ধ’র্ষ’ণের বিচার চাই, ‘জীবন থাকুক আর না থাকুক

প্রকাশিত: অক্টো ১২, ২০২০ / ১০:২৭অপরাহ্ণ
ধ’র্ষ’ণের বিচার চাই, ‘জীবন থাকুক আর না থাকুক

চারদিকে তখনো নীরব পরিবেশ। রাস্তাঘাটে মানুষ নেই। নেই গাড়ি-ঘোড়ার চাপও। আজ সোমবার সকাল ৬টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে একটি তাঁবু টাঙানো। তাবুর ভেতরে ধর্ষণের বিচার চেয়ে অনশনরত ঢাবির এক শিক্ষার্থী। সারারাত তাবুতে তাঁর সঙ্গে কয়েকজন সঙ্গী ছিলেন।

তাঁবুর ভেতরে অবস্থান নেওয়া সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী। অনশনরত ওই শিক্ষার্থী ছাড়া তাঁর সঙ্গীরা আসে, অবস্থান করে, চলেও যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। শুধু বিচারের দাবিতে অনশনরত ওই শিক্ষার্থীই থেকে যান রাজু ভাস্কর্যে।

ওই শিক্ষার্থীর মা-বাবা আর ছোট তিন ভাই থাকে গ্রামে। ওই গ্রামের একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী তিনি। ইউনিয়নের সবাই তাঁকে চেনে, তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশাও ছিল অনেক।

কিন্তু এমন একটি ঘটনায় সবাই হতবাক। একই সঙ্গে সামাজিকভাবেও পরিবারকে হে’ন’স্তার শি’কা’র হতে হয় নানাভাবে। আজ সোমবার সকালে ওই শিক্ষার্থী এসব কথা বলছিলেন।

‘আমি ধ’র্ষি’তা, প’তি’তা নই’

ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার পরিবার আছে। তাদের সম্মান আছে। অনেক সামাজিক ব্যাপার-স্যাপার আছে। আমার পরিবারের কথাটা একবার ভাবেন। এত কিছু মেনে নিয়েও আমি ধ’র্ষ’ণের বিচার চাচ্ছি।

আমার এই অবস্থান থেকে আমি সরে যাচ্ছি না। জীবন থাকুক আর না থাকুক, ধ’র্ষ’ণের বিচার চাই। সম্মান তো আর নেই, বিষয়টি এখন সারা দেশ জেনে গেছে। আমি ধ’র্ষি’তা, প’তি’তা নই।’

‘পৃথিবীর কোনো মা চান, তাঁর মেয়ে রাস্তায় থাকুক?’

‘আমার মা-বাবার আমি একমাত্র মেয়ে। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ধ’র্ষ’ণের বিচারের দাবিতে রাস্তায় অনশন করছে, এটা কি মেনে নিতে পারে পরিবার? পৃথিবীতে এমন কোনো মা আছেন? যিনি চাইবেন, তাঁর মেয়ে রাস্তায় থাকুক? মা তো মা-ই। আমার মা অনেক অসুস্থ। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় না। মা বিছানায়, আর মেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।’ আক্ষেপ করতে করতে তিনি এ কথা বলছিলেন।

‘বন্ড সই দিয়ে ঢামেক থেকে চলে এসেছি’

অনশনরত ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘গত শনিবার আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয় আমাকে। সেখান থেকে পপুলার হাসপাতালে নেওয়া হলে কয়েকটি পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়।

সেই পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে রাত ১১টার দিকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। ওই রাতে চিকিৎসকরা আমাকে ছাড়তে চাননি হাসপাতাল থেকে। কারণ, আমার হৃদযন্ত্রের সমস্যা হচ্ছিল।

চিকিৎসক বলছিলেন, যেকোনো সময় এই সমস্যা আরো গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমি যেহেতু বিচারের দাবিতে অনশনে বসেছি সেহেতু আমি হাসপাতালে থাকতে চাইনি। পরে সবার অমতের পরও আমি হাসপাতালে বন্ড সই দিয়ে রাত ১টার দিকে রাজু ভাস্কর্যে ফিরে আসি।’

শরীর আগের চেয়ে ভালো

ওই ছাত্রী বলেন, ‘চিকিৎসক আমাকে স্যালাইন দিচ্ছেন। কিছু ওষুধ দিয়েছেন, সেগুলো খাচ্ছি। এ ছাড়া আর কিছু খাওয়ার রুচি হচ্ছে না। প্রথমত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আছি। ধুলাবালির জন্য খেতেও ইচ্ছে করছে না। এ ছাড়া অন্য কোনো খাবার তেমন একটা খাচ্ছি না।

আর কিছু খেলেও বমি হচ্ছে। শরীরের অবস্থা আগে খারাপ থাকলেও এখন মোটামুটি ভালো। ঠাণ্ডায় বা গরমে আমার গলার সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া আপাতত আর কোনো সমস্যা দেখছি না।’

নিরাপত্তায় পুলিশ

অনশনকারী ওই ছাত্রীর নিরাপত্তায় সারারাত নিয়োজিত ছিলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ১২ পুলিশ সদস্য। পুলিশ লাইনের উপপরিদর্শক (এসআই) ইদ্রিস আলীর নেতৃত্বে তাঁরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।

এ ছাড়া সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন আশপাশের এলাকায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব এখানের সার্বিক বিষয় মনিটরিং করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গোপনে হলেও ভূমিকা রাখা।’

গত ২০ সেপ্টম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ থানায় ধ’র্ষ’ণ ও ধ’র্ষ’ণে সহযোগিতার অ’ভি’যোগে নুরুল হক নুরসহ ছয়জনের বি’রু’দ্ধে মা’ম’লা করেন।

পরের দিন ২১ সেপ্টম্বর পরস্পর যোগসাজশে অ’প’হরণ করে ধ’র্ষ’ণ, ধ’র্ষ’ণে সহায়তা এবং হেয়প্রতিপন্ন করে ডিজিটাল মাধ্যমে অ’প’প্রচার করার অ’ভি’যোগ একই ব্যক্তিদের আ’সা’মি করে ডিএমপির কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মা’ম’লা করেন ওই ছাত্রী।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ সেপ্টেম্বর ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সংগঠনের ঢাবি শাখার সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লার নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল সংগঠনটি।

গতকাল রোববার তদন্ত কমিটি তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় পরিষদের কাছে জমা দেয়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘অ’ভি’যোগকারী মামলার এজাহারে হাসান আল মামুনের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করলেও হাসান আল মামুন সেটি অস্বীকার করেছেন।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবেই তাঁদের পরিচয় হয়, সাংগঠনিক কাজের সূত্রে নয়। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কের মতো কোনো ঘটনা ঘটছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি কোনো তথ্য প্রমাণ পায়নি। এমনকি অ’ভি’যোগকারীও এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির কাছে কোনো তথ্য প্রমাণ দিতে পারেনি।’

লালবাগ থানায় করা মামলার আসামিরা হলেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন (২৮), যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হাসান সোহাগ (২৮), ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর (২৫), ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম (২৮),

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সহসভাপতি নাজমুল হুদা (২৫) ও আব্দুল্লাহিল বাকি (২৩)। কোতোয়ালি থানায় করা মা’ম’লায় নাজমুল হাসান সোহাগকে ১ নম্বর ও হাসান আল মামুনকে ২ নম্বর আ’সা’মি করা হয়। দুটি মা’ম’লায় নুরকে ৩ নম্বর আ’সা’মি করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে আজ রোববার রাতে সঙ্গে কথা হয় অ’ভি’যোগকারী ওই ঢাবি শিক্ষার্থীর। তিনি বলেছিলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্য রাফিয়া সুলতানা আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাঁর কাছে আমি ধ’র্ষ’ণের ঘটনার কী প্রমাণ দিবো? এটা তো মেডিকেল রিপোর্টের ব্যাপার।

যা আমি থানায় দিয়েছি। আর তাছাড়া শুরুতেই তো ছাত্র অধিকার পরিষদ ধ’র্ষ’ণকারীদের পক্ষে একটি অবস্থান নিয়ে মিটিং-মিছিল সবই করেছে। সেক্ষেতে তাঁরা কী প্রতিবেদক দিবে? যাদের বি’রু’দ্ধে অভিযোগ, তাঁরা কি সুষ্ঠু তদন্ত করার ক্ষমতা রাখে?

আমার যে অ’ভি’যোগ তা আমি আদালতে প্রমাণ করবোই। এবং আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এসব প্রমাণ তাদের কাছে দিতে আমি বাধ্য? তাদের সুষ্ঠু প্রতিবেদনের কথা বাদই দিলাম, তাদের তো তদন্ত করার অধিকারও নেই। আমি এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে প্রত্যাখান করছি।’

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন