চতুর্দিকে অসুবিধায় বিএনপি

প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২০ / ১০:৫৬পূর্বাহ্ণ
চতুর্দিকে অসুবিধায় বিএনপি

দুর্নীতি মামলার দণ্ড নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস দুই বছর পেরিয়েছে। নেত্রীর মুক্তির দাবিতে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। যদিও তাদের নেত্রীকে মুক্ত করার সংগ্রামকে অগ্রভাগে রেখেই বিএনপি নানা কর্মসূচি দিয়ে আসছে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বারংবার শান্তিপূর্ণ জোরালো আন্দোলনের কথাও বলে আসছেন।

শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলন বাস্তবে দেখতে না পেয়ে হতাশা ছড়িয়েছে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে। দলের তরফে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভোটে অংশ নেয়ার কথা বলা হলেও সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে। এই অবস্থায় কর্মসূচি নিয়ে ঘরে ও মাঠে আর খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আইন ও আদালত মিলিয়ে চতুর্দিকেই অসুবিধায় পড়েছে প্রায় দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি।

বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তার মুক্তির দাবিতে ‘নরম’ কর্মসূচি দিয়ে আসছে বিএনপি। তবে শুরুতে যা ছিল এখন তাও নেই। এর মধ্যে আইনি লড়াইয়ে মোটেও সুবিধা করতে পারেননি খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। এমন অবস্থায় নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিলেও এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছাতে পারেননি বিএনপির হাইকমান্ড।

অন্যদিকে দলীয়প্রধানের মুক্তির দাবিতে সক্রিয় কর্মসূচি না থাকায় ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে তৃণমূলে। কর্মসূচি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ আছে কেন্দ্রীয় নেতাদেরও কারও কারও মধ্যে। এদের দুই-একজন প্রকাশ্যে সমালোচনাও করছেন।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমদ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘প্রিয় নেত্রী দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দি। আর আমরা চুপচাপ বসে আছি। বিএনপি এখন কয় নম্বর দল হবে সেটা নিজেদের নির্ধারণ করতে হবে।’ শীর্ষ নেতারা মাঠে না নামলেও তৃণমূলের কর্মীরা ঠিকই মাঠে নামবেন বলেও মনে করেন তিনি।

২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হাইকমান্ডকে কঠোর আন্দোলনের পরামর্শ দিয়েছিল। তবে দলকে সুসংগঠিত করে সময়মতো মাঠে নামার ঘোষণা ছিল হাইকমান্ডের। কিন্তু সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও গতি পায়নি। বিএনপির আন্দোলনেও নামা হয়নি।

কয়েক দিন আগে আপিল বিভাগের পর হাইকোর্টে জামিন আবেদন খারিজ হয়ে যায় খালেদা জিয়ার। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল হাইকোর্টে জামিন মিলবে চেয়ারপারসনের। তবে এই দফায়ও জামিন না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে বিএনপিতে। এ জন্য অবশ্য বিএনপি নেতা ও আইনজীবীরা একে অপরকে দোষারোপও করছেন। দলের শীর্ষ নেতা ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা আলাপে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও খালেদা জিয়ার এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাইকোর্টে জামিন আবেদনে খালেদা জিয়ার বয়স ও তার পালিয়ে যাবেন না এই বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। আমরা বললেও নেতারা বললেন না শুধু মেডিকেলের বিষয়টি আনেন। কিন্তু জামিন তো হলো না। আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী আবেদন করলে জামিন হতেও পারত।’

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৃণমূল থেকে কঠোর কর্মসূচির চাপ থাকলেও বাস্তবতার আলোকে তারা সেদিকে যেতে পারছেন না। কারণ আন্দোলন শুরু হলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে। তখন নেতাকর্মীরা আটক হবেন। শক্তি ক্ষয় হবে। কিন্তু এই অবস্থায় আন্দোলন কতদিন চালিয়ে যাওয়া যাবে সেটা নিয়ে তারা চিন্তিত।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, দুই দিকে দিয়ে নেত্রীকে মুক্ত করতে। কিন্তু চাইলেই তো হুট করে মাঠে নামা যায় না। বাস্তবতা বুঝতে হবে।’

এদিকে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ চলে গেলেও কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি। নেতাকর্মীরা বলছেন, নতুন কমিটি না করলেও আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা করতে নির্বাহী কমিটির সভা ডাকা হোক। দ্রুত অঙ্গ সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা হোক। তবে এমন উদ্যোগের কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই বলে জানা গেছে।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন বলেন, ‘চলমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকট পর্যালোচনা ও সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে দলের নির্বাহী কমিটির জরুরি সভা হওয়া উচিত। না হলে এভাবে শুধু সময় নষ্ট হবে। নেত্রীও মুক্তি পাবেন না।’

ময়মনসিংহ (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘নেত্রী জেলে যাওয়ার পর ও গত নির্বাচনের ভোট লুটের পরই সভা ডেকে পর্যালোচনা করে সংকট নিরসনে করণীয় ও কর্মসূচি প্রণয়ন দরকার ছিল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারপরেও একদম না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়া মন্দের ভালো।’

তবে দলীয়প্রধানের মুক্তির লক্ষ্যে কঠোর কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঢেকে গেছে। মাঠে না নামা ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা প্রাথমিক আলোচনা করেছি। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ নেত্রীকে বাঁচাতে হলে মুক্ত করতেই হবে।’

এদিকে দফায় দফায় জামিন আবেদন খারিজ হলেও এখনো আইনি পথ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করেন খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

তিনি বলেন, ‘এখনো আইনি লড়াইয়ের সুযোগ আছে। তবে ফলাফল কি হবে তা নিয়ে মোটেও আশাবাদী না। কারণ মামলাটি রাজনৈতিক। তাই তার মুক্তির জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাটা জরুরি। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি মিলবে না।’

সূত্র : ঢাকাটাইমস

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন