সাউথখালী আম্ফানের হানায় মৃ’ত্যুপুরীতে পরিণত হবে

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২০ / ০৬:৫৫অপরাহ্ণ
সাউথখালী আম্ফানের হানায় মৃ’ত্যুপুরীতে পরিণত হবে

বাগেরহাটের শরণখোলার দুর্যোগেও কোনো কাজে আসলো না ৪০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ! ঠেকাতে পারলো না ঘূর্ণিঝ’ড় আম্ফানের জলোচ্ছাস। মূল ঝুঁ’কিপূর্ণ এলাকা অরক্ষিত রেখে ধীর গতিতে চলতে থাকা টেকসই বাঁধের কাজ চার বছরেও শেষ না হওয়ায় ক্ষো’ভে ফুঁ’সছে বলেশ্বর পারের মানুষ।

বুধবার প্রবল জোয়ারের চাপে বেশ কয়েক জায়গার বাঁধ উপচে এবং রিংবেড়িবাঁধ ভেঙে বলেশ্বর নদের পানি ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। বাঁধের বাইরের কিছু ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের পাশের সমস্ত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। বলেশ্বর নদ তীরবর্তী এলাকায় সর্বত্র আতঙ্ক ও একটা ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিশেষ করে সাউথখালী ইউনিয়নের অবস্থা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ওই ইউনিয়নের বগী থেকে দক্ষিণ সাউথখালীর গাবতলা আশার আলো মসজিদ পর্যন্ত দুই কিলোমিটার বাঁধ মারা’ত্মক ঝুঁ’কির মধ্যে রয়েছে। বলেশরের বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

ক্ষ’ত’বি’ক্ষত হচ্ছে নামমাত্র দেওয়া রিংবাঁধটি। রাতের জোয়ারে ওই বাঁধ সম্পূর্ণ বিলিন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খুঁড়িয়াখারী-তেড়াবেকা এলাকায়ও রিংবাঁধ ভেঙে গেছে।

এ ছাড়া উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারের পূর্ব অংশের বলেশ্বর নদের পারের দুটি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি উপছে আশপাশের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। সীমাহীন দু’র্ভো’গে পড়েছে বাঁধের পাশের দুর্গত মানুষ।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সিডরে শরণখোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বলেশ্বর পারের কুমারখালী থেকে বগী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষ’তিগ্রস্ত হয়।

এর পর এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) মাধ্যমে টেকসই বাঁধের কাজ শুরু করে সরকার।

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের কিছু অংশ নিয়ে মোট ৬২ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে শরণখোলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিশষে গুরুত্ব বিবেচনায় এলাকাকে জলোচ্ছাস থেকে বাঁচাতে বলেশ্বর নদের তীর রক্ষায় দুই বছরের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার কথা।

কিন্তু চায়নার ‘সিএইচডব্লিউই’ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অজুহাতে যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় আরো দুইবার সময় বৃদ্ধি করে। এমনকি তারা এই পোল্ডারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ না করে কম ঝূ’কিপূর্ণ এলাকায় বাঁধের কাজ সম্পন্ন করে। এতে মূল এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত রয়ে যায়।

ফলে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা দাবি করলেও আসলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রমত্তা বলেশ্বরের জোয়ার আর ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি এলাকাটি।

আম্ফানের প্রভাবে বুধবার ভোররাত থেকে বলেশ্বরের জোয়ারের প্রবল চাপে বাঁধ উপছে এবং রিংবাধ ভেঙে যখন পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে, তখন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জোয়ারের পানি ঠেকাতে জোড়াতালি দিতে শুরু করে।

একটি এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে রায়েন্দা বাজারের পূর্বাংশের বাঁধে মাটি কেটে পানি রক্ষার চেষ্টা চালায়। অথচ, সিডরে মৃত্যুপুরী হিসেবে খ্যাত সেই সাউথখালীর বগী-গাবতলার বাঁধ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সেখানে মানুষের মাঝে হাহাকার শুর হয়ে গেছে। আম্ফান আঘাত হানলে আরেক মৃ’ত্যু’পুরীতে পরিণত হবে সাউথখালী।

সাউথখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ সাউথখালী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জাকির হাওলাদার জানান, প্রবল গতিতে বলেশ্বরের ঢেউ রিংবাঁধ উপর দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ধসে পড়ছে বাঁধ।

বাঁধের পাশের আ’তঙ্কিত প্রায় তিন শ পরিবার মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগেই আশ্রয় কেন্দ্রে চলে গেছে। রাতের মধ্যে দুই কিলোমিটার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আ’শ’ঙ্কা করা হচ্ছে।

ইউপি সদস্য আরো জানান, মূল ঝুঁকিপূর্ণ বগী ও দক্ষিণ সাউথখালী অরক্ষিত রেখে চার বছর ধরে টেকসই বেড়িবাঁধের কাজ চলছে। চায়না ঠিকাদাররা মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা শুরু করেছে।

সাউথখালী ইউপির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে সাউথখালী দিন দিন ঝুঁ’কির মুখে পড়ছে। বগী-গাবতলার বাঁধ রাতের মধ্যে ভেঙে যেতে পারে। তাতে পুরো সাউথখালী ইউনিয়ন ক্ষ’তিগ্রস্ত হবে।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, সকালে আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। তাতে যা দেখলাম রাতের জোয়ারে ওই বাঁধ কোনোক্রমেই টিকবে না। বাঁধ ভেঙে গেলে ব্যাপক ক্ষ’য়ক্ষতির আ’শ’ঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) শরণখোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, রায়েন্দা বাজারের পূর্ব দিকে বলেশ্বর পারে কিছু অংশে কাজ বাকি থাকায় সেখান থেকে সামন্য পানি ঢুকেছে।

সকাল থেকেই সেখানে মেশিন লাগানো হয়েছে। এছাড়া, সাউথখালী ওই এলাকা খুবই ঝুঁ’কিপূর্ণ। এ অবস্থায় সেখানে কোনোভাবেই কাজ করা সম্ভব না।

সুত্রঃ কালের কন্ঠ

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন