স্বর্ণজয়ী অন্তরা পুরস্কারের টাকায় করাবেন মায়ের চিকিৎসা

পল্টনে দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় চার কন্যা নিয়ে থাকেন খন্দকার আশরাফুল আলম মামুন ও জাহানারা বেগম দম্পতি। ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালান আশরাফুল আলম। খরচের বড় অংশটা চার মেয়ের লেখাপড়ায়। সংসার চালাতে এক প্রকার হিমশিম। নিম্ন মধ্যবিত্ত সেই দম্পতির বড় মেয়ে হোমায়রা আক্তার অন্তরা শেফা এখন দেশের খেলাধুলায় উজ্জ্বল মুখ।

নেপালের কাঠমান্ডু ও পোখারায় চলমান সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে বাংলাদেশের ঝুলিতে প্রথম পদকটি জমা করেছিলেন রাজবাড়ীর এই কিশোরী। কারাতের একক কাতায় পেয়েছিলেন ব্রোঞ্জ। পরে স্বর্ণ জিতেছেন একক কুমিতে আর দলগত কুমিতে রৌপ্য।

গেমসের ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত জেতা বাংলাদেশের সর্বশেষ স্বর্ণটি এসেছে এই অন্তরার হাত দিয়েই। তার আগে অন্য দুই কারাতেকা মারজান আক্তার প্রিয়া, মোহাম্মদ আল আমিন হোসেন এবং তায়তোয়ানদোতে দিপু চাকমা জিতেছেন স্বর্ণ।

৩ স্বর্ণ, ৩ রৌপ্য ও ১২ ব্রোঞ্জ জেতা কারাতে দল গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে দেশে ফিরেছেন। একক কুমিতে স্বর্ণ জেতা অন্তরা আজ (শুক্রবার) শুনিয়েছেন তার কারাতে খেলোয়াড় হওয়ার গল্প। শুনিয়েছেন তার কষ্ট করে বেড়ে ওঠার কথা, অসুস্থ মা এবং তাদের চার বোনকে নিয়ে তার বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে সংসার চালানোর কাহিনী।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাঠমান্ডু থেকে অন্তরা ঢাকায় ফিরলেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মেয়েকে আনতে যেতে পারেননি তার মা। ‘আমার মা অসুস্থ। বাইরে বেশি বের হতে পারেন না। তাই বিমানবন্দরে যাননি। বাবাও কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আমি সবার সঙ্গে রিজার্ভ বাসেই চলে এসেছি’-বলছিলেন দেশের হয়ে এবারের এসএ গেমসে প্রথম পদক জেতা অন্তরা।

অন্তরারা চার বোনের তিনজনই কারাতে খেলেন। এর মধ্যে অন্তরা এবং মেজো বোন জান্নাতুল ফেরদৌস সুমী জাতীয় পর্যায়ে। দুইজনই ২০১৪ সালে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ আনসারে। বাবার ব্যবসার সামান্য আয়ের সঙ্গে দুই বোনের আনসার থেকে প্রাপ্ত সম্মানীর টাকা যোগ হয়ে চলতো তাদের সংসার। ২০১৮ সালের পর সম্মানী বেড়েছে দুই জনেরই।

আনসারের নিয়ম অনুযায়ী, স্বর্ণ জিতলে সম্মানী সর্বোচ্চ ১৩ হাজার টাকা। অন্তরা এবং সুমী জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম স্বর্ণ জেতেন গত বছর। এর মধ্যে সুমী জুনিয়রে এবং অন্তরা সিনিয়রে। তাও জিতেছেন তিনটি স্বর্ণ। কারাতেতে অন্তরাই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি অংশ নেন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তিন ইভেন্টে এবং তিন ইভেন্টেই স্বর্ণ জেতেন।

একাধিক ইভেন্টে খেলতে পারদর্শী বলেই অন্তরাকে এসএ গেমসেও তিনটি ইভেন্টে খেলিয়েছেন কারাতের জাপানী কোচ। তিনটিতেই পদক (স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ)। এবারের এসএ গেমসে ব্যক্তিগতভাবে পদক জয়ে এখনো বাংলাদেশের সেরা পারফরমার এই অন্তরা।

এসএ গেমস শুরুর আগে ক্রীড়াবিদদের অনুপ্রেরণা যোগাতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল পদকজয়ীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী- স্বর্ণের জন্য ৬, রৌপ্যের জন্য ৩ এবং ব্রোঞ্জের জন্য ১ লাখ পাবেন অন্তরা। এর বাইরে তার সংস্থা বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, ফেডারেশনসহ আরো পুরস্কার যোগ হলে অংকটা বেশ বড়ই।

পুরস্কারের এই টাকা দিয়ে কি করবেন? প্রশ্নটি করতেই এবারের এসএ গেমসে দেশের চতুর্থ এবং এখন পর্যন্ত সর্বশেষ স্বর্ণ এনে দেয়া হোমায়রা আক্তার অন্তরা শেফা মায়ের চিকিৎসার কথা বললেন প্রথমে, ‘আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এ টাকাগুলো যদি পাই তাহালে প্রথমেই আমি মায়ের চিকিৎসা করাবো। আমরা চার বোন। আমাদের পড়াশুনা আছে। আমরা সবাই ছোট ছোট। পড়াশুনার পেছনেও এই টাকা খরচ করবো। আমরা অস্থায়ীভাবে থাকি একটা বাসা ভাড়া নিয়ে। মায়ের চিকিৎসার পর আমাদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়াতেই এই টাকা খরচ করবো।’

অন্তরা এ বছর উইলস লিটন ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাস করে অনার্স ভর্তি হয়েছেন ঢাকা সিটি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে। মেজো বোন সুমী উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ছেন এইচএসসি প্রথম বর্ষে। ছোট দুইবোন যমজ, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।

সূত্র : জাগো নিউজ

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের নির্বাচিত আরও

পাঠকের মতামত