নতুন মেরুকরণ রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে

শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকলেও সে ছিল ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে সে সহযোগীদের দিয়ে টার্গেট ব্যক্তিকে হত্যা করাতেও পিছপা হতো না। ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ঠিকাদার ও রাজনৈতিক নেতা জিসানকে নিয়মিত অর্থ ও সহায়তা করতেন।

গোয়েন্দারা জানান, জিসানের একচ্ছত্র আধিপত্যে চিড় ধরেছিল। ‘গুরু মারা অনেক শিষ্য তৈরি হওয়ায় তার নির্দেশ যথাযথভাবে আর কার্যকর হচ্ছিল না। নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে সম্প্রতি যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও গ্রেফতার ঠিকাদার জি কে শামীমসহ তিনজনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল জিসান। নির্দেশ কার্যকর করতে পেশাদার খুনিকে অস্ত্রও সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে হত্যার আগেই তাদের তিনজন অস্ত্রসহ ধরা পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। তাদের মধ্যে জিয়াউল আবেদীন ওরফে জুয়েলের দেওয়া জবানবন্দির সূত্র ধরে তদন্তে উঠে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আগের মতো চাঁদা পাচ্ছিল না জিসান। তার নির্দেশ শুনছিল না এদেশীয় সহযোগীদের কেউ কেউ। ফলে তিনজনকে খুনের মাধ্যমে নিজের শক্তিমত্তা জাহিরের পাশাপাশি অনুগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে এ দেশের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছিল সে।

এদিকে জিসান গ্রেফতার হওয়ায় তার আধিপত্যের অবসান হবে। তার এদেশীয় ক্যাডারও দুর্বল হয়ে পড়বে। এসব ভেবে এতদিন কোণঠাসা হয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিতে লিপ্ত হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

দুবাইয়ে গ্রেফতার জিসানকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তাকে আনার পর জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ জগতের আরও অনেকের ব্যাপারে জানা যাবে এবং তাদেরও আইনের আওতায় এনে সন্ত্রাসের মূলোৎপাটন করা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্নিষ্টরা। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এনসিবি) মহিউল ইসলামবলেন, দুবাইয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এসসিবি) জিসানকে গ্রেফতারের খবর নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিছু তথ্য ও নথিপত্র চেয়েছে। এখন সেগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব তাকে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের তৎপরতা চলছে।

ঢাকার মালিবাগে ডিবির দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যাসহ অসংখ্য অপরাধে অভিযুক্ত জিসানকে গ্রেফতারের খবর বুধবার বাংলাদেশকে জানায় দুবাই এনসিবি। আরও কিছু তথ্য যাচাইয়ের পর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পুলিশ এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে তা গণমাধ্যমকে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর। অবশ্য দু-একটি গণমাধ্যমে জিসানকে গ্রেফতার নিয়ে বিভ্রান্তির কথা বলা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, গ্রেফতার ব্যক্তি জিসান নয়, তার ভাই শামীম।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতার ব্যক্তি জিসান নয় এমন কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই। সে দুই মাস ধরে দুবাই পুলিশের নজরদারিতে ছিল। এ সময়ে নানারকম তথ্য ও ছবি আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করেছে দুবাই। ডিবির দেওয়া তার সাম্প্রতিক ছবিও মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এরপরও যদি কারও সংশয় থাকে, তাকে ফিরিয়ে আনার পরই সেটা যাচাই করা যাবে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া ঠিকাদার জি কে শামীমসহ শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল জিসানের। তাদের কেউ কেউ নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে বা ঠিকাদারি কাজ পেতে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকাও দিতেন। সম্প্রতি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জিসানের সঙ্গে তাদের সখ্যের বিষয়টি সামনে চলে আসে। তাদের মাধ্যমে জিসানের সর্বশেষ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে জিসান ও খালেদকে একসঙ্গে সুইমিং পুলে সময় কাটাতে দেখা যায়। তবে একসময় ঘনিষ্ঠতা থাকলেও পরে জিসান তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। তার কোনো নির্দেশ না মানা ও চাহিদামতো টাকা না পাঠানোয় এমনটা ঘটে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। এর জের ধরে সে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, জি কে শামীম ও রানা মোল্লা নামে তিনজনকে হত্যার নির্দেশ দেয় সহযোগীদের।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জিসানের তিন সহযোগীকে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে খিলগাঁও থেকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো-খান মোহাম্মদ ফয়সাল, জিয়াউল আবেদীন ওরফে জুয়েল ও তার ভাই জাহেদ আল আবেদীন ওরফে রুবেল। এ সময় তাদের কাছে পাওয়া যায় একটি এ কে-২২ রাইফেল, চারটি পিস্তল, একটি রিভলবার ও ৪৭ রাউন্ড গুলি। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জিসানের নির্দেশে তিনজনকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। পরে জুয়েল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এর সূত্র ধরে ডিবিসহ অন্যান্য সংস্থা তদন্ত করে গুরুত্বপূর্ণ আরও তথ্য পায়।

সংশ্নিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জুয়েল ও রুবেল ২০০৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দুবাইয়ে জিসানের সঙ্গে ছিল। জবানবন্দিতে জুয়েল শুধু বৈঠকের কথা স্বীকার করলেও বাস্তবে তারা দুই ভাই ছিল জিসানের নানা অপকর্মের সহযোগী। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তারা দেশে ফিরে আসে। তবে নিয়মিত বোটিম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জিসানের সঙ্গে কথা হতো তাদের। কয়েক মাস আগে জিসান তার সহযোগী সোহাগ ও জুয়েলের চাচাত বোনের ছেলে ওমর ফারুক ললাটের সঙ্গে দেখা করতে বলে দুই ভাইকে। কথা অনুযায়ী গত ২৬ জুলাই সোহাগ ও আনিসের সঙ্গে দেখা করলে তারা হত্যার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করে। তবে ডিবির অভিযানে তিনজন গ্রেফতার হওয়ায় ভেস্তে যায় হত্যার মিশন।

সমকাল

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত