‘ভাসমান সেতু’ নির্মাণ করল চাষিরা

প্রকাশিত: অক্টো ৭, ২০২০ / ০৮:৪৩অপরাহ্ণ
‘ভাসমান সেতু’ নির্মাণ করল চাষিরা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ব‌লে‌ছি‌লেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’ কবিগুরুর বহুশ্রুত এ চরণটি এবার অনুসরণ করলো একটি গ্রামের চা‌ষিরা।

কু‌মিড়মারা সবজী চা‌ষি‌দের ডাক শোনেনি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন কিংবা বিত্তবানরা। তাই বলে সাগর তী‌রের এই চা‌ষিরা বসে থাকেনি। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সবজি চাষিরা নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছে দীর্ঘ ও অভিনব এক ভাসমান সেতু।

দূর থেকে দেখা যায় সবুজাভ পানির উপরে ভাসমান নীল আর সাদা রঙের সেতুটি। কাছে গেলে দেখা যায় খা‌লের পানিতে নীল (ড্রাম) আর সাদা র‌ঙের চাম্বল কা‌ঠের প্রতিফলন। বেশ মনোরম এ দৃশ্য, প্রথম দেখায় যে কেউ ভাবতে পারে, বিদেশি কোনো কোম্পানি স্বল্প খরচে তৈরি করে দিয়েছে এ সেতুটি।

না, কোনো প্রকৌশল বা কারিগরি জ্ঞান ছাড়াই স্বল্পশিক্ষিত কু‌মিড়মারা গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে সেতুটি। ভাসমান এ সেতু পাল্টে দিয়েছে এ জনপদের চিত্র।

সেতুটি হওয়ার ফলে আশেপাশের ছয়টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগে এসেছে আমূল পরিবর্তন। স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীসহ গ্রামের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এখন সহজেই পা‌খিমারা খাল পার হতে পারছে।

গ্রামবাসী আশা করছে, এ সেতু হওয়ার ফলে তা‌দের উৎপা‌দিত সবজী বি‌ক্রি ক‌রে ন্যায্য মূল্য পা‌বেন।

নিজেদের অর্থায়নে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পাখিমারা খালে ১১৬ মিটার দৈর্ঘ্যের এ ভাসমান সেতুটি সবজি চাষিদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। নিজেরা চাঁদা তুলে প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন দিয়ে পাখিমারা খালের ওপর ভাসমান এই সেতুটি নির্মাণ করেন তারা। আগামী ৯ অক্টোবর সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

সেতুটি নির্মাণে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৭২টি প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর পাটাতন করতে ২৫০ ঘনফুট কাঠ লেগেছে। আর প্লাস্টিকের তারকাটা ও রশি লেগেছে তিন মণ।

সবজির গ্রাম খ্যাত কুমিরমারা, মজিদপুর,বাইনতলা, ফ‌রিদগঞ্জ, স‌লিমপুর, এলেমপুরের প্রায় সহস্রাধিক সবজি চাষিরা বছরব্যাপী উৎপাদিত মৌসুমি শাক-সবজি বিক্রি করতে কলাপাড়া উপজেলা শহরে যোগাযোগের একমাত্র পথ ছিল এই সেতু।

পাখিমারা খালের ওপর কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় প্রায় ১১৬ মিটার দীর্ঘ ওই আয়রন ব্রিজ নির্মাণ করে।

ওই এলাকার কয়েকটি পুরনো আয়রন ব্রিজের মালামাল দিয়ে এ ব্রিজটি নির্মাণ করায় শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে ব্রিজটি ধসের ভয় ও আতঙ্ক ছিল। কারণ, সেতুটি নির্মাণের সময় খালের মধ্যে ঠিকভাবে লোহার খুঁটিগুলো পোঁতা হয়নি। এটি দিয়ে মানুষ চলাচল করলেই তা নড়তো। অবশেষে গত ৬ আগস্ট রাতে হঠাৎ এর প্রায় ৯০ ভাগ ভেঙে খালে তলিয়ে যায়।

এলাকাবা‌সি জানান, ব্রিজটি মেরামতের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদে বারবার অনুরোধ জানান চাষিরা। কিন্তু, কেউ সেতুটি মেরামতে এগিয়ে আসেনি। উপায় না দেখে সবজি চাষি ও গ্রামবাসীরা নিজেদের উদ্যোগে বিকল্প কাঠের পাটাতনের সেতু তৈরিতে নেমে পড়েন।

সেতু নির্মা‌ণের উদ্যোক্তা আজিজ হাওলাদার, নুরুল আমীন গাজী, জাকির হোসেন বলেন, ‘কোনো উপায় না পেয়ে নিজেদের সংগঠন ‘আদর্শ কৃষক সমবায় সমিতি’র সদস্যরা জোট বেধে নিজেদের অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেই। কুমিরমারা, মজিদপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সহায়তা করেন। এ সেতুতে একই সঙ্গে ১০ জন মানুষ পারাপার হলেও কোনো ঝুঁকি নেই।’

নীলগঞ্জ ইউ‌নিয়‌নের চেয়ারম্যান না‌সির উ‌দ্দিন মাহমুদ ব‌লেন, ২৪ সে‌প্টেম্বর পা‌খিমারা বাজা‌রে স্থানীয় চা‌ষিরা সভা ক‌রে‌ছেন। পা‌খিমারা-কু‌মিরমারা খা‌লের ওপর সেতু নির্মা‌ণের জন্য এক‌টি ক‌মি‌টি গঠন করা হ‌য়ে‌ছে। ক‌মি‌টির মাধ্যমে চা‌ষিরা চাঁদা তু‌লে সেতু নির্মাণ ক‌রে‌ছে। আমি ব্যক্তিগতভা‌বে সহ‌যো‌গিতার কথা ব‌লে‌ছি।

কলাপাড়া এলজিইডির প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাখিমারা খালে আগে ছিলো কাঠের পুল। উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্তে ছয় বছর আগে একটি পুরনো আয়রন ব্রিজের মালামাল দিয়ে ওই খালে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। যা কিছুদিন আগে ভেঙে পড়ে। তবে, কলাপাড়া উপজেলায় ভেঙে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকা অনুমোদন হলেই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন