নারীর সমান অধিকার চাই পিতার সম্পত্তিতে

স্বাধীনতার ৪৯ বছরে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু নতুন সময়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে নারীকে। এখনও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্যাতনের ধরন বদলেছে। কখনও পাচার, কখনও এসিড সন্ত্রাস, কখনও যৌতুকের মাধ্যমে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এখন নারী-শিশু ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে নারী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পারিবারিকভাবে শিশুদের সচেতনতা করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ জরুরি। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে পিতার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কুড়িলে কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে নারী আন্দোলন কর্মীরা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও দৈনিক যৌথভাবে ‘বেইজিং+২৫ : নারীর মানবাধিকার অর্জন, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজন করে। মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম, বাংলাদেশ নারী সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট তপতী সাহা, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির জেন্ডার স্পেশালিস্ট হাসনে আরা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক, ঢাকা ওয়াইডব্লিউসিএ’র সহ-সাধারণ সম্পাদক রুথ আর এম তালুকদার, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা, অভিযানের নির্বাহী পরিচালক বনানী বিশ্বাস, জাগো ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সৌরভ সাহা, প্রতিবন্ধী নারী প্রতিনিধি নাজমা আরা বেগম পপি, ফিচার সম্পাদক রফিকুল হক দাদু ভাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটির বিজয় একাত্তর হল ইউনিটের সভাপতি সাদ মোহাম্মদউল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সোসাইটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুস, মহিলা ঐক্য পরিষদের সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধান প্রতিবেদক মাসুদ করিম।

বক্তারা বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেয়া হলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। ধর্মীয় আইনের কারণে নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘকাল ধরে সম্পদ পুরুষদের দখলে রয়ে যাচ্ছে। আইন সংশোধন করে পিতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

অভিভাবকত্বের পরিচয়ের ক্ষেত্রেও পিতার নাম ব্যবহার করা হয়। কর্মক্ষেত্রেও নারী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শারীরিক, মানসিকভাবে হয়রানি শিকার হচ্ছে তারা। এ কারণে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তারা পারিবারিক কাজে যুক্ত হচ্ছে। এ কাজকে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীদের সুরক্ষায় আইন থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই।’

সাইফুল আলম বলেন, ‘২০-৩০ বছর আগে পৃথিবী যে অবস্থানে ছিল, আজ সে অবস্থানে নেই। নারীর অবস্থান আগে যেখানে ছিল, আজ সেখানে নেই। অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। আইনকানুনের পরিবর্তন হচ্ছে। তাই নারী সব অবস্থানেই পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।

নারীর ক্ষমতায়নে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনও সাধিত হচ্ছে। তারপরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, যা এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। নারী নির্যাতনের মাত্রা এখনও অনেক বেশি। নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতার মূল যে জায়গা, সেখানে মানবাধিকার ও সামাজিকতার ন্যায়বিচারের পূর্বশর্তগুলো নিশ্চিত করতে হবে। সেই জায়গাগুলোয় আমাদের যথেষ্ট মনোযোগ দিতে হবে।’

রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, ‘বেইজিং প্লাটফর্মের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্মেলনে নারীর সমস্যাগুলো তুলে ধরব। এর আগে ৫ ডিসেম্বর নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। ডিসেম্বরেই তুলে ধরা হবে অ্যাকশন প্লানের সঙ্গে কতটুকু যুক্ত হতে পেরেছি, কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশ আমাদের, কেউ এখানে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে থাকব না। সে নারী হোক বা পুরুষ হোক অথবা বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্ম-বর্ণ বা ভাষার হোক। আগামী বছরের সম্মেলনকে সফল করতে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।’

তপতী সাহা বলেন, ‘২০২০ সালে নিউইয়র্ক সম্মেলনে যাওয়ার আগে আমাদের রিজিওনাল প্রসেস আছে, যা আগামী ২৪-২৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে এশিয়া প্যাসিফিকের সব সিভিল সোসাইটি, নারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে বসবেন। সেখানে তারা খোলামেলা আলোচনা করবেন। এরপর ২৭-২৯ ডিসেম্বর তিনদিন হবে সরকারি পর্যায়ের সম্মেলন। সেখানকার আউটকাম ডকুমেন্ট সরকারের কাছে সাবমিট করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধি দল যাচ্ছে। ইউএন উইমেন পুরো বেইজিং প্রসেস লিট করছে। সেখানে সরকারি পর্যায়ের সম্মেলনে সিএসও প্রতিনিধিও থাকবেন। তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন। বাংলাদেশ থেকে যারা যাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের ব্রিফি ছিল। মহিলা পরিষদও যাচ্ছে। আমরা আশা করব, মহিলা পরিষদ যেহেতু সারা বাংলাদেশে এই কাজটা করেছে, তাই সংগঠনটি এটা ভালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।’

সীমা মোসলেম বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৯ বছরে নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু তারপরও নতুন অগ্রগতি নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের কথা বলা হলেও তা হচ্ছে না। পোশাক শিল্পের যেখানে ৮৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ছিল, এখন সেটা কমে ৬০-৬৫ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে নতুন আইন করা হয়েছে, যেখানে পরিবার চাইলে বাল্যবিয়ে দিতে পারবে। এই পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন কর্মসূচি নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’

রোকেয়া কবীর বলেন, ‘নারী শুধু সন্তান উৎপাদনের ফ্যাক্টরি না, সে একজন মানুষ। এই বিষয়ে কোনো কর্মসূচি বা কোনো রকমের চিন্তাভাবনা এডুকেশনাল সিস্টেমে তো নাই-ই, ন্যাশনাল ডিসকোর্সেও নেই। এটি নিয়ে আলোচনাও হয় না। আমরা শুধু নারীর ক্ষমতায়নের দিকে জোর দিচ্ছি। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য আইনগত এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।’

অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘এখনও নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। একেক সময় একেকভাবে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কখনও পাচার, কখনও এসিড সন্ত্রাস, কখনও যৌতুকের সংখ্যা বৃদ্ধি। আর এখন ধর্ষণ বাড়ছে। এখন ঘর নিরাপদ নয়, সমাজ নিরাপদ নয়, রাষ্ট্রের কাছেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ, মডার্নাইজেশনের স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু সাইবার ক্রাইমের মতো বিষয় আমলে নিচ্ছি না।’

হাসনে আরা বেগম বলেন, ‘সবক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গত ৫ বছরের রিভিউ যদি দেখি, সেই অগ্রগতি আসলে কোন সেক্টরে? ৫ বছরে ফরমাল সেক্টরে নারীর অগ্রগতি কিন্তু কমে এসেছে। এক্ষেত্রে অগ্রগতি দশমিক ৫ শতাংশের মতো। এটা খুবই ভয়াভহ চিত্র যে, নারীকে ইনফরমাল সেক্টরে প্রমোট করছি। এখন আরেকটা কালচার তৈরি হয়েছে, ঘরে বসে নারীর অনেক কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’

রুথ আর এম তালুকদার বলেন, ‘বিদেশ থেকে নারী কর্মীদের লাশ আসছে। এ বিষয়ে সরকারকে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। এখন আবার মধ্যপ্রাচ্যের সরকার বলছে, নারী কর্মী না দিলে পুরুষ কর্মী নেবে না। এক্ষেত্রে সরকার যখন চুক্তি করে, তখন সঠিকভাবে করা উচিত।’

ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ‘আদিবাসী নারীরা আদিবাসী হিসেবে এবং প্রান্তিক নারী হিসেবে বৈষম্যের শিকার। তাদের ক্ষমতায়নে জাতীয় সংসদে অঞ্চলভিত্তিক এবং স্থানীয় সরকারে আদিবাসী নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’

বনানী বিশ্বাস বলেন, ‘ভোট এলেই দলিত সম্প্রদায়ের নারীদের ওপর অত্যাচার চলে। ঋষিপাড়াগুলো যেন পতিতালয় হয়ে ওঠে। দলিতরা দেশান্তর হচ্ছে। এটা ঠেকাতে হলে উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করতে হবে।’

সৌরভ সাহা বলেন, ‘সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করতে হবে পরিবার থেকে। তা না হলে সমাজে ভয়ংকর কিছু মোকাবেলা করতে হবে।’

নাজমা আক্তার বেগম পপি বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য এটা-ওটা করা হবে বলা হয়, কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয় না। এটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো শক্তিশালী ইন্সটিটিউশন নেই। নারীদের জন্য দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় হচ্ছে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়। আর প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ দুটো মন্ত্রণালয়ের একটিও বলতে পারবে না প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধিতে কী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষা আইনে অনেক সুন্দর করে সবকিছু দেয়া আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি অধিদফতর করার ঘোষণা দেয়া হয় ২০১৪ সালে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন নেই।’

রফিকুল হক দাদু ভাই বলেন, ‘নারীদের এগিয়ে চলার পথে, তাদের অধিকারের বিষয়ে আমরা সবসময় সচেতন। ইউএন উইমেন ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরাও সবসময় তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব।’

সাদ মোহাম্মদউল্লাহ বলেন, ‘অনলাইনে সাইবার বুলিং ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর করুণ একটি বিষয় হচ্ছে- প্রবাসী নারী, যারা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন, তাদের নির্যাতনের পরিসংখ্যান সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে নেই। কতজন নারী নির্যাতিত হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন, কতজন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসছেন- এই তথ্য কারও কাছে নেই।’

সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য বলেন, ‘আইনের ফাঁকফোকরের কারণে অপরাধীরা বের হয়ে যায়। অপরাধীরা যেন ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’

মো. ইউনুস বলেন, ‘নারী অধিকার ও তাদের ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক সংগঠনই কাজ করছে। এগুলোর যদি স্ট্রাকচারাল জায়গায় পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে নারীদের এমপাওয়ারমেন্ট ও তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা যাবে।’

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত