যেখানে ট্রাম্পের শেষ সেখানে বাইডেনের শুরু

প্রকাশিত: নভে ৮, ২০২০ / ০৭:১৬পূর্বাহ্ণ
যেখানে ট্রাম্পের শেষ সেখানে বাইডেনের শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র। হেরে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একের পর এক রাজ্যে ধাক্কা খেয়েও ভোট পুনর্গণনার দাবিতে অনড় ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

পেনসিলভানিয়ার চাবি হাতে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন ৭৭ বছর বয়সী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বাইডেনের রানিং মেট কমলা হ্যারিসও। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ নারী প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে বসতে যাচ্ছেন।

নির্বাচনের পর চার দিন ধরে ভোটগণনা নিয়ে টানাহেঁচড়ার পর গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রচার মাধ্যম সিএনএন, এনবিসি ও সিবিএস যৌথভাবে এ ঘোষণা দেয়।

জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাইডেন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এখন রাগ-ক্ষোভ একপাশে ঠেলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমেরিকান জনগণের এ আস্থা-বিশ্বাস আমাকে সম্মানিত করেছে।’ আর কমলা বলেছেন, ‘সামনে অনেক কাজ পড়ে আছে।

এটা আমেরিকান জনগণের ইচ্ছা আর আত্মার জয়।’ এদিকে পরাজয় স্বীকার করেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘তাড়াহুড়া করে জো বাইডেন কেন জয়ী হওয়ার মিথ্যা ঘোষণা দিলেন তা আমরা সবাই বুঝি।

নির্বাচন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এর বহু কিছু এখনো বাকি।’ তবে ট্রাম্প যাই বলুন না কেন, এক মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হয়েই থেকে যেতে হবে তাঁকে। যেমন জিমি কার্টার ছিলেন বা জর্জ বুশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়েছেন তিনি—সাত কোটি ৪০ লাখের বেশি।

যদিও ভোটগণনা এখনো চলছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ট্রাম্পও কম যাননি। সাত কোটি ভোট পেয়েছেন তিনিও, যা জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চেয়েও বেশি।

এরই মধ্যে ডেমোক্র্যাট প্রধান রাজ্যগুলোতে উৎসাহ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে সাধারণ মানুষ। উৎসব শুরু হয়ে গেছে। দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাইডেনকে তারা বরণ করতে চায় একটু অন্যভাবে।

কারণ বাইডেনের এ পর্যন্ত পৌঁছানোর ইতিহাস গতানুগতিক নয়। মাঝে ট্রাম্পের চার বছরের শাসনকাল যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আর সঙ্গে রয়েছে করো’না’ভা’ইরাসের তীব্র সং’ক্রমণ।

শুধু যে ভিন্ন পরিস্থিতিতে এবার ভোট হয়েছে তা-ই নয়, ভোটের ধরন-ধারণেও এবার বড় পরিবর্তন ছিল। আগাম ভোট স্বাভাবিক সময়ের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আগাপাশতলা পাল্টে দিয়েছে।

যে ভোটে ফল জানা যায় নির্বাচনী রাতেই, তাকে টেনে চতুর্থ দিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাতেও পূর্ণ ফল মেলেনি। ইলেকটোরাল কলেজের চাহিদামতো ২৭০ সংখ্যা পূরণ হয়েছে মাত্র।

ভোটের রাত পার করে ডাকের ব্যালটের প্রবাহ শুরু হয়। ঠিক এই সময় থেকেই এগোতে শুরু করেন জো বাইডেন। তিন দিন আগে তাঁর ইলেকটোরাল কলেজের ভোট গিয়ে দাঁড়ায় ২৫৩তে।

এরপর নষ্ট ঘড়ির মতো টানা তিন দিন তার কাঁটাও সেখানেই আটকে ছিল। সেই ফাঁড়া কাটল গতকাল পেনসিলভানিয়া দিয়ে। পার হয়ে গেলেন ম্যাজিকসংখ্যা ২৭০। এখন তাঁর কাছে ২৭৩ ইলেকটরের সমর্থন রয়েছে।

এরই মধ্যে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আসতে শুরু করেছে অভিনন্দন। সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে বাইডেন-হ্যারিসকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, কানাডার জাস্টিন ট্রুডো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো।

জানা গেছে, এখনো ফল আটকে থাকা পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে তিনটিতে এগিয়ে আছেন তিনি। ডাকে আসা ভোটগণনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পার্থক্য। জর্জিয়াতে ভোট পুনর্গণনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে নিয়মানুযায়ী এখনই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এ রাজ্যে চার হাজার ভোটে এগিয়ে বাইডেন। ১৩ নভেম্বরের মধ্যে রাজ্য তার ফল ফেডারেল নির্বাচনী সংস্থাকে জানাবে। সংস্থা ঘোষণা দেবে ২০ নভেম্বর। এরপর অবশ্যই প্রার্থীদের পুনর্গণনার জন্য আবেদন করতে হবে।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্গণনা শুরু হবে না। সে ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান থাকতে হবে দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ভোট পুনর্গণনার ক্ষেত্রে ফল পাল্টে যাওয়ার নজির বিরল। তবে জর্জিয়ার ফলাফল ঝুলে গেছে, এমন বলাই যায়।

১১ ইলেকটোরাল কলেজের আরিজোনার ফল যেকোনো সময় চলে আসবে। তবে এ রাজ্য থেকে সমাধান পাওয়া যাবে না। এ রাজ্যে গতকাল পর্যন্ত ২৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন বাইডেন। আলাস্কা (৩), নেভাডা (৬) ও নর্থ ক্যারোলাইনার ডাকের ভোটগ্রহণের সময়সীমা ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে এগুলোরও ফল আজ-কালের মধ্যেই জানা যাচ্ছে না।

কেন এত দেরি : মূলত নিয়মতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে গেছে ফল প্রকাশ। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে আভাস দেওয়া যাচ্ছে। পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে ফল ঘোষণা করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের নিয়ম একেক রাজ্যে একেক রকম।

২০১৬ সালেও নির্বাচন হয়েছে মূলত প্রযুক্তিনির্ভর। অর্থাৎ কেন্দ্রে গিয়ে বোতাম চেপে ভোট দিয়ে এসেছে মানুষ। এবার করোনাভাইরাসের কারণে যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ। ভোট পড়ছে ব্যালট পেপারে সিল মেরে। এই প্রক্রিয়ায় ভোট দিতে দেরি হয়, গুনতেও সময় লাগে।

একই কারণে এবার আগাম ভোটের সংখ্যা বহুগুণ বেশি। মেইল ইন বা ডাকের ব্যালট এবং ভোটকেন্দ্রে আগেই গিয়ে দেওয়া ভোট মিলেই আগাম ভোট। এবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোট পড়েছে ১৬ কোটি। এর মধ্যে আগাম ভোটই ১১ কোটি।

যার মধ্যে মেইল ইন ব্যালট আবার সাড়ে ছয় কোটির বেশি। এই ব্যালটগুলো প্রথমত ডাক বিভাগের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে যাওয়ার কারণে ঠিক সময় নির্বাচনী দপ্তরে গিয়ে পৌঁছেনি। দ্বিতীয়ত, ডাক খুলে ব্যালট বের করে গোনার প্রক্রিয়াও চটজলদি হয় না। দুয়ে মিলিয়ে সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

এই অংশের ভোট নিয়েই আপত্তি তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর আশঙ্কা, এই অংশ নিয়ে কারচুপি হবে। এবং ভোটে পরাজিত করা হবে তাঁকে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি। ভোটের আগেও পারেননি, ভোটের পর চার দিন পার হয়ে গেলেও তাঁর শিবিরের পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি।

যদিও আদালতে ছুটছে তারা। টুইটের পর টুইট করে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। সংবাদ সম্মেলন ডেকেও ভুলভাল বকছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্প নির্বাচনে কারচুপির দাবি করলেও এবার রেকর্ডসংখ্যক সাত কোটি ভোট পেয়েছেন তিনি।

জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এত ভোট পাননি। অবশ্য ভোটপ্রাপ্তির দিক থেকে তাঁর চেয়েও এগিয়ে আছেন বাইডেন। গতকাল পর্যন্ত ট্রাম্পের চেয়ে ৪৪ লাখ ভোটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। এদিকে ফেডারেল ইলেকশন কমিশন কমিশনার এলেন ওয়াইনট্রাউব বলেছেন, ‘ভোট জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

ওবামার অভিনন্দন : সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর ‘দক্ষিণ হস্ত’ বলে পরিচিত জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সব রীতিনীতি ভেঙে বাইডেনের জন্য প্রচার অভিযানে নামেন ওবামা।

তিনি বলেন, ‘জো বাইডেন ও ফার্স্টলেডি জিল বাইডেনকে অভিনন্দন জানাতে পেরে আমি কতটা গর্বিত তা ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব। আমি জানি, হোয়াইট হাউসে জো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমি বিশ্বাস করি, এসব মো’কাবেলা করার যোগ্যতাও তাঁর আছে।’ সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, এনবিসি, দি ইনডিপেনডেন্ট।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন