রওশন এরশাদ হচ্ছেন জাতীয় পার্টির ‘চিফ প্যাট্রন’

প্রকাশিত: ডিসে ২৭, ২০১৯ / ০৯:৪০অপরাহ্ণ
রওশন এরশাদ হচ্ছেন জাতীয় পার্টির ‘চিফ প্যাট্রন’

বর্তমানে জাতীয় পার্টির ‘সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান’ পদে থাকা বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের দলটিতে নতুন পদের নাম হবে ‘চিফ প্যাট্রন’ (প্রধান পৃষ্ঠপোষক)। আর পার্টি চেয়ারম্যান পদে এরশাদের ছোট ভাই জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদেরই বহাল থাকছেন।

জাতীয় পার্টির নবম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগের দিন শুক্রবার দলের প্রেসিডিয়ামের বৈঠক শেষে মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান।

তিনি বলেন, ‘এবারের মূল পরিবর্তন হচ্ছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিনী রওশন এরশাদ ‘চিফ প্যাট্রন’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দলে উনার সম্মান থাকবে সর্বোচ্চ। মিটিং বা সাধারণ সভা- সবখানেই উনার এই সর্বোচ্চ সম্মানটা থাকবে’।

সে ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান আর চিফ প্যাট্রন পদের মধ্যে মর্যাদার ভারসাম্য কীভাবে হবে? জবাবে মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘দলের সর্বক্ষেত্রে রওশন এরশাদের অবস্থান দলের চেয়ারম্যানের ঊর্ধ্বে থাকবে, এটা মাননীয় চেয়ারম্যান বলেছেন’।

গত ২০১৬ সালে মার্চে পার্টির অষ্টম কাউন্সিলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কো-চেয়ারম্যানের পদ তৈরি করে তাতে ভাই জিএম কাদেরকে আসীন করেন। স্ত্রী রওশন এরশাদ তাতে ক্ষিপ্ত হলে পরে তার জন্য এরশাদ তৈরি করেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানের পদ।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চলতি বছরের ৫ মে তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পরে ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এরশাদ।

এর চার দিনের মাথায় বনানীতে পার্টি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করেন।

তার পাল্টায় রওশনপন্থীরা পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভি’যোগ আনার কথা বলে।

পরে দুই পক্ষের সমঝোতা হলে ৮ সেপ্টেম্বর আরেক সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গা জানান, জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন। আর রওশন এরশাদ হবেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।

দলের মহাসচিব রাঙ্গা ব্রিফিংয়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় চেয়ারম্যানের কাছে দলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকবে। যত মিটিং হবে, তা তিনি প্রিসাইড করবেন। তবে যেহেতু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী এখনও জীবিত, তাই তিনি যতদিন জীবিত রয়েছেন, তিনি চিফ প্যাট্রন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন’।

জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/ক উপধারায় দলের চেয়ারম্যানকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। সেই ধারা রদ বা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার কথা এর আগে জিএম কাদের বললেও রাঙ্গা জানান, নবম কাউন্সিলে তা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রের ২০/ক-এর উপধারা প্রয়োগের আগে চেয়ারম্যান দলের কো-চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন।

রাঙ্গা বলেন, ‘জাতীয় পার্টি একক সিদ্ধান্তে দল চলে না। এখন থেকে দলের সিদ্ধান্ত এককভাবে কেউ দেবে না। দলের প্রেসিডিয়াম ও দলের কো-চেয়ারম্যান যারা আছেন, সবাই মিলে দলের সিদ্ধান্ত দেবেন। মাননীয় চেয়ারম্যানও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে চান না’।

রওশন এরশাদের নতুন পদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরও বাড়াবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কোনো কন্ট্রাডিকশন হবে না। চিফ প্যাট্রন, চেয়ারম্যান ও মহাসচিব মিলে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন’।

পার্টির গঠনতন্ত্রে আরও অনেক ধারায় পরিবর্তন আসতে পারে জানিয়ে রাঙ্গা বলেন, ‘প্রেসিডিয়ামের সভায় দলের নেতারা পরিবর্তনের দাবি এনেছেন। পরে পরিবর্তন, সংযোজন, পরিবর্ধনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চেয়ারম্যানকে’।

জাতীয় পার্টিতে এখন ৪১ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য রয়েছেন। বৈঠকে এই সংখ্যা কমিয়ে আনার পক্ষে মত এসেছে বলে জানান রাঙ্গা। তিনি বলেন, প্রেসিডিয়ামে সদস্য সংখ্যা কমবে না বাড়বে সে সিদ্ধান্ত শনিবার দলের নবম কাউন্সিলের পর নেবে জাতীয় পার্টি।

তবে কাউন্সিলে ‘চার-পাঁচজনকে’ দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যানের পদে আনা হতে পারে।

জাতীয় পার্টির বেশক’টি সহযোগী সংগঠন কাউন্সিলে অঙ্গ-সংগঠনের স্বীকৃতি পাবে বলেও জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব। শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের বাইরে খোলা জায়গায় হবে দলটির কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

দুপুরে মিলনায়তনের ভেতরে হবে ভোটাভুটি। জাতীয় পার্টির কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের মৌখিক ভোটে চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নেতা নির্বাচন করা হবে। জাপার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সভাপতিত্বে পার্টি চেয়ারম্যানের বনানীস্থ কার্যালয় মিলনায়তনে পার্টির প্রেসিডিয়ামের জরুরি সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জাতীয় পার্টির নবম জাতীয় কাউন্সিলে উপস্থাপনের জন্য পার্টির গঠনতন্ত্রের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

গঠনতন্ত্র সংশোধন উপ-কমিটির আহ্বায়ক সুনীল শুভরায় সংশোধনী প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এই উপ-কমিটিতে অপর ২ জন সদস্য ছিলেন- ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি এবং মো. রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া।

সংশোধনী প্রস্তাবের উপর বক্তব্য রাখেন- পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, অ্যাডভোকেট শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম এমপি, হাবিবুর রহমান, এসএম ফয়সল চিশতি, আজম খান, কাজী মামুনুর রশিদ, আলমগীর সিকদার লোটন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন- কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, মো. আবুল কাশেম, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সাহিদুর রহমান, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি,

সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা), মীর আব্দুস সবুর আসুদ, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, এটিইউ তাজ রহমান, সোলায়মান আলম শেঠ, নাসরিন জাহান রতনা এমপি, আবদুর রশীদ সরকার, মেজর (অব.) খালেদ আখতার,

মুজিবর রহমান সেন্টু, ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার, সফিকুল ইসলাম সেন্টু, লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, মো. মিজানুর রহমান, সৈয়দ দিদার বখ্ত, নাজমা আখতার এমপি,

আব্দুস সাত্তার মিয়া, এমরান হোসেন মিয়া, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল এমপি, লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি, সেলিম ওসমান এমপি। সভায় উপস্থিত সংশোধনী প্রস্তাবটি সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। জাতীয় সম্মেলনে পাস হলে সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হবে।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন