খেজুরের রস এক অমৃত সরবত

বেশ ঠাণ্ডা আজ, সকালে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পড়লাম, প্রথমে শহরে পরে শহরের বাইরে। কিছু কাজ সেরে ঘরে ঢুকেছি। টিভিতে নোবেল পুরষ্কার অনুষ্ঠান দেখছি।

হটাৎ বন্ধু নাজমুলের ফোন, সে থাকে লন্ডনে। স্বপরিবারে বাংলাদেশে বেড়াতে গেছে। প্রতিদিনই কথা হয় তবে দুইদিন সে যোগাযোগ করেনি। পরে জানলাম সে সিলেট ছিল আজ টাঙ্গাইলে ফিরেছে।

কথা শেষ করতেই ম্যাসেঞ্জারে একটি খবরের অংশ বিশেষ পাঠিয়েছে এক ছোট ভাই। তাতে লেখা যশোরের খেজুরের রস বিলীন হওয়ার পথে। খবরে বলছে প্রথমত গাছির অভাব, তারপর শীত খুব বেশি নয় এদিকে আকাশ মেঘলা যার কারণে খেজুরের রস পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এসব শোনার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ছোটবেলার কিছু স্মৃতি মনে পড়ছে তাই একটু স্মৃতি চারণ করতে ইচ্ছে জেগেছে। আমি যশোরের ছেলে, তারপর খেজুরের রস -খবরটি জানতে পেরে আমি বেশ উদ্বিগ্ন হয়েছি। ছোটবেলায় দেখেছি পৌষ এবং মাঘ মাসে আকাশ থাকত পরিষ্কার। তারপর কনকনে শীতে খেজুর গাছ কেটে রসের ভাড়ের মধ্যে চুন দিয়ে তাকে আগুনে পুড়িয়ে সেই ভাড় গাছে ঝুলিয়ে রাখত বিকেলে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে গাছি হাড়ি ভরা রস পেড়ে হয় বিক্রি করত বাজারে বা বাড়িতে নিয়ে লম্বা কড়াইতে (তাফাল) ঢেলে তা জ্বালদিয়ে তৈরি করতো গুড় বা পাটালি। কখনও ঝোল গুড়, কখনও শক্ত গুড় আবার কখনও বা রসপাটালি যা খেয়েছি সেই ছোটবেলায় গ্রামে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে খেজুরের রস খেয়েছি (পান করেছি), সেতো রস নয় যেন অমৃত। তারপর পৌষমাসে পিঠা তৈরি করা খেজুরের রস দিয়ে, যাকে রস পিঠা বা দুধ চিতয় পিঠা বলা হয়। এসব অমৃত খাবার পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যাবেনা শুধু বাংলাদেশ ছাড়া।

খেজুর গাছ রাস্তাঘাট বা মাঠের মধ্যে যেখানে সেখানে দেখেছি। কখনও সারি ধরে, কখনও এলোমেলোভাবে আবার কখনও একাকী। হয়ত অনেকে মনে করবে যে বিদেশে বহু বছরআছি তাই এসব কথা মনে পড়েছে? না, ছোটবেলায় খেজুর গাছ, তালগাছ, আমগাছ, জামগাছ, লিচুগাছ, বেলগাছ, কাঁঠালগাছ আরও কত গাছ এবং এসব গাছের ফল এবং রস খেয়েছি।

কখনও কিনে কখনও চুরি করে কখনও চেয়ে। গ্রামে জন্মগ্রহণ করার মাঝে মজা তখনই যখন তার সমস্তকিছু হৃদয় দিয়ে অনুভব করার সৌভাগ্য হয়।

বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম ইছামতী বিলের ধারে গ্রামের বাড়ি তার পর প্রাণপ্রিয় নবগঙ্গা নদী সঙ্গে খেজুর গাছ এবং তার রস, এ স্বাদ যারা জীবনে একবার পেয়েছে তাদের জন্ম ধন্য হয়েছে।

বহু বছর শীতের পিঠা খাওয়া হয়না, তবে জীবনের প্রথম ১৯ বছর ধরে খেয়েছি, যার স্বাদ এখনও উপলব্ধি করতে পারি।

আজ মনে পড়ে গেল একদিনের একটি ঘটনা। মা বললেন চার ভাড় রস আনতে আমার এক চাচার বাড়ি থেকে। কাল বাড়িতে শীতের পিঠা তৈরি হবে। সকালে উঠেই চলে গেলাম চাচার বাড়ি।

গাছিরা সাধারণত রসের ভাড় (ঠিলা) বাগের দুইপাশে ঝুলিয়ে বেশ হাঁটার তালে তালে দিব্যি তা বহন করে। আমার সখ হলো চাচার মত করে হাঁটার তালে রসের ভাড় বাগের দুই পাশে ঝুলিয়ে ঘাড়ে করে বাড়িতে আসব। জীবনে এর আগে বাগে ঝুলিয়ে ঘাড়ে করে এভাবে কিছু বহন করিনি তবে দেখেছি।

চাচা বার বার বলতে লাগলো বাবা তুমি কি পারবে এভাবে নিতে? বরং চলো আমি বাগে ঝুলিয়ে ঘাড়ে করে তোমাদের বাড়িতে দিয়ে আসি। আমি বললাম না চাচা অসুবিধে নেই আমি পারব।

বিসমিল্লাহ বলে রসের ঠিলাসহ বাগ ঘাড়ে তুললাম এবং ডান হাতটি বাগের সামনের দিকে রেখে দুই চার পা হাঁটতেই প্রথমে পিছনের দুটো পরে সামনের দুটো ঠিলা মাটিতে পড়ে গেলো। ফ্যাল ফ্যাল করে চাচার দিকে তাকাতে চাচা বললো অসুবিধে নেই রস আরও আছে, চলো আমি এবার নিয়ে বাগে করে রস তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যায়।

চাচা বুঝতে পেরেছিল সেদিন আমি খুবই লজ্জিত হয়েছিলাম। ভুলিনি সেদিনের সেই কথা। পরে মাঝে মধ্যে প্রাকটিস করেছি বাগ ঘাড়ে করে হাঁটু পানির মধ্য দিয়ে হাটতে, বাগের থেকে ঠিলা পড়েছে তবে ঠিলা ভাঙ্গেনি।

গাছে উঠে খেজুর গাছ কাটা এবং গাছে ভাড় বেঁধে ভাড় ভরা রস এনে তা দিয়ে গুড় এবং পাটালি তৈরি করা, শহরের প্রিয় বন্ধু বা বান্ধবীকে পৌষ মাসের পিঠে খেতে নিমন্ত্রণ করা, সে কি আনন্দের ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।

এসব ছিলো ছোটবেলার মধুর ঘটনা যা আজ শুধু স্মৃতি হয়ে হৃদয়ে ফুলের মালার মত গাঁথা রয়েছে।

এত মধুময় স্মৃতি জড়িত যে খেজুরের রসের ওপর আজ তা গাছির এবং গাছের অভাবে বিলীন হওয়ার পথে! এমন একটি সুন্দর কাজ কেউ করতে ইচ্ছুক নয় শুনে মনটা সত্যি খারাপ হয়েছে।

ভাবছি আমাদের নিজেদেরই তো অনেক জমি রয়েছে দেশে, সেখানে তো আর কিছু না হোক খেজুর গাছ অগত্যা লাগাতে পারি। কিছু না হলেও খেজুরের রস এবং যশোরের ঐতিহ্য ধরে রাখা যাবে।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত