কে এই কমলা হ্যারিস

প্রকাশিত: নভে ৯, ২০২০ / ১১:৪৬পূর্বাহ্ণ
কে এই কমলা হ্যারিস

শেষ পর্যন্ত কমলা হ্যারিসকেই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। অতীতে মার্কিন মুলুকে কোনও কৃষ্ণাঙ্গ, কোনও দক্ষিণ এশীয়, এমনকি কোনও নারী কখনও ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে পারেনি। সেদিক থেকে ইতিহাস গড়লেন গড়লেন জ্যামাইকান বাবা ও ভারতীয় মায়ের কন্যা কমলা।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের রানিং মেট কমলা হ্যারিস দেশটির নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে সৌভাগ্য, সৌন্দর্য আর শক্তির দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক আর সংস্কৃত শব্দ ‘কমল’ বা পদ্মফুলের সমার্থক শব্দে মা শ্যামলা গোপালান মেয়ের নাম রেখেছিলেন কমলা। আর নামের সঙ্গে ‘হ্যারিস’ শব্দটি যোগ করে দিয়েছিলেন বাবা।

সেই কমলা হ্যারিসের দুর্দান্ত বাগ্মিতা, যুক্তি আর তীক্ষ্ম বুদ্ধিতেই এবারের মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও তাদের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নির্বাচনে ক্যাম্পেইনে আসে অভিনব এক গতি।

ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস শুরুতে অবশ্য বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনিও প্রেসিডেন্ট পদে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে সেই দৌড়ে বাইডেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠেননি ৫৫ বছর বয়সী কমলা। শেষ পর্যন্ত ভারতীয়-জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত এ নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবারই বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন।

চলতি বছরের আগস্টেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছিল কমলার। দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেকগুলো ‘প্রথমের’ জন্ম দেয়া এই নারী যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রথম’ নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন।

ক্যাপিটাল হিলে কমলার আনাগোনাটা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রবেশের পর থেকেই। গত ৪ বছরে ট্রাম্প-কমলার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাকযুদ্ধও কম হয়নি। একবারতো কমলাকে ‘ন্যাস্টি’ বলেই আখ্যা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। বাইডেনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ট্রাম্পকে হারিয়ে সেই মন্তব্যের জবাব দিলেন কমলা।

কমলা হ্যারিসের বাবা ডোনাল্ড হ্যারিস একজন জ্যামাইকান। মার্কসীয় ঘরানার অর্থনীতিতে দখল থাকা এ অধ্যাপক একসময় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। কমলার মা শ্যামলা গোপালান ভারতীয় এক কূটনীতিকের মেয়ে। শ্যামলা একজন ক্যান্সার গবেষক।

ডোনাল্ড হ্যারিস ও শ্যামলা গোপালানের পরিচয় হয়েছিল বার্কলেতে নাগরিক অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ করার সময়। তখনই একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। কমলা তার আত্মজীবনী ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড : অ্যান আমেরিকান জার্নি’তে বাবা-মায়ের পরিচয়, ঘনিষ্ঠতার কথা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

কমলা হ্যারিসের বাবা ডোনাল্ড হ্যারিস জ্যামাইকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেড়ে উঠেন দাদির কাছে। ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন ডোনাল্ড। সেখানেই শ্যামলার সঙ্গে দেখা, পরিচয়, প্রেম ও পরিণয় হয় তার।

ডোনাল্ড-শ্যামলা দম্পতির প্রথম সন্তান কমলা হ্যারিস ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর ওকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। কমলার নামের শেষাংশ বাবার কাছ থেকে নেয়া, প্রথম অংশ মায়ের দেয়া। ওই সময় নাগরিক আন্দোলনে ডোনাল্ড ও শ্যামলা এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, এলাকার প্রায় সব প্রতিবাদ কর্মসূচিতেই তারা ছিলের সামনের সারির মুখ। মাঝে মাঝে মেয়ে কমলাকেও স্ট্রলারে করে সেসব কর্মসূচিতে নিয়ে যেতেন তারা।

কমলার বয়স যখন ৭ বছর তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় শ্যামলার সংগ্রামী জীবন। দুই মেয়ে নিয়ে বার্কলের একটি হলুদ ডুপ্লেক্স ভবনের উপর তলায় আশ্রয় নেন শ্যামলা। মেয়েরা যেন ভারতীয় ঐতিহ্যের শেকড় ভুলে না যায় সেদিকে শুরু থেকেই মনোযোগী ছিলেন কমলার মা। মায়ের কারণেই শৈশবে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য বানানো ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও হিন্দু মন্দির দুই জায়গাতেই দুই মেয়ের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

কমলা তার আত্মজীবনীমূলক ওই গ্রন্থে লিখেছেন- ‘মা ভালো করেই বুঝেছিলেন যে, তিনি দুটি কৃষ্ণাঙ্গ কন্যাকে বড় করছেন। তিনি জানতেন, তার বেছে নেয়া দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) মায়া (কমলার ছোট বোন) ও আমাকে কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবেই দেখবে। আমরা যেন আত্মবিশ্বাসী, গর্বিত কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে বেড়ে উঠি তা নিশ্চিত করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।’

ওই গ্রন্থে কমলা বাল্যকালে ভারতে বেড়াতে যাওয়ায় তার ওপর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নানার যে যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল সেটিও উল্লেখ করেছেন। কমলার নানা বাড়ি ভারতের তামিলনাড়ুতে। তার জয় কামনা করে ভোটের সময় তামিলনাড়ুতে পূজাও হয়েছে।

কমলার মা কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শিক্ষকতার চাকরি নেন তখন কমলা ও মায়াকে কিছুদিন মন্ট্রিয়লেও থাকতে হয়।

কমলা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি পড়ার পর হেস্টিং কলেজ থেকে আইনে ডিগ্রি নেন। ১৯৯০ সালে তিনি ওকল্যান্ডে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হন তিনি। ২০১০ সালে সামন্য ব্যবধানে জয়ী হয়ে হন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনিই প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ-আমেরিকান।

২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামাকে প্রার্থী করা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ন্যাশনাল কনভেনশনে অসাধারণ বক্তৃতা দিয়ে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নজরে আসেন কমলা হ্যারিস। যদিও ওবামার সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা আরও আগে থেকেই ছিল। ২০০৪ সালে ওবামা সিনেটর হওয়ার আগে থেকেই তারা একে অপরকে চিনতেন। ২০০৮ সালে ওবামা প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলে তাকে সমর্থন দেয়া তৎকালীন সরকারি পদধারীদের তালিকায় কমলা ছিলেন অন্যতম।

কমলার জীবনে মধুর সময়টি আসে ২০১৪ সালে। ওই বছর তিনি আইনজীবী ডগলাস এমহফের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এর দু’বছর পর সিনেট নির্বাচনে সহজে জয়ী হয়ে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে পা রাখেন কমলা।

প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত, আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে দ্বিতীয় মার্কিন সিনেটর হওয়ার আগে নির্বাচনী প্রচারণায় কমলা অভিবাসন ও বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, নারীর প্রজনন অধিকার নিয়ে ব্যাপক সোচ্চার ছিলেন।

এছাড়াও সিনেটের সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্ট ও জুডিসিয়ারি কমিটির সদস্য হ্যারিস কংগ্রেসের বিভিন্ন শুনানিতে ধারালো, বুদ্ধিদীপ্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন।

২০১৭ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস এবং পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে ব্রেট কাভানহ’র শুনানিতে তার জিজ্ঞাসাবাদের ধরন দলের ভেতরে-বাইরে তুমুল প্রশংসা অর্জন করে।

কমলার আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্য ট্রুথস উই হোল্ড : অ্যান আমেরিকান জার্নি’ প্রকাশের কিছুদিন পরই ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

মনোনয়ন লড়াইয়ের শুরুর দিকে কমলাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভারমন্টের সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং ম্যাসাচুসেটসের সেনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়েছিল।

এমনকি এক বিতর্কে বাইডেনকে অতীতের নেয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও সম্প্রদায়গত বিভিন্ন ইস্যুতে নাজেহাল করে ছেড়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারী।

তখন জনমত জরিপগুলোতে কমলার অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে শুরু করে। তবে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। তার প্রচারণা শিবিরেও দেখা দেয় নানা জটিলতা। এরপর ডিসেম্বরে মনোনয়ন দৌড় থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইন ও বিচার বিভাগের মতো জায়গায় কাজ করা ক্যালিফোর্নিয়ার এ সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল ও উদারপন্থি অংশের মূল বিরোধের জায়গাগুলো এড়িয়ে সাবধানে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেটা তো হয়ইনি, উল্টো দুপক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হয় তাকে। সে কারণে ডিসেম্বরে আইওয়ার ডেমোক্র্যাট দলের প্রথম ককাসের আগেই মনোনয়ন দৌড় থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করেন কমলা হ্যারিস।

মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়ার পর চলতি বছরের মার্চে বাইডেনকে সমর্থন দিয়ে হ্যারিস বলেন, ‘বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট করতে সাধ্যের সবটাই করবো।’

গেল মে মাসে মিনিয়াপোলিসে পুলিশি হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর থেকে ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কমলার সামনে আবারও সামনে আসে। ফ্লয়েড হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়জন রাজনীতিবিদ সমাজ ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন কমলা তাদের অন্যতম ছিলেন। এরপর গেল ১১ আগস্ট কমলাকে নির্বাচনী জুটি হিসেবে বেছে নেন বাইডেন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগত দিক থেকে অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, গর্ভপাত, সবেতন ছুটি, সমকারীদের অধিকার, শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, আবাসন, কর ব্যবস্থাপনা সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে হ্যারিস ডেমোক্র্যাট মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীলদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। যদিও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে তার বার বার অবস্থান বদল ভোটারদের সাময়িক দ্বিধাগ্রস্তও করেছিল।

আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর যুদ্ধের বিরোধী কমলা ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসারও কঠোর সমালোচক। এছাড়াও তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একনিষ্ঠ সমর্থক।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারী মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে পুলিশ নীতিতে বদল আনারও দাবি তুলেছেন। কমলার বাগ্মিতা, অভিবাসী শেকড়, কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি এবং অ্যাটর্নি ও সিনেটর হিসেবে অভিজ্ঞতা দিয়ে ডেমোক্র্যাটরাও যুক্তরাষ্ট্রে বিভাজনের রাজনীতির সমাপ্তি টানার স্বপ্ন দেখছে।

জো বাইডেনের বর্তমানে বয়স ৭৭ বছর, যে কারণে এক মেয়াদের বেশি তাঁর প্রেসিডেন্ট পদে থাকা নিয়ে অনেকেই মনেই সন্দেহ রয়েছে। সেদিক থেকে তরুণ না হলেও বাইডেনের তুলনায় অনেকটাই কম বয়সী ৫৬ বসন্ত পেরুনো কমলা হ্যারিস। [সূত্র: ব্রিটানিকা ডটকম, পলিটিকো ডটকম]

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন