সাঈদ খোকন যেসব কারণে মনোনয়নবঞ্চিত হলেন

প্রকাশিত: ডিসে ৩০, ২০১৯ / ০১:৪৫পূর্বাহ্ণ
সাঈদ খোকন যেসব কারণে মনোনয়নবঞ্চিত হলেন

দলীয় মনোনয়ন কিনতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সবাইকে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের ‘কঠিন’ সময়ে তিনি দলকেই পাশে পেলেন না।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন সাঈদ খোকন। তার পরিবর্তে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

পুনরায় দলের মনোনয়ন না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সাঈদ খোকন রোববার সন্ধ্যায় টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

দলীয় প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস আপনার সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছেন, করবেন কিনা- এমন প্রশ্নেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন সাঈদ খোকন। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘আজকে রাজনীতিতে আমার জন্য একটু কঠিন সময় যাচ্ছে। এ কঠিন সময়ে প্রিয় দেশবাসী, ঢাকাবাসী আমার জন্য দোয়া করবেন।’

সেদিন দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে আশাবাদের কথা জানিয়ে তিনি মেয়র হিসেবে বাকি কাজ শেষ করতে আরও সময় চান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার হাতে আর নৌকার হাল দেয়নি আওয়ামী লীগ।

এবার সাঈদ খোকনের দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্টরা বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকাবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতা, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারা, দলীয় কাউন্সিলরদের মূল্যায়ন না করা, কর্পোরেশনের ঠিকাদারি কাজ নিজের লোকদের দিয়ে করানো, হকার উচ্ছেদ নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ও ব্যর্থতা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা না বাড়ানো এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অপ্রত্যাশিত বক্তব্য আর তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা।

এসব কারণ তাকে মনোনয়ন বোর্ডের নজর থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দলের সঙ্গে দূরত্ব এবং সিন্ডিকেট তৈরি করারও অভিযোগ উঠেছিল। এসব কারণে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলও ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে সাঈদ খোকন দাবি করেছেন, কর্তব্যে তিনি কখনও অবহেলা করেননি।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন সাঈদ খোকনের বাবা মোহাম্মদ হানিফ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হানিফ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন সভাপতি ছিলেন। বাবা হানিফের হাত ধরে সাঈদ খোকন রাজনীতিতে আসেন।

১৯৮৭ সালে ওয়ার্ড শাখার আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নাম লেখান। ১৯৯৯ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগে তিনি যোগ দেন। ২০০৪ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি মনোনীত হন।

সর্বশেষ তিনি মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। ‘যোগ্য পিতার’ উত্তরসূরি হিসেবে খোকন গত ডিএসসিসি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর ঢাকাবাসীও তার ওপর আস্থা রাখে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ৬ মে মেয়র হিসেবে তিনি শপথ নেন।

সিটি নির্বাচনের আগে সাঈন খোকন নগরবাসীকে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে ছিল- নাগরিকদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত করা, বুড়িগঙ্গা স্বরূপে ফিরিয়ে আনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা, ডিজিটাল নগরী প্রতিস্থাপন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, মাঠ ও পার্ক উদ্ধার, বস্তি উন্নয়ন ও যানজটমুক্ত ঢাকা গড়া।

কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটাই পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে রিকশা উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েও তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

এছাড়া মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাঈদ খোকন শুরু থেকে নানা বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেন। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর আজিমপুরে আওয়ামী লীগের কর্মী সমাবেশের পাশে পাল্টা কর্মসূচি দেন খোকন। এমনকি ওই সমাবেশস্থলের সামনে ট্রাকে করে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা ফেলা হয়।

এ ঘটনায় খোকনকেই দোষারোপ করা হয়। এ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব দলীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একাধিকবার তাদের দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ নেন। চলতি বছর রাজধানীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ ব্যর্থতার দায়ভার মেয়র হিসেবে খোকনের ওপরই পড়ে। এরই মধ্যে ২৫ জুলাই এক অনুষ্ঠানে খোকন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাকে ‘গুজব’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘মশা নিয়ে রাজনীতি কাম্য নয়। সাড়ে তিন লাখ আক্রান্তের যে তথ্য এসেছে সেটি কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিমূলক। ছেলেধরা, সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা।’ তার এমন বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দলের ভেতরে সমালোচনা ঝড় ওঠে। দাবি ওঠে তার পদত্যাগেরও।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে, যা দলের ইমেজ নষ্ট করেছে। দলীয় রাজনীতিতেও কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন তিনি। নগর আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তার ওপর ক্ষুব্ধ।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আওয়ামী লীগের দলীয় কাউন্সিলরদেরও বড় একটা অংশকে তিনি কোণঠাসা করে রেখেছেন। ফলে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে তার পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো কঠিন হয়ে পড়ত। মূলত এসব কারণেই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়নি।

দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জনগণের কাছে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কোন প্রার্থী নির্বাচনে জেতার উপযোগী, সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।’

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন