নারী সার্জেন্টরা পড়ছেন বিব্রতকর সমস্যায়

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে এখন নারীর পদচারণ সবখানে। সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের মতো কাজেও তাদের অংশগ্রহণ নিয়মিত হয়ে উঠেছে। খোলা আকাশের নিচে হাজারো গাড়িঘোড়ার শৃঙ্খলা সমলাতে নারী সার্জেন্টরা কতটা পারবেন, এ নিয়ে শুরুতে সংশয় ছিল। তবে তা উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের তারা প্রমাণ করেছেন নিষ্ঠাবান, দক্ষ আর মানবিক হিসেবে। কিন্তু এই উন্মুক্ত কর্মক্ষেত্রে নিজের বাহিনী তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে পারছে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে সড়কে আট ঘণ্টা টানা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি নারী সার্জেন্টদের জন্য। ফলে প্রতিদিন বিড়ম্বনায় পড়ছেন তারা। পুরুষকর্মীরা আশপাশের মসজিদ বা মার্কেটে যেতে পারলেও নারী সার্জেন্টদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বারবার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানালেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দুই শিফটে পুরুষ পুলিশের পাশাপাশি কাজ করেন নারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। রাত ১১টার পর তাদের দায়িত্ব দেয়া হয় না সচরাচর।

নারী সার্জেন্টরা বলছেন, আট ঘণ্টা কাজ করতে গিয়ে দু-তিনবার টয়লেটে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ট্রাফিক পয়েন্টে কোনো টয়লেট নেই। প্রাকৃতিক কাজটি সারতে আশপাশের বাসের কাউন্টার, সরকারি অফিস, বড় বিপণিবিতান বা বাসাবাড়ির দারোয়ানের টয়লেটে যেতে হয়। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে ঢুকতে হয় অনুনয়-বিনয় করে।

রাজধানীর শ্যামলী শিশুমেলার মোড়ে কথা হয় কর্তব্যরত নারী সার্জেন্ট লিমা চিশিমের সঙ্গে। ময়মনসিংহের এই নারী ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০১৫ সালে যোগ দেন সার্জেন্ট হিসেবে। প্রশিক্ষণ শেষে কাজ শুরু করেন ডিএমপিতে। দেশের নারী সার্জেন্ট হিসেবে প্রথম ব্যাচের সদস্য তিনি। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানালেন এই পেশায় আসার ইচ্ছা আগে থেকে ছিল না তার।

তবু এলেন। লিমা চিশিম বলেন, ‘মা সব সময় ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহ দেন। বাবা তো আছেনই। রাস্তায় নারী হিসেবে কখনো কোনো প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয়নি। বরং মনে হয়, আমরা আরও ভালো কাজ করি। গাড়ির চালক বা মালিকরা কখনো খারাপ ব্যবহার করে না।’ বরং অনেকে আইন ভেঙে কিছু করলে তখন তার কাছে এসে অনুতপ্ত হয়। এমন আর হবে না প্রতিশ্রুতি দেয়। এটা খুব ভালো লাগে তার।

নারী হিসেবে এই কঠোর কাজটি করতে গিয়ে প্রথম প্রথম একটু দুরূহ মনে হতো। ধীরে ধীরে সবকিছু রপ্ত হয়ে গেছে। বলেন, ‘পরিশ্রমও সয়ে গেছে শরীর। সিনিয়র অফিসাররা সব সময় সাহায্য করেন। আর ঊর্র্ধ্বতনদের কাছ থেকে সব সময় নারী হিসেবে উৎসাহ পাই।’

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করতে যতটা না কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশি বিব্রত বোধ করেন টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে। লিমা চিশিম বলেন, ‘রাস্তায় দাঁড়িয়ে সারা দিন ডিউটি করতে হয় বলে ধুলাবালির কারণে প্রায় সময় সর্দিকাশি লাগে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের। এটা এখন স্বাভাবিক হয়ে হয়ে গেছে তাদের জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা পুলিশ বক্সগুলোতে টয়লেট নেই। বিশেষ করে নারী সদস্যদের জন্য এটা মহা বিড়ম্বনার। আজ একজনের টয়লেটে কাল আরেকজনের টয়লেটে যেতে হয় প্রয়োজন সারার জন্য। যত অসুবিধা থাকুক, এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হয়।’

পুলিশ বাহিনীতে নারী সার্জেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৪ সালে। সবশেষ সার্জেন্ট পদে নিয়োগের পরীক্ষায় অংশ নেন এক হাজার ৮৩৭ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৪৬ জন। নিয়োগ পান ২৮ জন। রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে হাইওয়ে পুলিশ, রাজশাহী; রংপুর ও খুলনা মেট্রোতে দুজন করে নারী দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ২২ জন নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশে।

সোহরাওয়ার্র্দী হাসপাতালের সামনের পুলিশ বক্সে কথা হয় সার্জেন্ট ইসমত তারার সঙ্গে। দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে বাহিনীতে যোগ দিয়ে এখন মোহাম্মদপুরে জোনে কর্মরত। তিনিও নারী ট্রাফিক সার্জেন্টের প্রথম ব্যাচের সদস্য। রাস্তায় ডিউটি করতে প্রথম দিকে অসুবিধা হলেও পরে সেটা সয়ে গেছে।

তবে টয়লেটের সমস্যাটি ভোগায় ইসমতকে। বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। দায়িত্ব পালনের জন্য সুবিধা হতো। সমস্যাটি আমাদের মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। স্যাররা বলেছেন, তারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।’

রমনা থানা, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের বুথগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আছে কমই। কোনোটাতে নেই ফ্যান-লাইট পর্যন্ত। প্রচণ্ড দাবদাহ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠতে হয় তাদের।

একজন সার্জেন্ট বলেন, ‘প্রথম তিন-চার মাস লজ্জায় টয়লেট ব্যবহার না করেই অনেক কষ্টে ডিউটি করেছি। পরে অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অফিস বা মার্কেটে যাওয়া শুরু করি এরপর। তবে শুক্র ও শনিবার অফিস ভবন বন্ধ থাকলে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।’

‘অনেক সময় সিকিউরিটি গার্ডদের সহযোগিতা নিয়ে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। আবার মাসের নির্ধারিত কয়েকটি দিন ঋতু চলাকালে মার্কেট কিংবা অন্য কোনো অফিসের টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে খুবই লজ্জায় পড়তে হয়। এসব কারণে নারী পুলিশের জন্য অবশ্যই নির্ধারিত টয়লেট থাকা দরকার।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। তবে আমাদের যেসব পুলিশ বক্স আছে সেগুলো রাস্তার পাশে এবং সিটি করপোরেশনের জায়গায় তৈরি। তাছাড়া বক্সগুলোতে বাথরুম তৈরির মতো জায়গা নেই। আবার বাথরুম তৈরি করলে সেটার আবর্জনা, পানি ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিষয় রয়েছে। এখন নারী সদস্যদের ডিউটি দেয়া হয় আশপাশে থানা ও সরকারি অফিস আছে, এমন জায়গা দেখে।’ ট্রাফিক পুলিশের সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত