চসিকের দেনা চারপাশ ঘিরে ধরেছে

প্রকাশিত: জুলা ৩১, ২০২০ / ০৯:৪৮অপরাহ্ণ
চসিকের দেনা চারপাশ ঘিরে ধরেছে

ঋণের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। স্বপ্নের শহর গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মেয়র হওয়ার পর প্রায় ৮১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা দেনা রেখে মেয়র পদ ছাড়বেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। সিটি করপোরেশন আগের দুই মেয়রের পথ ধরে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও বিশাল ঋণের বোঝা দিয়ে অগ্রজদের পথে হাঁটবেন কয়েকদিন পর।

আগামী ৫ আগস্ট পূর্ণ হবে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও তাঁর পরিষদের মেয়াদ। এর আগে সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনা রেখে মেয়র পদ ছেড়েছেন।

তারও আগে প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ৬০ কোটি টাকার দেনা রেখে যান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আয়বর্ধক প্রকল্পগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন কোনো আয়বর্ধক প্রকল্প চালু না করা, অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা কারণে দেনা বেড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, বিভিন্ন খাতে করপোরেশনের দেনা রয়েছে প্রায় ৮১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগরীতে উন্নয়ন কাজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ বিভিন্ন তহবিলের বকেয়া পড়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। এতে বর্তমান মেয়রের ওপর ক্ষুব্ধ অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কাজ করে বছরের পর বছর বিল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সিটি করপোরেশনের ঠিকাদার সমিতি। শুধু গত পাঁচ বছরে ঠিকাদারদের বিল বকেয়া পড়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

এর আগের পাঁচ বছর এম মনজুর আলম ও এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর শাসনামলের উন্নয়ন কাজের বকেয়া বিলসহ শুধু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পাওনা রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘ সময়ে বকেয়া টাকা না পেয়ে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছেন বলে জানান তারা।

বকেয়া টাকা না পাওয়া, ব্যাংক ঋণের দেনা মেটাতে না পেরে এ পেশা ছেড়ে অন্যপথে পা বাড়িয়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ টাকার অভাবে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে মারা গেছেন। এমন অভিযোগ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের। উন্নয়ন কাজের বিপরীতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে।

তারা বলেন, মেয়র নাছির উদ্দীন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামশুদ্দোহা ও প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল সোহেল আহমেদের চেয়ার ছাড়া সব টেবিল-চেয়ারগুলোকে ম্যানেজ করে নগরীতে উন্নয়ন কাজ করতে হয়। টাকা না দিলে এসব টেবিলগুলোতে ফাইল নড়ে না। এসব কষ্টের কথা তাঁরা কাউকে বলতেও পারেন না।

ঠিকাদাররা জানান, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে ৫ আগস্ট। আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। কাল ঈদুল আজহা।

এ সময়ে ঠিকাদারসহ নগরের উন্নয়ন কাজে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পাওনা পরিশোধের সুযোগ কম। যদিও পাওনাদাররা নানাভাবে চেষ্টা করছেন বকেয়া আদায়ে। ঈদের বন্ধের পর মেয়রের মেয়াদ শেষ। এ টাকা মিলবে বলে মনে হয় না।

এর আগে ১৯৯৪ সালের ১১ মার্চ থেকে ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সময়ে ৬০ কোটি টাকা দেনা রেখে যান। ২০১০ সালের ২০ জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ২৭ মে পর্যন্ত বিএনপি সমর্থিত মেয়র এম মনজুর আলম ২৯৫ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৭৪ টাকা দেনা রেখে মেয়র পদ ছেড়েছেন। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছিরের গত পাঁচ বছরের সময়ে দেনার পরিমাণ ৮১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সিটি করপোরেশন ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মনজুরুল আলম বলেন, ‘সাবেক মেয়র মনজুর আলমের শাসনামলের টাইগারপাসের একটি ভবন নির্মাণ কাজের বিপরীতে তিন কোটি টাকা এখনো পরিশোধ করেনি সিটি করপোরেশন।

এ দীর্ঘ সময়ে বকেয়া টাকার জন্য সর্বোচ্চ স্থানে তদবির করেও কোনো সুফল মেলেনি। যদিও নির্মাণাধীন ভবনে এখন সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়। মেয়র সাহেবসহ করপোরেশনের সব কর্মকর্তারা এ অফিসে বসে অফিস করেন।’

আরাধনা আতিক জেবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আতিক বলেন, ‘গত ছয় মাস ধরে ঘুরছি সিটি করপোরেশনে ৭০ লাখ টাকা পাব বলে। কিন্তু কোনোভাবে বকেয়া টাকা আদায় করা যাচ্ছে না।

মেয়র সাহেবের কাছে হাত জোড় করে কেদেছি। বউ দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। একটি ইনজেকশন নিতে ব্যয় হয় ৬০ হাজার টাকার বেশি। ৭০ লাখ টাকা বকেয়া পড়লে কয় টাকা লাভ থাকে? কাউকে কিছু বলতেও পারছি না। কী দুঃসময় পার করছি।’

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা না থাকার কারণে এসব হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কেন ভাঙা হবে? এরা সারা জীবনের চাকরি শেষে এ টাকা দিয়ে কিছু করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু টাকা না পেয়ে তারা আজ অসহায়।

ঠিকাদার কাজ শেষ হলে বিল পাবে এটাই তো নিয়ম। বছরের পর বছর ঘুরে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন তারা। নগরীতে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে নানা প্রকল্প নগরীতে বাস্তবায়িত হয়েছে। স্পন্সর নিয়ে এসব কাজ হলেও অপচয় অনিয়ম বেশি হয়েছে।

১০০ টাকার পণ্য এক হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছে। অভিজ্ঞতা নেই এমন লোকগুলো দরপত্র নিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছে হাত বদল করে বিক্রি করেছে। এতে ব্যয় যেমন বেড়েছে তেমনি অন্য পেশার লোকদের ঠিকাদারী তকমা লাগিয়ে ব্যবসায়ীতে পরিণত করেছেন।’

শরীরে ক্ষতস্থানে মলম না দিয়ে রোড ও আইল্যান্ডে রুপচর্চা ও বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না বলে মন্তব্য করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন করপোরেশনের দেনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘২০০৫ সালে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, ২০১০ এম মনজুর আলমের দেনার কিছু অংশ আমি পরিশোধ করেছি।

২০০৫ সালে মহিউদ্দিন ভাই ৬০ কোটি টাকা দেনা রেখে যান। আমি ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারররা এখন কাজ করতে চান না। তারা জানেন সিটি করপোরেশনের টেন্ডারে অংশ নিলে লাভ দূরে থাক তাদের মূলধনও চলে যাবে।

ঠিকাদারদের প্রাপ্য পাওনা যথাসময়ে দিতে না পারার কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বুঝে নিতে পারে না করপোরেশন। আবার কাজ না করলেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।

কারণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ৩০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর তাদের বিল দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সিটি করপোরেশন। যার কারণে অনেক সময় তারা কাজ না করে গরিমসি করে।’

এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে হতাশা প্রকাশ করেন মেয়র নাছির। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে রাজস্ব আদায়ে সফল হতে পারেননি বলে স্বীকার করেন।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন