দেয়া এবং নেয়ার এক মিলনায়তনের নাম গণতন্ত্র

প্রকাশিত: ফেব্রু ২০, ২০২০ / ০৮:৫৪অপরাহ্ণ
দেয়া এবং নেয়ার এক মিলনায়তনের নাম গণতন্ত্র

শীতে বরফে ঢাকা তবে গ্রীষ্মে স্বল্প সময়ের জন্য পুরো দেশটি সবুজে ভরে ওঠে। অনেক লম্বা একটি দেশ পৃথিবীর এক প্রান্তে। এর দুই পাশ দিয়ে আরও দুটি দেশ ফিনল্যান্ড এবং নরওয়ে জ’ড়িয়ে আছে।

পাহাড় পর্বত এবং জ’ঙ্গলে ভরা হলেও রয়েছে হাজারও লেক এবং কৃষি কাজের ভূমি। এরা বছরে একবার অতি অল্প সময়ের মধ্যে যে সব ফসল ফলায় তার মধ্যে জব, গম, সরিষা, কলাই সীম, সীমিত কিছু সবজী এবং প্রচুর ঘাস অন্যতম।

এ ছাড়া গরু, ভেড়া, হাঁস, মুরগী এসবের খামার রয়েছে এখানে। কলকারখানা স্থাপনে এরা বেশি পারদর্শী। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করাই এদের কৃতিত্ব।

আমি এতক্ষণ সুইডেনের ওপর একটু বর্ণনা করলাম। সেই ১৯৮৫ সালে মে মাসের ১৯ তারিখ থেকে এখানেই আমার বসবাস। প্রথম দিন থেকেই টাক্স দিয়ে নাগরিকের অধিকার পালন করে আসছি।

গণতন্ত্রের ওপর যেভাবে পুথিগত বিদ্যায় বর্ণনা রয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করে দেশটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এত বছরের অভিজ্ঞতা যার কারণে আমি চেষ্টা করি তুলে ধরতে, গণতন্ত্র কি এবং কিভাবে এখানে তার বেস্ট প্রাক্টিস করা হয়, তার ওপর মাঝে মধ্যে নানা বিষয়ের ওপর কিছু তথ্য।

যদিও জানি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে এখানের কোন মিল খুজে পাওয়া যাবে না। এমনকি পূথিগত বা নৈতিকতার সঙ্গেও না। তারপরও আমাদের চিন্তাচেতনায় আমরা সত্যিকার গণতন্ত্রে একদিন উপনিত হবই, এ বিশ্বাস থাকতে হবে। গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাক্টিস এখন হচ্ছে না তার অর্থ এই নয় যে আগামী দিনও হবে না। আমাদের ধাপে ধাপে সামনের দিকে এগোতে হবে মূল লক্ষ্য সামনে রেখে।

আমি যেহেতু সুইডেনে থাকি গণতন্ত্রের বেস্ট পরিকাঠামো এখানে রয়েছে বিধায় আমার ধ্যানে জ্ঞানে সুইডেনকেই রোল মডেল হিসাবে বেছে নিয়েছি। কবে বাংলাদেশ সুইডেনের মত হবে সেটাই রয়েছে আমার চিন্তা চেতনাই।

আজ সদ্য ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করব। সুইডেন গাড়ি, ট্রাক, যু’দ্ধে’র প্লেনসহ নানা ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি করে এবং বিশ্বে তার চাহিদা ভালো। কারণ কোয়ালিটি, সার্ভিসসহ সব দিক দিয়ে তারা বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে। আমি সব সময় সুইডিস গাড়ি চালাতে পছন্দ করি।

ঠান্ডা তার পর বরফে ভরা দেশ, রাস্তাঘাটে চলাচলে ভলভো (Volvo) গাড়িতে নিরাপদ অনুভব করি বেশি। আমার বর্তমান গাড়িটির বয়স গত মাসে ১০ বছর পার হয়েছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট লাগছে যে দশ বছর পার হতে না হতেই একের পর এক ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এটা সেটা ঠিক করতে করতে বেশ বি’রক্ত হয়ে পড়েছি। এদিকে ইন্সুরেন্সও শেষ হয়ে গেছে। যাই নষ্ট হচ্ছে, সবই মেরামত করতে ১০০% খরচ আমাকেই পে করতে হচ্ছে। ১০ বছরের মধ্যেও অনেক কিছু মেরামত করতে হয়েছে তবে তার বেশির ভাগ ইন্সুরেন্স কভার করেছে।

বছরে দুইবার গাড়ির সার্ভিস করতে হয় কারণ গাড়িটি (eco car) এবং ইথানল (ethanol) জ্বালানির সাহায্যে চলে। পৃথিবীর জলবায়ুর সমস্যার কারণে কিছুটা বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এর পেছনে। সুইডেনে দুধ, আলুর মত মৌলিক চাহিদাগুলোর দাম সচরচার সরকার বৃদ্ধি করে না। তবে বিলাসবহুল জিনিসপত্রের ওপর প্রচুর টাক্স ধার্য করে।

যাইহোক আমার গাড়ির একটি কার্পেট নষ্ট হয়েছে। রাবারের তৈরি কার্পেট যার ওপর পা রাখা হয়। চালকের বসার ছিটের নিচের কার্পেটটাই সব সময় নষ্ট হয়ে থাকে। কারণ গাড়ি চালাতে আর কেও না থাকুন চালক সব সময় থাকেই।

আমি ভলভোর (Volvo) দোকানে গিয়ে বললাম আমার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নং এবং একটি কার্পেটের দরকার। কর্মচারী চেক করে বললো আছে তবে আমাকে চারটিই এক সঙ্গে কিনতে হবে। আমি বললাম আমারতো মাত্র একটি নষ্ট হয়েছে বাকিগুলো ভালো।

বললো আমরা একটি বিক্রি করিনা তোমাকে চারটেই কিনতে হবে। বললাম বিশ্বজলবায়ুর সমস্যা তারপর সুইডেনের স্টকহোমে দেখেছো কোনদিন বা শুনেছো তুষার বিহীন ফেব্রুয়ারি মাস, গত এক হাজার বছরে এমনটি? বললো না,

বললাম তারপরও কি তুমি মনে কর আমি চারটি কার্পেট কিনে একটি কাজে লাগিয়ে বাকি গুলো গার্বেজে ফেলে দেব? মেয়েটি পড়েছে বিপদে, ডেকে আনলো তার ম্যানেজারকে। সে শুরুতেই বললো আমাদের কাজ শুধু বিক্রি করা ভোলভোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা তাই করছি।

আমি বললাম অন্য গাড়ির কি অবস্থা, যেমন জাপান বা জার্মানি? বললো তাদের ব্রান্ডে সমস্যা নেই, যদি কেউ একটি কিনতে চায় কিনতে পারে। বিষয়টির ওপর আমার কৌতুহল আরও বেড়ে গেল। বললাম কোথায় কথা বলতে হবে যে আমাকে যুক্তি সঙ্গত উত্তর দিতে পারবে।

একটি টেলিফোন নং দিল, ফোন করে কোন ভালো ফলাফল পেলাম না। সরাসরি ফোন করলাম সুইডিশ কনজিউমার এজেন্সি (konsumentverket)তে। এটি সুইডিশ অর্থমন্ত্রনালয়ের অধীনে এবং বিশেষ করে ক্রেতাদের সুযোগ সুবিধার্থে পার্লামেন্টের পাশকরা আইনের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব এরা পালন করে। পার্লামেন্টের পাশকরা আইনানুসার ভলভোর পুরো সেট বিক্রি করার অনুমতি রয়েছে।

আমি বললাম কিন্তু বর্তমান জলবায়ুর ওপর সুইডেন যেভাবে কাজ করছে তার ওপর ভিত্তি করে কি এমন ধরনের আইন কার্যকর থাকতে পারে? সে আমার কথায় ডিজ এগ্রি না হলেও বেশ বিরক্তি বোধ করে বললো আমি আইন অনুসারে কাজ করি, যতদিন না নতুন আইন পাশ হয়ে আমার এখানে আসছে, আমার কিছু করার নেই।

তবে তুমি পার্লামেন্টে সরাসরি যোগাযোগ করতে পার। অথবা মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এবং জনমত তৈরি করে পার্লামেন্টে বিষয়টি জানাতে পার। ফোন করলাম সুইডিশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে।

তারা এমনটি এর আগে কখনও শোনেনি বিধায় সরাসরি খবর প্রকাশে নারাজ হলো, তবে ইমেল অ্যাড্রেস দিলো সুইডিশ টিভির একটি অনুষ্ঠানের, নাম টিভি প্লাস, সেখানে বিষয়টি লিখে জানানোর জন্য। সেখানে বিস্তারিত জানিয়ে ইমেল করেছি, একই সঙ্গে আমার লেখার কপি ভলভোর ম্যানেজমেন্টে পাঠিয়ে দিলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইমেল চেক করতেই নজরে পড়ল ইমেলের উত্তর। ভলভো আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে জানিয়েছে, তারা যদিও নিয়ম মেনে কাজ করছে, তবুও আমার ইমেল পড়ে বুঝতে পেরেছে বিষয়টির গুরুত্ব। সেক্ষেত্রে যত শীঘ্রই সম্ভব এর সমাধান করবে। সুইডিশ টেলিভিশন প্লাস এখনও যোগাযোগ করেনি, তবে আশাকরি করবে সত্বর।

এ বিষয়টি তুলে ধরার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন এখানে রেসপেক্ট ফর ইন্ডিভিজুয়াল বলে যে কথাটি রয়েছে তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। যদি ব্যক্তি বা সংগঠন দেখে যে তারা ভুল করেছে বা বিষয়টি সঠিক নয়, তৎক্ষনাৎ তার সমাধান করতে চেষ্টা করে। ভুলকে স্বীকার করে এবং তার সমাধান করে। সর্বোপরি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা যা নাগরিকের নায্য অধিকার তার প্রতিও রেসপেক্ট দেখায়।

এভাবেই একটি জাতি, দেশের গণতন্ত্রের ছায়ায় বসবাস করে। গণতন্ত্র মানে দেয়া এবং নেয়ার এক মিলনায়তন। সেটা যখন সুন্দরভাবে পরিচালিত হয় তখন জাতি তার দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে। একইসঙ্গে খোঁজে তার জন্মের স্বার্থকতা, নৈতিকতা এবং মনুষ্যত্ববোধ।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন