বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্র ছেলেটি এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

প্রকাশিত: নভে ৯, ২০২০ / ০১:৫৪অপরাহ্ণ
বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্র ছেলেটি এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

তোতলামির কারণে শৈশবেই হাসির পাত্র হয়েছেন সহপাঠী ও বন্ধুদের কাছে। ছিল ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী-কন্যাকে হারানোর ভয়াবহ ট্র্যাজেডিও। প্রথমবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে নেমে বক্তৃতা চুরির দায়ে সরে দাঁড়ানো। যদিও এসবের কোনটিই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যপূরণে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

হার না মানার অদম্য মানসিকতা আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাতেই শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের পথে হাটার দীর্ঘ পদযাত্রার শেষ প্রান্তে তিনি। দীর্ঘ আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার পর এবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নও পূরণ করলেন।

বলা হচ্ছে নতুন নির্বাচিত ৪৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা। পুরো নাম জোসেফ রবিনেট বাইডেন। ১৯৪৮ সালের ২০ নভেম্বর পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সেখানাকার স্ক্রানটন শহরের আইরিশ-ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি।

চাকরি চলে যাওয়ায় ১৯৫০ সালে তার বাবা প্রতিবেশী শহর ডেলাওয়ারে চলে যান। সেখানে বাইডেনের বাবা পুরাতন গাড়ি বিক্রি করতেন। তখন বাইডেনের বয়স মাত্র ১০ বছর। সেখানে মধ্যবিত্তের আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যেই বড় হন বাইডেন। বাবার আর্থিক কষ্টের জন্য নানা-নানীর বাসায় বেশ কয়েক বছর ছিলেন বাইডেন। পরে ডেলওয়ারের ক্লেমন্ট থেকে উইলিংমটনে এসে স্কুল, হাইস্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যান।

পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারে উচ্চশিক্ষার জন্য যান তিনি। ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রি শেষ করেন। পড়াশোনায় যে বাইডেনের মেধার জোর ছিল সেটা স্পষ্ট। প্রথম বর্ষের বসন্তের ছুটি কাটিয়ে বাহামাস থেকে ফেরার পথে পরিচিত হন সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিলিয়া হান্টারের সঙ্গে। প্রথম দর্শনেই প্রেম। আর ভালোবাসার টানেই একপর্যায়ে সব ছেড়ে পড়াশোনায় ব্যাপক মনোযোগী হয়ে পড়েন তিনি।

১৯৬৫ সালে ডেলাওয়ার থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেই বাইডেন ছুটে যান সিরাকাউস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এর মাঝে সেরে নেন বিয়ের পর্বটাও। ১৯৬৬ সালেই নিলিয়া হান্টারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন জো বাইডেন। ১৯৬৮ সালে সিরাকাউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করেন। ক্লাসে ৭৬তম হয়েছিলেন বাইডেন।

পরে শৈশব-কৈশোর কাটানো সেই ডেলাওয়ার থেকেই তার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া। তরুণ বয়সে তিনি সেখানকার প্রতিবেশী কৃষাঙ্গ এলাকায় লাইফগার্ড হিসেবে সেবা দিতেন। সেখানে পদ্ধতিগত বৈষম্যকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, যা তার রাজনীতিতে আসার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে। পরে ষাটের দশকের শেষ দিকে ডেমোক্র্যাট দলের রাজনীতির সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু জো বাইডেনের। তত দিনে আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গোছাতে শুরু করেছেন বাইডেন।

সে সময় ডেলাওয়ারের উইলমিংটনে একটি ল’ ফার্মে কাজ করেন। সেখানে কাজ করতে গিয়েই রাজনীতি নিয়ে সরব হন তিনি। রিপাবলিকান নেতার ল’ ফার্মে কাজ করলেও তিনি রিপাবলিকানদের রাজনীতির আদর্শকে সমর্থন করতেন না। সে সময়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনকে সমর্থন করতেন না বলে নিজেকে স্বতন্ত্র আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

১৯৬৯ সালে এক ডেমোক্র্যাট নেতার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে যান তিনি। এর জেরেই ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিজেকে রেজিস্টার্ড করান। শুরু হয় ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন। অল্প সময়েই রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন তিনি। পরের বছরই নিউক্যাসেল সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন বাইডেন। কাউন্সিলম্যান হওয়ার পরপরই ১৯৭১ সালে নিজের ব্যক্তিগত ল’ ফার্মও স্থাপন করেন তিনি। তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা চোখে পড়ে ডেমোক্র্যাট নেতাদের।

বাইডেনের মধ্যে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া প্রথম স্ত্রী ভবিষ্যতের মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের ছায়া হয়তো দেখেছিলেন! তা না হলে কেনইবা তিনি বাইডেনের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করবেন? স্ত্রীর কথা ধরেই হয়তো রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

বাইডেনের প্রথম স্ত্রী নেইলিয়া তাদের বিয়ের আগেই ১৯৬৪ সালে তার এক বান্ধবীকে হবু বরের প্রশংসা করতে গিয়ে বলছিলেন, ‘‘৩০ বছর বয়সের মধ্যেই সে (বাইডেন) সিনেটর হতে যাচ্ছে এবং একদিন সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিডেন্টও হবে।”

১৯৭২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে ডেলওয়ারের সিনেটর নির্বাচিত হয়ে স্ত্রীর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত করেন। মার্কিন ইতিহাসে পঞ্চম সর্বকনিষ্ঠ সিনেটর হন বাইডেন। ১৯৮৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৪০ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার প্রার্থী মনোনয়নের দৌড়ে নামার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালের ৯ জুন ওই ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে তিনি তরতর করে এগিয়েও যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিন মাসের মাথায় বক্তৃতা চুরি করার কেলেঙ্কারি স্বীকার করে তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন।

এত কিছুর পর ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছোট বেলায় তোতলানো সেই বাইডেনকেই বেছে নিলেন আমেরিকার সাধারণ মানুষ। ৫০ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই দেখা জো বাইডেনের হাতে ধরা দিল সফলতা।

তারপর ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হওয়ার মনোনয়নের দৌড়ে নেমেছিলেন বাইডেন। কিন্তু সেবার বারাক ওবামার কাছে হেরে যান। পরে তিনি ওবামার রানিংমেট হন এবং তার আমলে আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

ওবামা তার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ভাইস- প্রেসিডেন্টের তকমা দিয়েছিলেন বাইডেনকে। এবার ৭৭ বছর বয়সে এসে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।

বাইডেনই এখন হবেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক প্রসিডেন্ট। তবে বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে তিনি শারীরিকভাবে দুই মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে সক্ষম হবেন কিনা। তাছাড়া, করোনা ভাইরাস মহামারির এই সময়ে তার সামনে আছে নানা অনিশ্চয়তা এবং চ্যালেঞ্জও।

৭৭ বছরের বাইডেনের জীবনে সাফল্য যেমন এসেছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে ট্র্যাজেডিও। ১৯৭২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি ডেলাওয়ার সিনেটর নির্বাচিত হন। কিন্তু ওই বছর ডিসেম্বরে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী নেইলিয়া ও শিশুকন্যা নাওমিকে হারান। গাড়িতে থাকা তার দুই ছেলে বোও এবং হান্টার গুরুতর আহত হন।

বোওর পা ভেঙে গিয়েছিল। ছেলের হাসপাতাল কক্ষে দাঁড়িয়ে সিনেটর হিসেবে শপথ নেন বাইডেন। নিজের আত্মজীবনীতে স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যুর শোক এবং এক দুই ছেলেকে সামলাতে গিয়ে দিশেহারা বাইডেন রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে যাজক হওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন।

২০১৫ সালে আবারও সন্তানের মৃত্যুর শোক সইতে হয় বাইডেনকে। ওই বছর তার বড় ছেলে বোও মস্তিষ্কের ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। ৪৬ বছরের বোও ডেলাওয়ারের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের উঠতি রাজনীতিকদের একজন বোওর ২০১৬ সালে ডেলওয়ার অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচন করার কথা ছিল। বোও কে তার বাবার রাজনৈতিক উত্তসূরীও ভাবা হত।

বোওর মৃত্যুতে আবারও ভেঙে পড়েন বাইডেন। আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গে বাইডেন লিখেছেন, ওই বছর তিনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণার তোড়জোড় করছিলেন। কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পর তিনি সিদ্ধান্ত বদলান।

বাইডেনের দীর্ঘদিনের চিফ অব স্টাফ এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু টেড কাউফম্যান বলেন, ‘‘তার জীবনে যা ঘটেছে তাতে সারা জীবনে আমার দেখা সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ তিনি। একই সঙ্গে তিনি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে দুর্ভাগা মানুষও বটে।

‘‘তার জীবনের যে অবিশ্বাস্য উত্থান-পতন তেমন আমি আর কারও জীবনে দেখিনি। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের যে অবস্থা তাতে তিনিই যে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি তার একটি কারণ এটাও বটে। তিনি সবচেয়ে দুঃসময় থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।”

প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে ১৯৭৭ সালে জিল জেকবসকে বিয়ে করেন বাইডেন। তাদের একটি কন্যা রয়েছে, নাম অ্যাশলি। ১৯৭৫ সালে জিল জ্যাকবের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় বাইডেনের। জিল পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাইডেনকে নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক ও অভিযোগ শোনা যায় দুবার। এই দুবারই তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা শুরুর পর অভিযোগগুলো উঠতে শুরু করে। অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে প্রথমবার যখন বাইডেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন তখন তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নিল কিনকের বক্তব্য চুরির অভিযোগ ওঠে।

১৯৮৮ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় এ নিয়ে তিনি বেশ সমালোচিত হন। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণভিত্তিক বিভেদপন্থিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে সমালোচিত হন তিনি। ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে ওঠে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। এ বছর মার্চ মাসে টারা রিড অভিযোগ আনেন, ১৯৯৩ সালে জো বাইডেন তাকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন। সিনেটর থাকাকালীন বাইডেনের অফিসে সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন রিড।

১৯৯৩ সালে বিষয়টি আলোচিত হওয়ার পর নতুন করে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় উঠে আসে এই অভিযোগ। বাইডেন উড়িয়ে দিলেও আরও কয়েকজন নারী বাইডেনের বিরুদ্ধে অসঙ্গত আচরণের অভিযোগ এনেছেন। এ ছাড়া ২০১২ সালে সমকামী জুটিদের বিয়ের অধিকারের পক্ষে কথা বলে বাইডেন তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন