প্রণোদনা দেয়া জরুরি সুতার মিলে

প্রকাশিত: জানু ১৬, ২০২০ / ০২:০৩পূর্বাহ্ণ
প্রণোদনা দেয়া জরুরি সুতার মিলে

সরকার সম্প্রতি কাপড়ের মিলের জন্য ১ শতাংশ প্রণোদনা প্রদানে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও সুতার মিলকে এর বাইরে রেখেছে। অথচ সুতা বা স্পিনিং মিলে বিনিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

এছাড়া বর্তমানে নানা কারণে বড় ধরনের ঝুঁ’কির মধ্যে রয়েছে দেশের অগ্রসরমান এই খাত। বিশেষ করে দেশে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা কাঁচামালে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নে সুতার মিলের কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু নানা রকম ষ’ড়’য’ন্ত্রের কারণে এই খাত এখন সবচেয়ে বেশি হু’ম’কির মুখে। লাখ লাখ টন সুতা অবিক্রীত অবস্থায় গোডাউনে পড়ে আছে।

সং’ক’ট উত্তরণে এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, অবশ্যই কাপড় মিলের জন্য প্রণোদনা প্রয়োজন; কিন্তু প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সুতার মিলের জন্য বেশি পরিমাণে প্রণোদনা দেয়া খুবই জরুরি বিষয়।

অথচ সরকারের পলিসি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা বেমালুম বিষয়টি চেপে গেছেন। তারা বলেন, এই সাধারণ বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য নীতিনির্ধারক মহলের সুতার মিলের মালিক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বস্ত্র খাতের বিদ্যমান বাস্তব অবস্থা সঠিকভাবে পর্যালোচনা করলেই এটি সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। তারা আশা করছেন, দেশে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার নিশ্চয় শিগগির সুতার মিলের জন্য গ্রহণযোগ্য পরিমাণে প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দেবে।

পাশাপাশি শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় দেশে আসা সুতা যাতে কালোবাজারে বিক্রি হতে না পারে তা শক্তভাবে প্রতিহত করা। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদিত সুতার স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর পলিসি প্রণয়নে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, প্রণোদনা না দেয়া হলে দেশের সুতার মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তাদের প্রাইমারি টেক্সটাইলকে এগিয়ে নিতে ৫০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে।

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত বাংলাদেশে তাদের বাজার সম্প্রসারণ করবে। সঙ্গতকারণে বাংলাদেশ সরকার এখনই দেশীয় মিলগুলোকে প্রণোদনা না দিলে বা ব্যবস্থা না নিলে লাখ-কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।

প্রসঙ্গত, ৭ জানুয়ারি বস্ত্র খাতে রফতানিতে ১ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তার সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে টেরিটাওয়াল ও স্পেশালাইজ টেক্সটাইলকে সহায়তা দেয়ার কথা বলা হলেও সুতার মিল বা প্রাইমারি টেক্সটাইলকে রাখা হয়নি। এ কারণে সুতার মিল মালিকরা সংক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, তৈরি পোশাকের মতো সুতার মিলকেও সহায়তা দেয়া হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে ৪০০টি সুতার মিল রয়েছে। এসব মিলে অবিক্রীত অবস্থায় ৮ লাখ টনেরও বেশি সুতা পড়ে আছে। এর মূল কারণ- সুতার মিলের জন্য সরকারের ভুল নীতি গ্রহণ।

গার্মেন্ট মালিকদের তৈরি পোশাক রফতানির জন্য বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যার কিছু অংশ ব্যবহার করে গার্মেন্ট মালিকরা বাকিটা খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এ কারণে দেশীয় সুতার মিলগুলোয় সুতা অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ও বন্দর অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে উৎপাদিত সুতার উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। এর চেয়ে কম দামে বিদেশ থেকে সুতা চোরাই পথে দেশে প্রবেশ করছে। দাম কম হওয়ায় চোরাই সুতার কাছে দেশীয় সুতা মার খাচ্ছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে পৃথিবীর যেসব দেশ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, এর পেছনে সেসব দেশের সরকারের অবদান রয়েছে। কোনো দেশেই সরকারের নীতি-সহায়তা ছাড়া ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠতে পারেনি।

উপরন্তু ভারত-চীন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে। তারা বলেন, সরকার যদি মনে করে, উল্লিখিত দেশের মতো এখানেও বস্ত্র খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলবে, তাহলে সর্বাগ্রে সুতার মিলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাকওয়ার্ড শিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি বানাতে হবে। তারা বলছেন, বলতে গেলে মাটি, পানি ও বায়ু ছাড়া দেশের উদ্যোক্তাদের কাছে কিছু নেই। শিল্পের সব কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। এছাড়া সুতার মিলের মূল কাঁচামাল তুলা।

তাই মানসম্পন্ন এই তুলা উৎপাদন বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে নীতি গ্রহণ করলে হবে না, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। যেমন দেশে তুলা উন্নয়ন বোর্ড থাকলেও তুলা উৎপাদনে কী ভূমিকা রাখছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

তারা বলছেন, উৎপাদন খরচের কারণে বিদেশি সুতার চেয়ে দেশি সুতার দাম অপেক্ষাকৃত একটু বেশি। সরকার যদি দেশি সুতার মিলে ভর্তুকি ও নীতি-সহায়তা দেয়, তাহলে অর্থনীতিতে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ বস্ত্র খাতের সঙ্গে সাব-সেক্টর হিসেবে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অনেক কিছু জড়িত। তাই এই খাতে সরকার ভর্তুকি দিলে তার কয়েকশ’ গুণ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ফিরে আসবে।

এ কারণে বর্তমানে সুতার মিলগুলোকে রুগ্ণ দশা থেকে বাঁচাতে সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে বাজার সৃষ্টিতে সহায়তা করা। এজন্য আইন করে হলেও গার্মেন্ট মালিকদের দেশীয় সুতা কিনতে বাধ্য করতে হবে।

প্রয়োজনে দেশীয় সুতা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি বন্ডের সুতা বাইরে বিক্রি বন্ধ এবং প্রাইমারি টেক্সটাইলকেও তৈরি পোশাকের মতো নগদ সহায়তা দিতে হবে।

সরকার সুতার মিলের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিলে একসময় দেশে বিদেশি সুতা আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। তখন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে ব্যাপক হারে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

এসব যৌক্তিক কারণে উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সুতার মিলে সরকারকে প্রণোদনা দেয়া খুবই জরুরি। এজন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তাদের মতে, শুধু বড়লোক হওয়ার জন্য শিল্পপতিরা শিল্প স্থাপন করেন না। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে শিল্পপতিদের বড় ভূমিকা রয়েছে। এজন্য বেসরকারি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

জানতে চাইলে মালেক স্পিনিংয়ের ব্যবস্থাপনা ও বিটিএমএ’র সাবেক সভাপতি পরিচালক মতিন চৌধুরী বলেন, এখন শিল্পের যে অবস্থা, তাতে সরকারের প্রণোদনা ছাড়া টিকে থাকা কষ্টসাধ্য। প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের শিল্পের স্বার্থে ডলারের অবমূল্যায়নসহ নানা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় বস্ত্র খাতের মতো সুতার মিলেও এফওবি মূল্যের ১ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হলে এই শিল্পের জন্য বড় সাপোর্ট হবে।

ফুয়াদ স্পিনিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিটিএমএ’র প্রথম সহসভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, শিল্পের স্বার্থে সরকারের প্রণোদনা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সুতার বিক্রি কমে গেছে। তাই সরকার সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো টিকে থাকতে পারবে না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুতা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। বন্ড সুবিধায় আনা ভারতীয় সুতা বিক্রি হয় ২ ডলার ৩০ সেন্টে। বাস্তবে এসব সুতা আনতে এলসি খোলা হয় ৩ ডলারের বেশি।

এভাবে একটি চক্র বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করে আসছে। অন্যদিকে বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি সুতার দাম আড়াই ডলার। যদিও এ দরে বিক্রি করে অনেকে খরচ তুলতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে ৬ মাসের সুতা আমদানির তথ্য যাচাই-বাছাই করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন