‘আম্মা গো আমারে দেশে নেও, সৌদির অবস্থা একেবারে খারাপ’

প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২০ / ০৬:১৭অপরাহ্ণ
‘আম্মা গো আমারে দেশে নেও, সৌদির অবস্থা একেবারে খারাপ’

“আম্মা গো আমারে দেশে নেও, সৌদির অবস্থা একেবারে খারাপ। বেটিনতে কালি কান্দে, (নারীরা শুধু কাঁ’দে)। দেশে থাকতে ইন্টারনেটে যে দেখতাম সৌদিতে মানুষরে মা’রে, বে’ই’জ্জত করে (নারীদের যৌ’ন নি’র্যা’তন করে), বাংলাদেশে থাকতে ইন্টারনেটের দেখা সকল দৃশ্যই বাস্তব, কিছুই ভূল নায়।

অফিসে দিনের পর দিন যায়, রাইতের পর রাইত যায়, কেউ খানি (খাবার) দেয় না। দা’লালরা কয় (বলে) তোমরারে ২ লাখ টেকা (টাকা) দি তোমরারে কিইন্না (কিনে) আনছি। বাংলাদেশের অফিস থাকি কল দিয়া কয় আমরারে মারার লাগি, মাগনা আনছি নি, টেকা দি কিইন্না আনছি।

একটা পুয়া যে মাইর মারছে গো আম্মা, পরে কইছি আমারে যা কইবে তা করমু। পরে আমারে দিয়া ভিডিও করাইয়া দেশে দিছে। আম্মাগো আমারে বাচাঁ’ও, সালামের লগে যোগাযোগ করো। আমারে দেশে নেও।”

নবীগঞ্জের ইভা বেগমের টেলিফোনে কথোপকথন এটি। এভাবেই সৌদি থেকে বাংলাদেশী নারী শ্রমিক ইভা বেগম দেশে ফেরার জন্য স্বজনদের সাথে মোবাইল ফোনে আলাপকালে আ’কু’তি জানাচ্ছেন।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় স্থানীয় দালালের মাধ্যমে প্রায় ৩ মাস পূর্বে মরুর দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমান নবীগঞ্জের এই নারী। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাকে বিক্রি করে দেয় দা’লালরা। এরপর থেকেই শুরু হয় তার উপর শা’রী’রিক ও মানসিক নি’র্যা’তন। সুযোগ পেলেই কল দিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে আ’কু’তি জানায় দেশে ফেরানোর জন্য।

নি’র্যা’ত’নের শি’কা’র ইভা বেগম নবীগঞ্জ উপজেলার বড় ভাকৈর গ্রামের নূর হোসেনের স্ত্রী। বার বার মানবপাচারকারীর বাড়ী গিয়েও স্ত্রীকে ফেরত আনতে না পেরে হ’তা’শ স্বামী নূর হোসেন হবিগঞ্জ মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের মা’ম’লা দায়ের করেছেন তিনি।

মা’ম’লার এজা’হার সূত্রে জানা যায়, নূর হোসেনের বাড়ীতে প্রায়ই যাতায়েত করতো তাদের পূর্ব পরিচিত নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা টুনাকান্দি গ্রামের সালাম মিয়া। আসা যাওয়ার সুবাধে ইভা বেগমকে প্রায়ই মোটা অংকের টাকার লোভ দেখাত।

বিদেশ গেলে পরিবারের আর কোন অভাব অনটন থাকবে না বলেও প্র’লো’ভন দেখাত সালাম। দা’লা’ল চ’ক্রে’র পাল্লায় পড়ে গেল বছরের ২৮ ডিসেম্বর মরুর দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমায় ইভা বেগম। কে জানতো সেখানে গিয়ে তার হাসি পরিণত হবে কা’ন্নায়। ইভার বেলায় সেটাই ঘটেছে।

সূত্রে জানা গেছে – সালাম মিয়া ভ্যালি ইন্টারন্যাশনাল নামের রাজধানীর এক ট্যাভেল্স এজন্সির মাধ্যমে দুই শিশু সন্তানের জননী ইভা বেগম কে নারী কর্মি হিসেবে সৌদি আরব পাঠায়। কিন্তু তার স্বপ্ন চু’র’মার করে দিয়েছে দালা’ল চ’ক্র।

চাকরির পরিবর্তে তাকে বিক্রি করা হয়েছে অন্য এক দালাল চ’ক্রের কাছে। সেখানে দালাল চক্রে’র সদ্যসদের কথা মতো অ’নৈ’তিক কাজ না করলে তার উপর চালানো হয় শা’রী’রিক ও মা’নসিক নির্যা’ত’ন। মোবাইল ফোনে ইভা বেগম দেশে থাকা স্বজনদের কাছে নি’র্যা’তনের বর্ণনা দেন এবং থাকে দ্রুত দেশে ফেরাতে আকুতি জানান।

নি’র্যা’তিত ইভা বেগমের স্বামী নূর হোসেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ গ্রাম্য শা’লিস বিচা’রদের কাছে বিষয়টি জানালেও কারো ডাকে সাড়া দেয়নি সালাম।

নূর হোসেন জানান- তিনি পেশায় একজন গাড়ী চালক। তাকে না জানিয়েই দালা’লদের পাল্লায় পড়ে হঠাৎ শশুর বাড়ী গিয়ে সেখান থেকে সৌদি পাড়ি জমায় তার স্ত্রী ইভা। নূর হোসেনের অভিযোগ- স্ত্রীকে দেশে ফেরাতে বললে নারী পাচারকারী সালাম ও জাহাঙ্গীর উল্টো ২ লক্ষ টাকা দাবি করছে।

এ ঘটনায় তিনি ৩ জনকে আসামী করে হবিগঞ্জ মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের মা’ম’লা দায়ের করেছেন। মা’ম’লার অন্য আ’সা’মীরা হলো- উপজেলার লতিবপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর মিয়া, প্রজাতপুর গ্রামের মামুন মিয়া।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান- নি’র্যা’তনের শি’কার ইভা বেগমের পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কেউ তথ্যসহ অ’ভি’যোগ দেয় প্রশাসন তাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং দা’লা’লদের ব্যবস্থা নেয়ারও আইন রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে গ্রামে গ্রামে গিয়ে কিছু স্থানীয় দা’লা’লরা সহজ সরল নারীদের প্রলোভন দিয়ে সৌদিসহ মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠায়। সেখানে গিয়ে তাদের উপর শুরু হয় নানা নি’র্যা’তন। এসব দা’লা’লদের তালিকা করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার দাবী সচে’তন মহলের।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন