সন্তানরা চিনতে পারছিলেন না স্টেশনে পড়ে থাকা সেই শতবর্ষী মাকে!

প্রকাশিত: জানু ৩০, ২০২০ / ০১:৩২পূর্বাহ্ণ
সন্তানরা চিনতে পারছিলেন না স্টেশনে পড়ে থাকা সেই শতবর্ষী মাকে!

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার হওয়া সেই শতবর্ষী বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে গেছেন। মাকে অবহেলার কারণে প্রকাশ্য ক্ষমা চেয়েছেন সন্তান আবুল কাশেম।

পরিবারের সন্ধান পাওয়ায় তাদের হাতে তুলে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে সেই সন্তানই মাকে নিয়ে গেছেন নিজ বাড়িতে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আর পরিবারের অন্য সদস্যদের জিম্মায় দেয়া হয়েছে শতবর্ষী সেই বৃদ্ধা মাকে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে সন্তান আবুল কাশেমের বাড়িতে।

তিন মাস আগে নিখোঁজ মায়ের সন্ধানে এসে প্রথমে তাকে চিনতে পারেনি বলে দাবি সন্তান আবুল কাশেমের।

দুই মাস মাকে না দেখায় ঘটেছে এমন ভুল। আর তাই উপস্থিত সবার নিকট করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমি কাজের সূত্রে সপরিবারে ভারতে থাকি। ২০-২৫ দিন আগে এসে জানতে পারি মা নেই। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি কিন্তু পাইনি।

আবুল কাশেমের স্ত্রী রহিমা বেগম জানান, আমার ছোট দেবর আব্দুল হাই সিদ্দিক বেনাপোলের পোড়াবাড়ি নারায়ণপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন আমার শাশুড়ি। আড়াই-তিন মাস আগে সেখান থেকে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে সিদ্দিকের ছেলে বাসে উঠিয়ে দেয়। এরপর বাসের কন্ট্রাক্টর আমার শাশুড়িকে ঝিকরগাছায় না নামিয়ে যশোর নিয়ে যায়। সেখান থেকেই তিনি ট্রেনে উঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে চলে আসেন।

শতবর্ষী বৃদ্ধা ছেলে আর ছেলের বৌকে পাওয়ার অনেক উচ্ছ্বসিত দেখা গেছে। এ সময় তিনি শুধু তার বৌমার নিকট থেকেই ক্ষীর (মিষ্টান্ন) গ্রহণ করছিলেন। অন্য কেউ তাকে খাবার দিতে গেলে তাকে বাঁধা দিয়ে তিনি সরিয়ে দিচ্ছিলেন।

বৃদ্ধাকে দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা রহনপুর পৌর মেয়র তারিক আহমেদ জানান, কয়েকদিন থেকে ওই বৃদ্ধা মা পাকশী, কোটচাঁদপুর, কালিগঞ্জ, যশোর, খুলনা এ সব কথা বলছিলেন। এ ছাড়া মাঝে মধ্যে রহিমা এবং কাশেম বলেও ডাকছিলেন। সেই সূত্র ধরে আমি সেখানকার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিষয়টি জানাই।

এ ছাড়া ডিসি ও এসপিকে বিষয়টি অবহিত করি। এরপর সেই সূত্রে ধরে আবুল কাশেম এখানে আসে। একপর্যায়ে সে এই বৃদ্ধা তার মা নয় বলে দাবি করলে আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের আসতে বলি। এরপর তারা এসেই একনজর দেখার পরই নিশ্চিত করেন ইনিই রাহেলা বেগম এবং আবুল কাশেমের মা।

সঙ্গে আসা নাভারণ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিল্লাল হোসেন ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দীন জানান, ইনিই আবুল কাশেমের মা। অন্য দুই ভাই বিষয়টি শোনার পরও তারা তার মাকে দেখতে আসেননি। আমরা এখন তাকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে যতটুকু সম্ভব আমরা দেখাশোনা করব। যাতে এই বৃদ্ধার কোনো সমস্যা না হয়।

এ দিকে রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মৃতপ্রায় বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায় মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই পুলিশ সদস্য। আর নিঃস্বার্থ আন্তরিক সেবা দিয়ে বৃদ্ধার মন জয় করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম আর মালতি বেগম।

পুলিশের এসআই তৌহিদুল ইসলাম ও পুলিশ সদস্য নূরনবী জানান, খবর পাওয়ার পর আমরা শতবর্ষী বৃদ্ধাকে রেলওয়ে স্টেশন থেকে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করি। প্রচণ্ড শীতে খোলা জায়গায় থাকার কারণে তার শারীরিক অবস্থা খুব নাজুক ছিল। এ সময় তার শরীরে মল-মূত্র গেলে ছিল। তারপরও নিজের মা মনে করেই আমরা তাকে নিয়ে আসি।

আর এই কয়দিন সেবারত মালতি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই কয়দিনে তার প্রতি মায়া জন্মে গেছে। তিনি চলে যাওয়ায় আমার খুব খারাপ লাগছে। তবে তিনি যদি সন্তানদের কাছে গিয়ে ভালো থাকেন তাহলে আমি খুশি।

গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি শতবর্ষী বৃদ্ধা নিবিড় পরিচর্যা আর চিকিৎসা সেবায় এখন অনেকটাই সুস্থ্য বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাসরিন বেগম।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বৃদ্ধা মার পরিবার খুঁজে পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের সদস্যদের অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তাদের নিকট হস্তান্তর করেছি।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন