সার্জারি আবিষ্কার করেছেন যে মুসলিম চিকিৎসক

বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলমানদের অবদান অপরিসীম। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন বলেন যে, লন্ডনের রাস্তা যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতো তখন মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বল তীর্থকেন্দ্র কর্ডোভার রাজপথ আলোয় উদ্ভাসিত থাকতো। ড্রেপার, গীজা, ডেভেনপোর্ট, লেণপুল, মার্টিন, হিট্টি প্রমুখ পশ্চিম দেশীয় খৃস্টান ঐতিহাসিকগণ একবাক্যে বিশ্বজ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মুসলমানদের অবদানের কথা স্বীকার করেন। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক হিট্টি যথার্থই বলেছেন, ‘অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত আরবরা সমগ্র বিশ্বের বুদ্ধি এবং সভ্যতার আলোর বাতিকাধারী ছিল। তাদের মাধ্যমে প্রাচীন বিজ্ঞান এবং দর্শন পুনর্জীবিত, সংযোজিত ও সম্প্রসারিত হয় যার ফলে পশ্চিম ইউরোপে বেনেসাঁর উন্মেষ ঘটে। মৌলিক গবেষণা এবং অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডার সংরক্ষণ উভয় ক্ষেত্রেই তারা অসীম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মূল্যবান আবিষ্কারের ফলেই আজ বিশ্ববাসী আধুনিক ও উন্নত জীবন ধারণ করতে সমর্থ হয়েছে। বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে টুথব্রাশ পর্যন্ত, মুসলিমদের আবিষ্কারের পরিধি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ঐতিহ্যের ওপর রচিত ‘১০০১ Inventions’ গ্রন্থটির সম্পাদক ও ফাউন্ডেশন অব সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড সিভিলাইজেশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর সালিম আল হাসানি বলেন,একদা স্পেন থেকে পর্তুগাল এবং ইতালি থেকে চীন পর্যন্ত যে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল এবং সেই সাথে আধুনিক পৃথিবী স্থাপনে মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিষ্ময়কর সব আবিষ্কারের কাহিনী এ গ্রন্থটিতে লিপিবদ্ধ আছে, তিনি বলেন, এ বইটি পড়লে মানুষ বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে। ‘১০০১ Inventions’ গ্রন্থটিতে মুসলমানদের এক হাজার ১টি আবিষ্কারের বর্ণনা রয়েছে। হাসানি এ গ্রন্থ থেকে পৃথিবী পাল্টে দেয়ার মতো মুসলিম বিজ্ঞানীদের সেরা ১০টি আবিষ্কারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

সার্জারি : সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অপরিসীম। আনুমানিক ১০০০ সালের দিকে বিশ্বনন্দিত সার্জারি চিকিৎসক ছিলেন আল জাহরাত্তয়ি। তিনি সার্জারির ওপর প্রায় পনেরোশ’ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তী পাঁচশ’ বৎসর পর্যন্ত এ বইটি ইউরোপে সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনিই সর্বপ্রথম সিজার অপারেশন করেছিলেন এবং শল্য চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফরসেপ বা চিমটে জাতীয় অস্ত্র উদ্ভাবন করেন।

কফি : নবম শতকের দিকে ইয়েমেনবাসী প্রথম কফি উৎপন্ন করে। প্রথম প্রথম সুফিরা রাত জেগে ইবাদত করার জন্য কফি ব্যবহার করতো, পরে একদল শিক্ষার্থীর মাধ্যমে এ কফি মিসরের রাজধানী কায়রোতে আনিত হয়। পরে সমগ্র আরব বিশ্বে এ কফি ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকের দিকে কফি তুরস্কে পৌঁছে। ষোড়শ শতকের দিকে কফি ইউরোপে প্রবেশ করে। যে কফির কাপে চুমুক না দিলে অনেকের দিন শুরু হয় না সে কফিই মুসলমানরা প্রথম উৎপন্ন করে।

ফ্লাইং মেশিন : বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী আব্বাস ইবনে ফিরনাস ওড়ার যন্ত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন এবং সেটির সাহায্যে তিনি আকাশে উড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। নবম শতকের দিকে তিনি পাখির আকৃতির মতো বিশাল একটি কষ্টিউম তৈরি করেন এবং স্পেনের কর্ডোভার মসজিদের মিনার থেকে এ যন্ত্রের সাহায্যে তিনি শূন্যে ঝাঁপ দেন এবং কিছু সময় আকাশে উড়তে সক্ষম হন। তাই বলা চলে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের আগেই তিনি আকাশে উড়ার বিরল কৃতিত্ব দেখান।

বিশ্ববিদ্যালয় : আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম মুসলিম দেশ মরক্কো। ৮৫৯ সালে প্রিন্সেস ফাতেমা আল ফিরহি মরক্কোর ফেজে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি সনদ দেয়া হতো। পরবর্তীতে প্রিন্সেস ফাতিমার বোন মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে পুরো কমপ্লেক্সটি বা প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় কারুইয়িন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মসজিদটির নাম হয় আল কারুইয়িন মসজিদ। প্রায় ১২০০ বৎসর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বমহিমায় টিকে আছে। বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

বীজগণিত : বীজগণিতের ওপর প্রথম গ্রন্থটি রচনা করেন পার্সিয়ার বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম গণিতবিদ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজম, সপ্তম শতকে তার রচিত গ্রন্থটির নাম ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবলা, এ বইটি থেকেই মূলত বীজগণিত বা অ্যালজেবরা নামের উৎপত্তি। তার রচিত বীজগণিতের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক গণিতের যাত্রা শুরু হয়। গাণিতিক সংখ্যার বাইরে বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে অঙ্ক ধারণা তার মাথা থেকেই আসে। আল খোয়ারিজমিই প্রথম গণিতবিদ যিনি সংখ্যার ওপর ‘পাওয়ার’-এর প্রবর্তন করেন।
অপটিকসা বা আলোকবিদ্যা : মুসলমানদের দ্বারাই আধুনিক আলোকবিদ্যার শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়েছিল। এক হাজার সালের দিকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পদার্থবিদ ইবনে আল হাইছাম প্রমাণ করেন যে, বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো মানুষের চোখে প্রবেশের পরই কেবল মানুষ সে বস্তু দেখতে পায়। তার এ মতবাদ ইউক্লিড ও টলেমির ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। এ দু’জন বলেছিলেন, চোখের নির্গত আলো দ্বারাই কেবল মানুষ কোনো বস্তু দেখতে পায়। বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পদার্থবিদ ইবনে আল হাইছাম মানুষের চোখের সাথে ক্যামেরার সাদৃশ্যও আবিষ্কার করেন।

মিউজিক : মুসলিম মিউজিশিয়ানরা ইউরোপের মিউজিকের উৎকর্ষ সাধনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি সে সময়কার ইউরোপের মিউজিশিয়ানরা বাগদাদ ও কর্ডোভার মিউজিশিয়ানদের সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতে পারেনি। ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে যে সব বাদ্যযন্ত্র এসেছে সেগুলোর মধ্যে এমন কিছু বাদ্যযন্ত্র ছিল যেগুলো থেকেই পরে ভায়োলিনের উৎপত্তি। মনে করা হয় আধুনিক মিউজিকের অনেক স্কেলও আরবি বর্ণ থেকে এসেছে।

টুথব্রাশ : মহানবী (সাঃ) দাঁতকে সুস্থ, সতেজ ও পরিষ্কার রাখার জন্য নিয়মিত মেসওয়াক ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে এ মেসওয়াকই বিবর্তিত হয়ে আবিষ্কার হয় টুথব্রাশ।

গাড়ির স্টিয়ারিং : গাড়ি কিংবা যানবাহনে স্টিয়ারিং অপরিহার্য, আর মুসলমানরা এ স্টিয়ারিং আবিষ্কার করেন। বলা চলে এ আবিষ্কারের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটেছে। বর্তমানে এ স্টিয়ারিং কেবল যান চলাচলেই ব্যবহৃত হচ্ছে না বরং ভারী জিনিসপত্র উত্তোলনের কাজেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ১২ শতকে আল জাবারির আবিষ্কৃত এ প্রযুক্তি বিশ্বের প্রায় সকল যান্ত্রিক যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাসপাতাল : আধুনিক বিশ্বে রোগীর চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতাল ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তা সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা করেন মুসলমানরা। নবম শতকে মিসরে এ হাসপাতাল ব্যবস্থার সূচনা হয়। ১৮৭২ সালে আহমদ ইবনে তুলুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় মিসরের রাজধানী কায়রোতে। বিনামূল্যে এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। কায়রো থেকেই পরবর্তীতে এ ধরনের হাসপাতাল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত