ভুল স্বীকার করলেন ওবায়দুল কাদের

প্রকাশিত: জানু ৪, ২০২০ / ০৪:২০অপরাহ্ণ
ভুল স্বীকার করলেন ওবায়দুল কাদের

সরকারের বিভিন্ন কৌশলে ভুল আছে স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভুল-ভ্রান্তি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। আজ শনিবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের জোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি-জেপির ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

দেশের গণতন্ত্র বা সার্বিক উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য বলে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের পক্ষে বিএনপির সঙ্গে সুষ্ঠু কর্মসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। আর কারণ হিসেবে কাদের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড আর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাকে দায়ী করেন। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বিএনপিকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়ে উদারতা দেখিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের ভুল আছে। আমরা অভ্রান্ত, এটা আমি দাবি করব না। চলার পথে কৌশলের ভুল আছে, আমাদের কর্মেও ভুল আছে। আমরা অভ্রান্ত নই। অভ্রান্ত দাবি করা সঠিক নয়। ভুল-ত্রুটি মিলিয়ে আমরা বাংলাদেশেকে আজকে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা কোথায় নিয়ে গেছেন। আজকে আইএমএফ সর্বশেষ বলছে, আজকে বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধিতে নাম্বার ওয়ান।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আজকে সামাজিক অনুষ্ঠানেও কে, কী মনে করে, কারো মৃত্যুর পর জানাজায় যাব কি না; এই দ্বিধাও আমাদের মাথায় কাজ করে। এসব বিষয় রাজনীতির জন্য শুভ নয়। এই কনফ্রেনটেশনাল পলিটিক্স গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। গণতন্ত্র এক চাকার বাইসাইকেল নয়, গণতন্ত্র দুই চাকার বাইসাইকেল। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলও গণতন্ত্রের বিকাশে অপরিহার্য শক্তি। বিরোধীদলকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে বিরোধী দলকেও শক্তিশালী করতে হবে। শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র কল্পনাও করা যায় না। এটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। যা আমরা বিশ্বাস করি তা পালন করি না। এটাও বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক বাস্তবতা।’

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর খারাপ সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজকে একটা অলঙ্ঘনীয় দেয়াল উঁচু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দেয়াল আমাদের কর্ম সম্পর্কের পথে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বাধা হয়ে ‌দাঁড়িয়েছে। এই দেয়ালের সৃষ্টি করেছে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা ছিল ইতিহাস থেকে তাদের সেই ভূমিকাকে বাদ দিয়ে ইতিহাস লেখার উপায় নেই।’

‘সেদিন কারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছিল? নিরাপদে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল? বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল? কারা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিচারের পথ রুদ্ধ করেছিল? কারা পঞ্চদশ সংশোধনীতে এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে সংযুক্ত করে আইনে পরিণত করেছিল যাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার খুনিদের বিচার না হয়। ইতিহাস তাদের ভুলে যাবে না।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সম্পর্কের এই অলঙ্ঘনীয় দেয়াল সেখান থেকেই উঁচু হয়েছে। সেই দেয়াল উঁচু হতে হতে আরো উঁচু হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রাইম টার্গেট শেখ হাসিনা। তাঁকে প্রাইম টার্গেট করে যে গ্রেনেড হামলা পরিচালনা করা হয়েছিল সেই ইতিহাস বেশিদিন আগের নয়। কারা তখন ক্ষমতায়, কারা প্লানার, কারা

মাস্টারমাইন্ড সবাই জানে। ইতিহাসের এই নির্মম অসত্য অস্বীকার করা উপায় নেই।’

‘তারপরও এই অলঙ্ঘনীয় দেয়াল কীভাবে ভাঙব? আমাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। এত কিছুর পরও বেগম জিয়ার সন্তানের মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা তাঁর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন সন্তানহারা মাকে সান্ত্বনা দিতে। ঘরের দরজা, বাইরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার মুখের পর এই অলঙ্ঘনীয় দেয়াল আরো উঁচুতে উঠল। সেদিন যদি শেখ হাসিনা শোকাতুর মাকে সান্ত্বনা দিতে সেই গৃহে প্রবেশ করতে পারতেন, রাজনীতিতে কর্ম সম্পর্কের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে পারত।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘২০১৪ সালের আগে এত কিছুর পরও শেখ হাসিনা গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বেগম জিয়াকে। তিনি ঘৃণাভরে গালাগাল করে যে ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন আপনার কি তা শোনেননি? টেলিফোনের আলাপে এত অশ্রাব্য ভাষা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উচ্চারণ, কী করে এখানে কর্ম সম্পর্ক গড়ে উঠবে? কীভাবে আমরা বিএনপির সঙ্গে সহাবস্থান করব? কী করে সম্ভব? তারা ১৫ আগস্টের হত্যার নেপথ্যে ছিল, তারা একুশে আগস্ট হত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিল। এই অবস্থা হলো বাস্তবতা।’

‘তারপরও গত নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বিএনপিসহ তাদের অনেককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সংলাপের ডাক দিয়েছিলেন।’

রাজনীতিতে অস্থিতিশালতা সৃষ্টি করার চক্রান্ত চলছে দাবি করে ১৪ দলের

নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ আছে। রক্তের গন্ধ আছে। আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা একসঙ্গে কাজ করব। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

৯৬ সালে সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের পাশে থেকে সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় পার্টি-জেপি ও দলটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান ওবায়দুল কাদের। এ সময় তাঁর বাবা প্রখ্যাত সাংবাদিক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ারও স্মৃতিচারনা করেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া প্রমুখ।

সূত্র : যুগান্তর, এনটিভি

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন