঁছে যান হোয়াইট হাউজেও। হয়ে যান সবচেয়ে বিতর্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্টও। তিনি আর কেউ নন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যান বর্ষীয়ান ডেমোক্রেট জো বাইডেনের কাছে।

যদিও এখন পর্যন্ত তিনি নিজেকে পরাজিত মানতে অস্বীকার করছেন। এমনকি নির্বাচন নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এবং এখন পর্যন্ত কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনের ভোট গণনা বন্ধে মামলাও করেছেন। তবে তার এসব কর্মকাণ্ডে তার দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থন পাচ্ছেন না।

২০১৬ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে ট্রাম্প ছিলেন ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। নিউইয়র্কের কুইন্সে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন জন্ম।

বাবা ছিলেন প্রতিপত্তিশালী আবাসন ব্যবসায়ী ফ্রেডরিক ক্রাইস্ট ট্রাম্প। আর মা স্কটিশ বংশোদ্ভূত ম্যারি অ্যান ম্যাকলিউড ট্রাম্প। ট্রাম্পের দাদা ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন। মার সূত্রে ট্রাম্প হাফ স্কটিশ, আর বাবার সূত্রে হাফ মার্কিনি।

ট্রাম্প নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমিতে স্কুলজীবন শেষে প্রথমে ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। দুবছর পর সেখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির হোয়ার্টন স্কুল অব ফিন্যান্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

পারিবারিক জীবনের ট্রাম্প তিন বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী ইভানা ট্রাম্প (১৯৭৭-১৯৯২)। ইভানার ঘরে ট্রাম্পের তিন সন্তান ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, ইভানকা ট্রাম্প ও এরিক রয়েছেন। ইভানার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর ১৯৯২ সালে বিয়ে করেন মারলা ম্যাপলসকে (১৯৯৩-১৯৯৯)। মারলার ঘরে রয়েছে এক সন্তান টিফানি। বিচ্ছেদের প্রাক চুক্তি হিসেবে ট্রাম্প তাকে ২ মিলিয়ন ডলার দেন। ২০০৫ সালে ট্রাম্প তার চেয়ে প্রায় ২৩ বছরের ছোট স্লোভেনীয় বংশোদ্ভূত মেলানিয়াকে বিয়ে করেন। তাদের বিয়ের সেই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন অতিথি ছিলেন।

রাজনীতিতে আসার আগে আবাসন ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি ছিল ট্রাম্পের। তবে কয়েকবার রাজনৈতিক অবস্থান বদল করেছেন তিনি। ১৯৮৭ সালে তিনি নিবন্ধিত রিপাবলিকান ছিলেন। দুই বছর পর ১৯৮৯ সালে স্বতন্ত্র হিসেবে এবং ২০০১ সালে তিনি ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিবন্ধিত হন।

তবে এর আগে ২০০০ সালে রিফর্ম পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেন। ২০০৯ সালে আবার রিপাবলিকান শিবিরে ফিরে আসেন। এর মধ্যেও ২০১১ সালে স্বতন্ত্র হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিলেন। চূড়ান্তভাবে তিনি ২০১২ সালে রিপাবলিকান দলে ফিরে আসেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিট রমনির প্রতি সমর্থন জানান।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনেকটা আকস্মিকভাবে আমেরিকার রাজনীতিতে ট্রাম্পের আবির্ভাব। রিপাবলিকান পার্টির প্রাইমারিতে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ সরে দাঁড়ালে ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের চূড়ান্ত মনোনয়নের পথ খুলে যায়।

পরে নির্বাচনে সব জনমত জরিপ ও গণমাধ্যমের হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পপুলার ভোটে তিনি হিলারি থেকে প্রায় ২৯ লাখ ভোটে পিছিয়ে থেকেও ইলেকটোরাল কলেজের জটিল হিসাব তার জন্য হোয়াইট হাউসের দরজা খুলে দেয়। এবারও ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডেমোক্রেট জো বাইডেনের কাছে হেরে গেছেন।

এত কিছু করা সত্তেও মার্কিন আইনের কড়া ব্যবস্থাপনার কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে হোয়াইট হাউজ ছাড়তেই হবে। কিন্তু দেখার বিষয়, সেটা স্বেচ্ছায় নাকি তার চিরাচরিত বিতর্কিত কোনও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। এখন তার হোয়াইট থেকে প্রস্থানের বিষয়েই মনোযোগ বিশ্ব মিডিয়ার।

তার বিতর্কিত ও ‘আজগুবি’ কর্মকাণ্ডের জন্য অনেকে তাকে একজন ভাঁড়, কমেডিয়ান হিসেবেও উল্লেখ করেন, কেউ কেউ তাকে বলেন মিথ্যাবাদী। আবার যেভাবে তিনি সহজ সরল ভঙ্গিতে সোজা সাপ্টা উচ্চারণ করেন সেটা অনেককে আকৃষ্টও করে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নিয়েও কথাবার্তা হয়। এমনকি কথা হয় তার চুলের রঙ ও স্টাইল নিয়েও। অনেকেই এই চুল আসল নাকি নকল এ নিয়েও প্রশ্ন করেন। নারী কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। অর্থ পরিশোধ না করায় পর্ণ তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসহ বেশ কয়েকজন নারী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগও করেন।

ট্রাম্প প্রথম জীবনে পিতার কাছ থেকে দশ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরে বাবার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে ব্যবসার বিপুল সম্প্রসারণ ঘটান। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে এই কোম্পানির নাম বদল করে তিনি নতুন নামকরণ করেন, ট্রাম্প অর্গানাইজেশন। তিনি বলেছিলেন, আমার পিতাই ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা।

পিতার মৃত্যুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের পারিবারিক ব্যবসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। ব্রুকলিন ও কুইন্সে আবাসিক বাড়িঘর নির্মাণ থেকে তিনি সরে আসেন নিউ ইয়র্কের কেন্দ্রে ম্যানহাটনের মতো পশ এলাকায় রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায়। নির্মাণ করেন বিখ্যাত ভবন ৬৮ তলার ঝকঝকে উজ্জ্বল ট্রাম্প টাওয়ার।

তার কোম্পানির নির্মিত অন্যান্য সুপরিচিত ভবনের মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্যালেস, ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড টাওয়ার, ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেলসহ আরো কিছু ভবন। মুম্বাই, ইস্তাম্বুল ও ফিলিপিনেও আছে ট্রাম্প টাওয়ার।

বিনোদন জগতের ব্যবসাতেও তিনি এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মিস ইউনিভার্স, মিস ইউ এস এ এবং মিস টিন ইউ এস এ সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন তিনি।

পরে ২০০৩ সালে তিনি এনবিসি টেলিভিশনে ‘দ্য অ্যাপ্রেনটিস’ নামের একটি রিয়েলিটি শো চালু করেন। এই শো এর বেশ কিছু অনুষ্ঠানের উপস্থাপকও ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শো ম্যান থেকে শোবিজেও সফল হয়েছেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি বইও লিখেছেন।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন